সাম্প্রতিক

কে এই শিশু বক্তা রফিকুল ইসলাম

“রাষ্ট্রবিরোধী উস্কানিমূলক ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য প্রদান এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে আলোচিত ‘শিশু বক্তা’ মাওলানা রফিকুল ইসলামকে আটক করা হয়েছে।”

গতকাল ধরে এই শিরোনামে একটি সংবাদ ঘুরে বেড়াচ্ছে পত্রিকার পাতা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার নিউজফিডে।

কিন্তু কে এই শিশু বক্তা! তাকে নিয়ে কেনোই বা এত আলোড়ন সৃষ্টি! 

বিভিন্ন স্থানে ওয়াজে বক্তব্য দিয়ে পরিচিতি লাভ করেন শিশু বক্তা রফিকুল ইসলাম। তার বাড়ি নেত্রকোণা জেলায়, তিনি থাকেন গাজীপুরে। তার জন্ম সাল নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। জানা যায়, শিশু বক্তা হিসেবে পরিচিত হলেও শিশু নন তিনি। রফিকুল ইসলামের বয়স প্রায় ২৬ বছর। নিজের নামের সঙ্গে ‘শিশু বক্তা’ শব্দটি ব্যবহারে আপত্তি জানিয়েছেন রফিকুল ইসলাম নিজেই।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এক ওয়াজ মাহফিলে তিনি বলেন, ‘আমি ১৯৯৫ সালে জন্মগ্রহণ করেছি। এখনো আমাকে শিশুবক্তা বানিয়ে রাখবেন কেন? আল্লাহ তাআলা আমাকে বানাইছে। দেখতে এমন লাগে। আমার করার কিছু আছে? এজন্য আমি শুকরিয়া আদায় করি।’ 

জানা যায়, ক্লাস সিক্স পর্যন্ত স্কুলে পড়েছেন তিনি। এরপর মাদ্রাসায় ভর্তি হন। নূরানিতে এক বছর পড়ার পর দুই বছরে হেফজ শেষ করেন। এরপর আট বছর কিতাবখানায় পড়েন তিনি। তিনি রাজধানীর বারিধারায় মাদানী এভিনিউয়ের পাশে অবস্থিত জামিয়া মাদানীয়া বারিধারা মাদ্রাসায় দাওরায়ে হাদিস পড়েছেন।

রফিকুল ইসলাম নেত্রকোণার পশ্চিম বিলাশপুর সাওতুল হেরা মাদরাসার পরিচালক। এছাড়া তিনি বিএনপি-জামায়াত জোটের শরিকদল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের অঙ্গ সংগঠন যুব জমিয়তের নেত্রকোনা জেলার সহ-সভাপতি। মাদ্রাসার ছাত্র থাকাকালীন সময় থেকেই বিভিন্ন মাহফিলে ওয়াজ করতেন রফিকুল। 

জানা গেছে, শারীরিক আকৃতিতে ছোট হওয়ায় তাকে এখনও ‘শিশু বক্তা’ বলা হয়। আবার অনেক জায়গায় ওয়াজ মাহফিলে শ্রোতাদের আকৃষ্ট করতে তার নামের সঙ্গে ‘শিশু বক্তা’ যুক্ত করা হয়। এ ব্যাপারে রাবেতাতুল ওয়ায়েজিন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা হাসান জামিল বলেন, রফিকুল ইসলাম শিশু বয়স থেকেই বিভিন্ন মাহফিলে ওয়াজ করেছেন। সে কারণে সে শিশু বক্তা হিসেবে পরিচিত।

শিশু বক্তা হিসেবে খ্যাত রফিকুল ইসলাম বরাবরই ওয়াজে অপ্রাসঙ্গিক, বিতর্কিত বক্তব্য রেখে সমালোচিত হয়েছেন। বিতর্কিত বক্তা হওয়ায় তাকে ওয়াজকারী বক্তাদের সংগঠন ‘রাবেতাতুল ওয়ায়েজিন বাংলাদেশ’ এর সদস্য করা হয়নি। বরং সংগঠনটির পক্ষ থেকে তাকে বিভিন্ন সময় অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য না দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

