জীবনী

রাসূল সা. এর জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী (পর্ব-০১)

বিশ্বমানবতার এক বিভীষিকাময় মুহূর্তে পৃথিবীতে আগমন ঘটে এক মহাপুরুষের। পৃথিবী যখন জুলুম, অত্যাচার, অনাচার, কলহ বিবাদের অতল গহবরে নিমজ্জিত ঠিক তখনই মহান আল্লাহ পাক তাঁর এই প্রতিনিধিকে ধরাধমে পাঠান। তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন আমাদের প্রিয় রাসূল হযরত মুহাম্মদ সা.।

মক্কার কুরাইশ গোত্রের বনি হাসিম বংশে জন্মগ্রহণ করেন হযরত মুহাম্মদ সা.। প্রচলিত ধারণামতে তাঁর জন্ম সাল ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ২০ অথবা ২২ এপ্রিল। সেই হিসেবে আরবী ৯ ই রবিউল আউয়াল সোমবার। কেউ কেউ বলেছেন রাসূল সা. এর জন্ম ১২ ই রবিউল আউয়াল।

মহানবী সা. দুনিয়াতে আগমন করার সাথে সাথে কয়েকটি বিষ্ময়কর ঘটনা ঘটে। তাঁর মাতা বলেছেন যখন মুহাম্মদ সা. জন্মগ্রহণ করলেন তখন তাঁর শরীর থেকে একটি নূর বের হলো। সেই নূর দ্বারা শাম দেশের মহল উজ্জ্বল হয়ে গেলো।  অন্য একটি বর্ণনায় দেখা যায় তাঁর জন্মের পর কেসরার রাজপ্রাসাদের ১৪ টি পিলার ধ্বসে পড়েছিল। অগ্নি উপাসকদের অগ্নিকাণ্ড নিভে গিয়েছিল।

শিশুপুত্র মুহাম্মদ সা. এর জন্মের পর তাঁর মা আমিনা খবর পাঠান মুহাম্মদ সা. এর দাদা আব্দুল মুত্তালিব এর কাছে। দাদা আব্দুল মুত্তালিব পরম স্নেহে তাঁকে কোলে করে নিয়ে কাবা গৃহে প্রবেশ করেন এবং সেখানে আল্লাহর শুকরিয়া ও প্রশংসা করে দোয়া করেন। অত:পর তাঁর নাম রাখেন মুহাম্মদ। যার অর্থ প্রশংসিত। সেসময় আরবের শহরের বাসিন্দারা তাদের সন্তানদের শহরের রুক্ষ আবহাওয়া ও নানা অসুখ-বিসুখ থেকে মুক্ত রাখার জন্য বেদুইন মহিলাদের কাছে দুধ পান ও লালন পালনের জন্য দিয়ে দিতেন। মহানবী সা. এর দায়িত্ব নিয়েছিলেন বনি সাদ গোত্রের হালিমা বিনতে আবু জুয়াইব।

মুহাম্মদ সা. কে দুধ পান করানোর সময় হযরত হালিমা এমন সব বরকতের ঘটনা প্রত্যক্ষ করলেন যে তা দেখে তিনি বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন। সেসময় বেদুইন মহিলারা শহরে গিয়ে দুধপান করানোর জন্য শিশুদের নিয়ে আসতেন। হালিমাও যথারীতি গোত্রের অন্যান্য মহিলাদের সাথে শহরে গেলেন দুধের শিশু আনতে। চারদিকে দুর্ভিক্ষের কারণে প্রচন্ড অভাব অনটন। খাদ্যের অভাবে প্রাণ বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম। নিজের স্তনেও দুধ ছিল না এবং উটনীও দুধ দিত না। আর যে বাহনে করে শহরে যাচ্ছিলেন সেই গাধাটিও খুব ধীর গতিতে যেতে লাগল। যার কারণে হালিমা শহরে পৌঁছতে দেরি করে ফেললেন। এই ফাঁকে অন্যান্য মহিলারা সম্ভ্রান্ত পরিবারের সব ভাল ভাল শিশুদের নিয়ে চলে গেল। শিশু মুহাম্মদ এতিম হওয়ার কারণে কেউ তাঁকে নিতে চাইলো না। হালিমা অনেক খুঁজেও অন্য কোন শিশু না পেয়ে নিজের স্বামীকে বললেন একেবারে খালি যাওয়ার চেয়ে এই শিশুটিকে নিয়ে গেলেই ভাল হবে। স্বামী রাজি হলেন এবং তিনি মুহাম্মদ সা. কে নিয়ে গেলেন।

শিশু মুহাম্মদকে নিয়ে যখন তিনি ডেরায় ফিরলেন লক্ষ্য করলেন যে তাঁর উভয় স্তন দুধে পরিপূর্ণ। রাসূল সা. সহ তাঁর অন্যান্য দুধ ভাই বোনেরা তৃপ্তির সাথে দুধ পান করলেন। উটনী দোহন করতে গিয়ে দেখেন তার স্তনও দুধে পরিপূর্ণ। এ দৃশ্য দেখে হালিমার স্বামী বললেন খোদার কসম হালিমা তুমি এক বরকতপূর্ণ শিশু গ্রহণ করেছো। পরের দিন কাফেলা রওয়ানা হলে শিশু মুহাম্মদ ও স্বামী সহ হালিমা দূর্বল গাধার পিঠে উঠলেন। দূর্বল এই গাধাটি সামনের সবার বাহনকে ডিঙিয়ে সবার আগে বনি সাদ গোত্রে পৌঁছে গেল। এরপর হালিমা তাঁর সব কিছুতেই বরকত লক্ষ্য করলেন।

