জীবনী

পার্সি বিশি শেলি: ইংরেজি সাহিত্যের সবচেয়ে সফল রোমান্টিক কবি

১৭৯২ খ্রিস্টাব্দ। ফরাসি বিপ্লবের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। প্যারির ক্ষুব্ধ জনতা তাদের রাজা টিলারিসকে কারাগারে নিক্ষেপ করে। রাজা তখন ফাঁসির অপেক্ষা করছিলেন। সম্পূর্ণ ইউরোপজুড়ে বিস্তার করে অরাজকতার থাবা। সেই বছর ই ইংল্যান্ডের সাসেক্স এ বাবা মায়ের কোল আলোকিত করে জন্ম নেয় ফুটফুটে এক শিশু। যে কিনা পরবর্তী সময়ে সাহিত্যের নতুন একটি বিপ্লবী যুগের সম্রাট হয়ে উঠেছিলেন। তিনি হচ্ছেন কবি পার্সি বিশি শেলি। আজকের আয়োজন তাকে নিয়েই।

পার্সি বিশি শেলি ইউরোপের ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক যুগের একজন বিখ্যাত কবি। ১৭৯২ সালের ৪ আগস্ট, দক্ষিণ ইংল্যান্ডের সাসেক্স এর হরসহোম এ এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর বাবার নাম টিমথি শেলি ও মা এলিজাবেথ পিলফোর্ড।

১৮০২ সালে, সিয়ন হাউজ একাডেমিতে প্রাথমিক শিক্ষা নেন শেলি। এরপর ১৮০৪ সালে, ভর্তি হন ইটন কলেজে। সেখানে থাকা অবস্থায় তাঁর লেখা পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে। ১৮০৯ সালে, একটি লেখা ছাপিয়ে তিনি প্রকাশকের কাছ থেকে ৪০ পাউন্ড পুরস্কার লাভ করেন।

তার পিতা টিমোদি শেলি অত্যন্ত সাধারণ ইংরেজ গ্রাম্য জমিদার ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন পার্সি কে একজন গণ্যমান্য, ভূসম্পত্তি সম্পন্ন একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে গড়ে তুলবেন। কিন্তু পার্সির স্বপ্ন ছিলো ভিন্ন। তিনি কায়িক পরিশ্রমকে রীতিমত ঘৃণা করতেন। তাকে যা বলা হতো তিনি তা করতে পছন্দ করতেন না। বরং নিষিদ্ধ কর্মসমূহে তিনি বেশি আগ্রহী ছিলেন। ছেলেবেলা থেকেই তাঁর চারিত্রিক রূপে ফুটে উঠত সেগুলো।

তরুন বয়স থেকেই তিনি কবিতা চর্চা শুরু করেন। তখন থেকেই তাঁর প্রতিভা ও বুদ্ধিদীপ্ততার পরিচয় পাওয়া যায়। মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি তাঁর প্রথম কাব্য ‘কুইন ম্যাব’ রচনা করেন। 

জ্ঞান হবার পর থেকেই ফরাসি বিপ্লবের তান্ডব প্রত্যক্ষ করে আসছিলেন শেলি। সম্ভবত যুগযন্ত্রণার প্রভাবেই তাঁর চরিত্রে অস্থির মানসিকতা পরিলক্ষিত হয়। 

ফরাসী বিপ্লব ও এর ফলাফল দেখে যখন সম্পূর্ণ ইংল্যান্ড আতঙ্কিত। তখন শেলি প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ও সাম্যের জয়গান গাইতে শুরু করেন। শেলির বাল্যকালে যে চিত্তচাঞ্চল্য ও বিদ্রোহ প্রবণতা পরিদৃষ্ট হয়, তা কিন্তু তার পিতা-মাতা থেকে অর্জিত হয়নি। তাঁর মধ্যে রোমান্টিকতার সূত্র যেটুকু পাওয়া যায় তা তাঁর ক্ষমতাধর, সাহসী, চঞ্চলমতি ও অসাধারণ কৃতিত্বের অধিকারী পিতামহ বিশি শেলি হতে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন বলে অনুমান করা হয়।

তার লেখা, নিজস্ব আদর্শ ও চিন্তা-চেতনা দিয়ে খুব কম বয়সেই তিনি খ্যাতিমান হয়েছেন। লিখে গেছেন এডোনাইস, ওড টু দা ওয়েস্ট ওয়াইন্ড, ওড টু এ স্কাইলার্কের মতো বিখ্যাত সব কবিতা। তাকে ইংরেজি সাহিত্যের সবচেয়ে সফল রোমান্টিক কবি হিসেবে মনে করা হয়। 

১৮১০ সালে, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি কলেজে ভর্তি হন শেলি। তাঁর মাথায় তখন সমাজের প্রচলিত ধ্যানধারণা ও ধর্মচিন্তা সম্পর্কে বিরূপ চিন্তাভাবনা কাজ করে। ঠিক তখনই তাঁর বন্ধুত্ব হয় টমাস জেফারসন হগের সাথে। তাঁদের দু’জনের চিন্তাভাবনা প্রায় একই রকমের ছিল। তাই কিছু দিন পর দু’জন মিলে লিখে ফেলেন ‘দি নেসেসিটি অব এথেইজম’ নামে একটি গ্রন্থ। তখনকার সময়ে ধর্মবিরোধীদের জন্যে কঠোর শাস্তির বিধান ছিলো। তাই এই গ্রন্থ প্রকাশ করার কারণে ১৮১১ সালে, শেলি ও হগ দু’জন কেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত করা হয়। জানা যায়, শেলির বাবাও তাঁকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেন। পরিবার থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যান তিনি। জীবনের শুরুতেই এমন অপ্রত্যাশিতভাবে প্রবঞ্চনার শিকার হওয়ায় বাকি সময়গুলো খুব সংগ্রাম করে কাটাতে হয়।