এছাড়াও নিজের নামের শেষে ‘মাদানী’ শব্দ টি ব্যবহার করায় নতুন করে বিতর্কিত হয়েছেন তিনি। সাধারণত সৌদি আরবের মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের যারা পড়াশোনা করেন তারা নামের সঙ্গে ‘মাদানী’ যুক্ত করেন। সে হিসেবে উনি চাইলেই ‘মাদানী’ শব্দ টি ব্যবহার করতে পারেন না। ‘মাদানী’ উপাধি ব্যবহার করায় সম্প্রতি রফিকুল ইসলামকে আইনি নোটিশ পাঠান হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মদিনা শাখার আমীর মাওলানা রফিকুল ইসলাম মাদানী। যদিও এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রফিকুল ইসলাম বলেন, জামিয়া মাদানীয়া বারিধারা মাদ্রাসায় পড়েছেন বলে তিনি নামের শেষে ‘মাদানী’ উপাধি ব্যবহার করেন।

সম্প্রতি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে যেসব বিক্ষোভ হচ্ছে তার কয়েকটিতে খুব কড়া ভাষায় বক্তব্য দিতে দেখা গেছে এই বক্তা কে। 

গত ২৫ মার্চ বৃহস্পতিবার, রাজধানীর শাপলা চত্বরে মোদিবিরোধী বিক্ষোভ মিছিল থেকে  তাকে আটক করে মতিঝিল থানা পুলিশ। 

              চিত্রঃ পুলিশ কর্তৃক রফিকুল ইসলাম কে আটক করার দৃশ্য

পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী বৃহস্পতিবার দুপুরে পল্টনে মুক্তাঙ্গনে মোদিবিরোধী বিক্ষোভ করে ছাত্র ও যুব অধিকার পরিষদ। সেখানে যোগ দেয় রফিকুল। যদিও কয়েক ঘণ্টা পরেই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। 

ইউটিউবে অনেক ওয়াজই রয়েছে রফিকুল ইসলাম মাদানীর। কিন্তু বেশ কয়েকটি ওয়াজের কারণে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছেন তিনি। তার একটি মাহফিলের ভাষণে জঙ্গিদের হাতে নিহত লেখক অভিজিৎ রায় ও ব্লগার রাজীব হায়দারের খুনিদের ‘আমাদের ভাই’ বলে সম্বোধন করেছেন তিনি। এসব মামলায় জঙ্গিদের ফাঁসির রায় হয়েছে। কিন্তু সে রায় কার্যকর না করে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে তাদের ক্ষমা করে দেওয়ার ধৃষ্টতাপূর্ণ দাবি করেছেন এই ‘শিশু বক্তা’। তিনি এ ও বলেছেন, ‘এরশাদ শিকদারের মতো খুনিরা ফাঁসির রায় শুনে কাঁদে। আমার মুজাহিদ ভাইয়েরা ফাঁসির রায় শুনে হাসতে হাসতে মিডিয়ার সামনে কথা বলে।’

তিনি বিবাহিত কিনা এ নিয়েও সম্প্রতি গোলযোগের  সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে র‌্যাব সদর দফতরের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুহাম্মদ খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘রফিকুল ইসলাম মাদানীকে আটকের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বেশ চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমরা পেয়েছি। এ বিষয়ে র‌্যাব আইনগত পদক্ষেপ নেবে।’

গত ৭ এপ্রিল বুধবার দুপুরে নেত্রকোনা থেকে র‌্যাবের একটি দল তাকে পুনরায় আটক করে। এই ঘটনার পর তার সম্পর্কে আর নতুন কি কি তথ্য বের হয়ে আসে সেটাই দেখার বিষয় এখন।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button