ইতিহাসজীবনী

হাজ্জাজ বিন ইউসুফঃ মুসলিম ইতিহাসের পাতায় বিতর্কিত এক শাসক

নির্মম ও কঠোর দমননীতির কারণে জালেম ও অত্যাচারী শাসক হিসেবে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ঐতিহাসিক ভাবে কুখ্যাত হয়ে আছেন। সেই যুগের সৎ ও খোদাভীরু ব্যক্তিগণ হাজ্জাজকে খোদার মূর্তিমান আজাব বলে মনে করতেন। 

হাজ্জাজের ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে ওমর বিন আব্দুল আজিজ (র) বলেন, “দুনিয়ার সকল জাতি যদি তাদের সমস্ত কুকীর্তি নিয়ে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়, তাহলে আমরা কেবল হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কুকীর্তি হাজির করেই সকলকে টেক্কা দিতে পারি।”

জন্ম এবং পরিবার 

৬৬১ খ্রিস্টাব্দে, আরব উপদ্বীপের তায়েফ উপত্যকার বনু সাকাফ গোত্রে জন্মেছিলেন হাজ্জাজ বিন ইউসুফ। তার প্রকৃত নাম আবু মুহাম্মাদ আল-এজাজ্ব ইবনে ইউসুফ ইবনে আল-আক্কাম ইবনে আক্কেল আল-থাফাফি।

তার পিতার নাম ইউসুফ ইবনে হাকাম আল-থাকাফি এবং মা আল-ফারিআ বিনতে হাম্মাম ইবনে উরওয়া আল-থাকাফি। তার পিতা পেশায় একজন চিকিৎসক ছিলেন। আল-হাজ্জাজের প্রথম স্ত্রী ছিলেন নূমান ইবনে বশির আল-আনসারীর কন্যা উম্মে আবান।

কর্মজীবন

শিশুদের কুরআন শিক্ষা দেবার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন তিনি। তার প্রথম সরকারি চাকরি ছিল আরব উপদ্বীপের লোহিত সাগরের তীরের তিহামা অঞ্চলের তাবালার অখ্যাত এক গভর্নর হওয়া।

৬৮৫ খ্রিস্টাব্দে, আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান উমাইয়া খলিফা হলে, তার বাহিনীতে যোগ দিতে দামেশক চলে যান হাজ্জাজ। অল্প দিনেই উমাইয়া পরিবারের প্রতি আনুগত্য এবং এ পরিবারের বিরোধীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা তাঁকে খলিফার কাছাকাছি নিয়ে আসে।

খলিফা ইরাকে মুসাব ইবনে জুবাইরের বিরুদ্ধে অভিযান করতে যাবার সময় তার সৈন্যরা বিদ্রোহ করে বসলে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ সেই বিদ্রোহ দমন করেন। এতে খুশি হয়ে খলিফা তাকে তার সেনাবাহিনীর উচ্চপদে দায়িত্ব দিয়ে দেন।

যেসব নৃশংসতার জন্যে কুখ্যাত তিনি

হাজ্জাজ ছিলেন একজন অত্যাচারী শাসক৷ তার নানা অভিযানে প্রায় এক লাখ থেকে সোয়া লাখ মানুষ মারা যায়, এ কারণে পারস্য ও আরবের কুখ্যাত চারজনের তালিকায় তার নাম উঠে আসে, যারা কি না লক্ষাধিক মানুষ মেরেছেন।

উমাইয়া খেলাফতের সময়কার কথা। ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রাণঘাতী সংঘাতে লিপ্ত ছিলো মুসলিম সম্প্রদায়। ইসলামী খেলাফতেও তখন ভাঙ্গন দেখা দিয়েছিলো। আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রাঃ) ইরাক ও হিজাযে স্বাধীন হুকুমত প্রতিষ্ঠা করেন তখন। তিনি ছিলেন ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর (রাঃ) এর মেয়ে আসমা বিনতে আবু বকর (রাঃ) এর ছেলে এবং হিজরতের পর মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া প্রথম শিশু।

তিনি উমাইয়া খেলাফতের আনুগত্য করতে অস্বীকৃতি জানানোয় উমাইয়া শাসকের সাথে তাঁর সংঘাত দেখা দেয়। যার কারণে বনি উমাইয়ার সবচাইতে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। তাই উমাইয়া খলিফার নির্দেশে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ নিতান্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেন আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা) কে। তারা তাঁর মৃতদেহ থেকে মাথা কর্তন করে, তার দেহ ক্রুশবিদ্ধ করে। এর পুরস্কার হিসেবে খলিফা হাজ্জাজকে হেজাজ (সৌদি), ইয়েমেন আর ইয়ামামার গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করেন।

এছাড়াও জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা) এবং কুমাইল ইবনে জিয়াদ (রা)- এ দুই সাহাবী শাহাদাতবরণ করেন তার হাতে।