এই ঘটনার পর তিনি তার বন্ধু হগের সঙ্গে লন্ডন চলে যান। সেখানে লজিং থেকে প্রচুর পড়াশুনা শুরু করেন। এ সম্পর্কে হগ বলেন, “তখন শেলি প্রত্যহ ষোলো ঘণ্টা অধ্যয়ন করতেন। জনাকীর্ণ রাস্তায় চলাকালেও এক হাতে একটি বই চোখের সামনে ধরা থাকত এবং অপর হাতে আরেকটি পড়ার জন্য প্রস্তুত থাকত, যেন একটি বই শেষ করে অন্য একটি বইয়ের জন্য অপেক্ষা করতে না হয়।”

শেলির ছিল কল্পনাবিলাসী মন। বাল্যকাল থেকেই তিনি সবকিছুতেই সংস্কারপ্রত্যাশী ছিলেন। ইংল্যান্ডে প্রচলিত অধিকাংশ আইনের প্রতি তার শ্রদ্ধাবোধ ছিল না। পার্লামেন্টকে তিনি উদ্ভট মনে করতেন। ধর্মকেও তিনি অবজ্ঞা করতেন। এমন কি তাকে বিবাহ প্রথারও  বিরোধিতা করতে দেখা যায়। যদিও পরবর্তী সময়ে নিজেই এই প্রথায় বন্দী হন।

অক্সফোর্ড এ থাকাকালীন সময়ে ষোলো বছর বয়সী বালিকা হ্যারিয়েট ওয়েস্টব্রুকের সঙ্গে শেলির প্রথম পরিচয় ঘটে। শেলির চিন্তাচেতনায় একাত্মতা পোষণ করার কারণে সবার বারণ সত্ত্বেও ১৮১১ সালের আগস্টে হ্যারিয়েট তাঁকে বিয়ে করেন। তাঁদের ঘরে চার্লস নামে এক পুত্রসন্তান জন্মলাভ করে। যদিও সে বিয়ে সুখের হয়নি। ১৮১৬ সালে, অজ্ঞাত কারণে হ্যারিয়েট আত্মহত্যা করেন।

এর কিছুদিন পর ই শেলির বিয়ে হয় গডউইনকন্যা মেরি গডউইন এর সাথে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অটুট ছিল।

শেলির জীবনের শেষ চারটি বছর কেটেছে ইতালিতে এবং এই সময়েই রচিত হয়েছে তার বেশীরভাগ শ্রেষ্ঠ লেখা। যত দিন বেঁচে ছিলেন সাহিত্যচর্চা করে গেছেন তিনি। তাঁর রচিত  কাব্যগুলো হচ্ছে ‘কুইন ম্যাব’ (১৮১৩), ‘অ্যালাস্টার’ (১৮১৫) ‘প্রমিথিউস আনবাউন্ড’ (১৮১৮-১৯), ‘দি চেনসি’ (১৮১৯), ‘জুলিয়ান অ্যান্ড ম্যাড্ডালো’ (১৮১৮), ‘দি মাস্ক অব এনার্কি’ (১৮১৯), ‘দি উইচ অব এটলাস’ (১৮২০), ‘এপিসাইচিডিয়ন’ (১৮২১) এবং ‘এডোনাইস’ (১৮২১) কাব্য ও নাটকগুলো। তাঁর রচিত সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধ হচ্ছে ‘দি ডিফেন্স অব পোয়েট্রি’ (১৮২১)। এসবের বাইরেও শেলির প্রতিভার সবচেয়ে বেশি বিকাশ ঘটে তার গীতিকবিতা গুলো তে। অসংখ্য গীতিকবিতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ- ‘স্টাঞ্জার্স রিটেন ইন ডেজেকশন’, ‘নিয়ার নেপলস’, ‘টু নাইট’, ‘রেয়ারলি রেয়ারলি’, ‘ওড টু দ্য ওয়েস্ট উইন্ড’, ‘দ্য ক্লাউড’, ‘দ্য সেনসিটিভ প্ল্যানেট’ ইত্যাদি।  

মাত্র ২৯ বছর বয়সে ১৮২২ সালের ৮ জুলাই, ইতালির পিসায় কবি বায়রন ও হান্টের সাথে দেখা করার পর নৌকা নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ঝড়ের কবলে পড়ে এ মহান কবি ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন। 

তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা ‘ওড টু দ্য ওয়েস্ট উইন্ড’ এ তিনি লিখেছিলেন, ” এক প্রলয়ঙ্কারী ঝড় এসে সব মলিনতা, মৃত চিন্তা উড়িয়ে নিয়ে যাবে, সৃষ্টি করে যাবে নব জীবনের সূচনা”।

পৃথিবীর অন্যায়, শোষণ ও অত্যাচারকে ঝড়ের মতো উড়িয়ে দিয়ে সেই ঝড়ের মাঝেই মিশে যেন নবজীবনের সূচনা করতেই চিরতরে হারিয়ে যান কবি।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button