দুই বছর লালনপালনের পর হালিমা শিশু মোহাম্মদকে মা আমিনার কাছে ফিরিয়ে দেন। কিন্তু এর পরপরই মক্কায় মহামারী দেখা দেয় এবং শিশু মুহাম্মাদকে হালিমার কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়। হালিমাও চাচ্ছিলেন শিশুটিকে ফিরে পেতে। এতে তার আশা পূর্ণ হল। ইসলামী বিশ্বাসমতে এর কয়েকদিন পরই একটি অলৌকিক ঘটনা ঘটে – একদিন শিশু নবীর বুক চিরে কলিজার একটি অংশ বের করে তা জমজম কূপের পানিতে ধুয়ে আবার যথাস্থানে স্থাপন করে দেয়া হয়। মহান আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে হযরত জিবরাইল আ. এই কাজটি করেছেন। গোত্রের অন্যান্য শিশুরা হালিমার কাছে এসে বলল মুহাম্মদকে মেরে ফেলা হয়েছে। তিনি এসে দেখলেন মুহাম্মদ বিবর্ণমুখে বসে আছে। এই ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসে সিনা চাক বা বক্ষ বিদারণের ঘটনা হিসেবে খ্যাত।

এই ঘটনার পরপরই মুহাম্মদ সা. কে মাতা আমিনার কাছে ফিরিয়ে দেন দুধমাতা হালিমা। তখন রাসূল সা. এর বয়স ৬ বছর। একদিন আমিনার ইচ্ছে হলো শিশু পুত্রকে নিয়ে মদিনায় স্বামীর কবর যিয়ারত করতে যাবেন। দাসী উম্মে আয়মন ও রাসূল সা. এর দাদা আব্দুল মুত্তালিবকে সাথে নিয়ে ৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তিনি মদিনায় পৌঁছলেন। ফেরার পথে আবওয়া নামক স্থানে আমিনা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং সেখানেই ইন্তেকাল করলেন। পৌত্র মুহাম্মদকে সাথে নিয়ে মক্কায় এসে পৌঁছলেন দাদা আব্দুল মুত্তালিব। এরপর থেকে দাদা আব্দুল মুত্তালিবই মুহাম্মাদের দেখাশোনা করতে থাকেন। মোহাম্মদের বয়স যখন ৮ বছর ২ মাস ১০ দিন তখন তার দাদাও মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি তার পুত্র আবু তালিবকে মোহাম্মদের দায়িত্ব দিয়ে যান।

চাচা আবু তালিবও মুহাম্মদ সা. এর লালন পালনে কোন ত্রুটি করছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। সেসময় বছরে একবার ব্যবসার কাজে সিরিয়া যাওয়া লাগত। ১২ বছর বয়সে মুহাম্মদ সা. একবার বায়না ধরলেন যে চাচার সাথে সিরিয়া যাবেন। ভাতিজাকে নিষেধ না করে তিনি তাঁকে সাথে নিয়ে গেলেন। তাঁরা যেখানে গিয়ে অবস্থান করলেন সেখানে জারজিস নামক একজন পাদ্রী ছিলেন। যিনি বুহাইরা নামেও পরিচিত ছিলেন। পাদ্রী বুহাইরা বালক মুহাম্মদকে দেখে চিনে ফেললেন। তিনি আবু তালিবকে বললেন সে হচ্ছে সাইয়্যিদুল আলামীন। আল্লাহ তাকে রহমাতুল্লিল আলামীন হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আপনারা এই এলাকায় আসার পর এখানকার সকল পাথর ও গাছপালা সিজদায় নত হয়েছে। তারা নবী ছাড়া কাউকে সিজদা করে না।
তাছাড়া তাঁর মোহরে নবুয়তের মাধ্যমে আমি তাঁকে চিনতে পেরেছি৷ আপনি তাঁকে মক্কায় পাঠিয়ে দিন। ইহুদিরা সন্ধান পেলে তাঁর ক্ষতি করে ফেলবে। আবু তালিব মুহাম্মদ সা. কে মক্কায় পাঠিয়ে দিলেন।

মহানবী সা. যখন ১৫ বছরে উপনীত হন তখন মক্কায় ফুজ্জারের যুদ্ধ শুরু হয়।  এই যুদ্ধে তিনি স্বয়ং নিজে অংশগ্রহণ করেন। তিনি চাচাদের হাতে তীর তুলে দিতেন। যুদ্ধের নির্মমতায় তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হন।
সেই সময় থেকেই তিনি ব্যতিক্রমী কিছু করার মনোনিবেশ করেন। আরবদের হানাহানি, রাহাজানি, লুটপাট, প্রতিশোধস্পৃহা ইত্যাদির অবসানের জন্য তিনি একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত করেন। সংগঠনটির নাম দিয়েছিলেন হিলফুল ফুজুল। সংগঠনের সকল সদস্যরা এ মর্মে প্রতিজ্ঞা করলেন যে মক্কায় অবস্থিত যেকোনো ধরনের জুলুম অত্যাচার শক্ত হাতে প্রতিরোধ করবেন।







Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button