৭১৪ খ্রিস্টাব্দের মে মাস, জীবনের শেষভাগে এসে হাজ্জাজ যে হত্যাকাণ্ডটি করেন সেটি ছিল বিখ্যাত সাইদ ইবনে জুবাইরের। তিনি হাজ্জাজের বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। এ বিদ্রোহ দমনের পর সাইদ মক্কায় পালিয়ে গেলেও, তাকে ধরে নিয়ে আসা হয় হাজ্জাজের দরবারে। মাত্র ৪৯ বছর বয়সে নিষ্ঠুরভাবে হাজ্জজের হাতে শহীদ হন সাইদ। 

হযরত হাসান বসরীর কাছে সাইদ বিন জুবাইরের হত্যার সংবাদ পৌঁছানোর পর তিনি বলেন, “হে আল্লাহ! হে পরাক্রমশালীদের চূর্ণ-বিচূর্ণকারী! হাজ্জাজকে তুমি চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দাও!”

হাসান বসরী (র) ছিলেন তাদের একজন যারা হাজ্জাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হোক চাইতেন না। তার মতে, “হাজ্জাজ একটা গজব, তলোয়ার দিয়ে গজবের মোকাবেলা হয় না। কাজেই, ধৈর্য ধরে প্রার্থনা করতে হবে।”

ইবনে কাসির (র) হাজ্জাজ সম্পর্কে বলেন, “হাজ্জাজের যেসব কাজ আমরা নিশ্চিত জানি তার মাঝে তার রক্তপাত ঘটানো প্রধান। এটিই আল্লাহর কাছে তার শাস্তি পাবার জন্য যথেষ্ট।” 

ইসলামে অবদান

এই অত্যাচারী আর খুনী ভদ্রলোক কিন্তু একই সাথে ছিলেন কুরআনের হাফেজ। প্রতি রাত তার কাটতো কুরআন তেলাওয়াত করে।

হাজ্জাজ বিন ইউসুফের আমলেই কুরআনকে ত্রিশ খণ্ডে ভাগ করা হয়। এমনকি আজকের যুগে অনারব মুসলিমরা যে কুরআন পাঠ করছে সহজভাবে, এর কৃতিত্ব হাজ্জাজ বিন ইউসুফের। কারণ তিনিই আরবি অক্ষরগুলোর সাথে নুকতা চিহ্নগুলো যোগ করেন কুরআনে! (১০ম খণ্ড, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, পৃষ্ঠা ১৯৬)।

এছাড়াও সামরিক কমান্ডারদের বাছাইয়ের সময় হাজ্জাজ বিন ইউসুফ কঠোর নীতি অবলম্বন করতেন। সৈনিকদের র‍্যাঙ্কের ক্ষেত্রে তিনি শৃঙ্খলা আরোপ করেন। এর পদক্ষেপ মুসলিম সাম্রাজ্যের দূর বিস্তৃতিতে সহায়ক হয়েছিল। তিনি সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল আরবিতে অনুবাদের ব্যবস্থা করেন। তিনিই প্রথমবারের মত  খলিফা আবদুল মালিককে মুসলিম বিশ্বের জন্য বিশেষ মুদ্রা চালুর ব্যাপারে রাজি করাতে সক্ষম হন।

হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তার দৃঢ় শাসনের জন্য বহুল বিদিত, কঠোরভাবে তিনি রাজ্যশাসন করতেন- নিয়মের যেন কোনো ব্যত্যয় না হয় কোথাও।

৬৯৩ এবং ৬৯৪ সালে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ নিজে হজ্জ করেন এবং কাবাকে নবী (সা) এর আমলের আকৃতিতে ফিরিয়ে আনেন।

হাজ্জাজ যতদিন শাসন করেছিলেন হেজাজে, কোনো বিদ্রোহ হয়নি আর, অর্থাৎ তথাকথিত ‘শান্তি’ বজায় ছিল। কিন্তু শান্তি বজায় রাখতে গিয়েই নৃশংস হয়ে যেতেন তিনি।

জীবনের শেষ দিনগুলো 

সাইদ ইবন জুবাইর কে হত্যা করার পরই হাজ্জাজ পাগল হয়ে যান। যখনই তিনি ঘুমাতেন, ঘুমের মাঝে সাইদকে দেখতেন। জীবনের এই পড়ন্তবেলায় তিনি নিজের অপরাধ নিয়েও চিন্তিত হয়ে পড়েন। 

৭১৪ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে, সাইদকে হত্যার এক মাসের মাঝে এবং হাসান বসরির কাছে সংবাদ পৌঁছানোর তিনদিনের মাঝে হাজ্জাজ মৃত্যুবরণ করেন। তার বয়স তখন ৫৩ বছর। তার পেটে পোকা হয়েছিল, দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়েছিল এবং এ কারণেই তার মৃত্যু হয় বলে জানা যায়। 

প্রবল রক্তপাতকারী হাজ্জাজ কখনো সাহাবী-হন্তারক নামে ঘৃণিত, আবার কখনো সিন্ধু বিজয় আর তার কুরআন-প্রেমের জন্য প্রশংসিত। ইতিহাসের পাতায় তাই বিতর্কিত শাসকের পাতাতেই হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নাম।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button