ইতিহাসপ্রযুক্তি

টেসলা মোটরস কিভাবে বিশ্ব কাপাচ্ছে?

দীর্ঘ কয়েক দশক যাবৎ পৃথিবীর মানুষ গাড়ি বলতেই ভাবত গ্যাস ও তেল চালিত কিছু যন্ত্রের নাম। দিনকেদিন তেলের যোগান পৃথিবীতে কমে আসছিল, তেল নিয়ন্ত্রণকারী দেশগুলোও বেশ ফুলে ফেঁপে উঠছিল, পরিবেশবাদীদের মাথার ভাঁজও দিনকেদিন চওড়া হচ্ছিল। তেল চালিত গাড়ি পৃথিবীর পরিবেশে হানছিল বিরাট আঘাত। এ সকল সমস্যার সমাধান করতে গতানুগতিক গাড়ির ধারণাটাই বদলে দিতে যেন ২০০৩ সালের ১ জুলাই মার্টিন এবারহার্ড এবং মার্ক টার্পেনিং নামক দুই স্বপ্নবাজ ইঞ্জিনিয়ার বৈদ্যুতিক গাড়ির অভিনব আইডিয়া নিয়ে “টেসলা মোটরস” নামের কোম্পানিটিকে সাথে নিয়ে যাত্রা শুরু করেন।

টেসলা নামটি বিখ্যাত সাইবেরিয়ান তড়িৎ গবেষক “নিকোলা টেসলার” নামানুসারে করা হয়। 

শুরুর দিকে নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করেই কোম্পানিটি চালাচ্ছিলেন এ দুই ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু গাড়ি উৎপাদন সহ ম্যানুফ্যাকচারের দিকে যেতে হলে প্রয়োজন ছিল বিশাল বিনিয়োগের। গল্পের এ পর্যায়ে চিত্রনাট্যে অনুপ্রবেশ ঘটে বর্তমান বিশ্বের সবচাইতে বড় ধনকুবের পেপাল সহ নানা যুগান্তকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক “এলন মাস্কের”।  

এলন মাস্ক তখন নতুন নতুন বিলিয়োনিয়ার হয়েছিলেন৷ তার কাছে থাকা বিশাল অংকের টাকাকে তিনি যোগ্য কোন জায়গায় ইনভেস্টের চিন্তাও করছিলেন। এসময় এলন মাস্কের নজরে আসে ” টেসলা” কোম্পানিটি। এলন মাস্কের দূরদর্শী চিন্তাভাবনা খুব সহজেই অনুধাবণ করতে পারে বৈদ্যুতিক গাড়ি ভবিষ্যতে কতটা অভিনব বিপ্লব আনতে পারে । সে সূত্রেই তিনি প্রথমে সাড়ে ছয় মিলিয়ন ডলার টেসলাতে বিনিয়োগ করেন একইসাথে কোম্পানিটির চেয়ারম্যান বনে যান। 

টেসলা তার প্রথম কারের মডেল প্রকাশ করে ‘রোডস্টার’ নামে।  বছরদুইয়েক পরই কোম্পানিটিতে বিনিয়োগ করেন গুগলের দুই প্রতিষ্ঠাতা “ল্যারি পেইজ” ও “সার্গেই ব্রেইন “। 

এলন মাস্ক

কোম্পানিটির এ পর্যায়ে “এলন মাস্ক” করে বসেন এক অদ্ভূত অভিনব পাবলিসিটি স্টান্ট। কোন কোম্পানিই সাধারণত তাদের পরিকল্পনা জনসম্মখে আসতে দিতে চায় না। 

“এলন মাস্ক” এক্ষেত্রে কোম্পানিটি ভবিষ্যতে কি করতে চায় তা ঘটা করে ঘোষণা করে দেয়। যার আবার তিনি নাম দেন “দ্য সিক্রেট মাস্টারপ্ল্যান!” 

সহজ ভাষায় এলন মাস্কের পরিকল্পনা অনেকটা এরকম ছিলো;

 টেসলা প্রথমে একটি বিলাসবহুল  বৈদ্যুতিক স্পোর্টস কার নির্মান করবে যেটি ক্রয়ের সামর্থ্য শুধু ধনীদেরই থাকবে। 

সে স্পোর্টস কারটি বিক্রি করে যে টাকা টেসলা পাবে তা দিয়ে সে আরো একটি গাড়ি বানাবে, যার দাম আগের মডেল টির চেয়ে কম হবে। 

এবার এ মডেলটি বিক্রি করে যে টাকা টেসলা পাবে তা দিয়ে আরো কম দামে আরো মডেল তারা বাজারে নিয়ে আসবে। যার মাধ্যমেধীরে ধীরে বৈদ্যুতিক কার কে তারা মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসতে চায়।

এলন মাস্কের এ সিক্রেট মাস্টারপ্ল্যান এখনকার টেসলা কোম্পানির পরিস্থিতি বিবেচনায় শুনতে বেশ স্বাভাবিক মনে হলেও যখন তিনি কথাগুলো বলেছিলেন তখনকার সময়ের বিবেচনায় কথাগুলো আসলেই হাস্যরসাত্মক ভাবা হচ্ছিল।

প্রথমত, কোম্পানিটি মাত্র কিছুদিন আগেই অল্পের জন্য দেওলিয়া হওয়া থেকে বেঁচেছিল, উপরন্তু বৈদ্যুতিক গাড়ির ধারণাটিই মানুষের জন্য তখন নতুন ছিল, মানুষ ভাবতেও পারে নি একটি বৈদ্যুতিক গাড়ি এতটা ইম্পেক্টফুল হবে যে তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা আদৌ সম্ভব হবে বা তা এতটা গ্রহণযোগ্য হবে। 

মানুষের হাস্যরসের বস্তু হলেও এ পরিকল্পনা প্রকাশের মাধ্যমে এলন মাস্ক যে একটি জায়ান্ট বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কথা ভেবেছেন তার মেসেজ চলে গিয়েছিল সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের কাছে । টেকনিক্যালি এলন মাস্ক তার এ মার্কেটিং স্টান্টে শতভাগ সফল ছিলেন বলা চলে। 

কিছুদিন পরই এবার টেসলা তাদের প্রথম বৈদ্যুতিক গাড়ি “রোডস্টার” এর প্রটোটাইপ উন্মোচন করে৷ কিন্তু বিপত্তি বাধে অন্য জায়গায় প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মার্টিন এবারহার্ড কোম্পানিটির সিইও হয়ে রইলেও ফিল্ডটিতে তাদের আদৌ কোন দক্ষতা ছিলো না। কাজেই রোডস্টারের কাজ শেষ হতে অনুমানের চেয়েও অনেক বেশি সময় লেগে যায় এবং একইসাথে প্রকল্পটির বাজেটও বেড়ে যায়। মারাত্বক আর্থিক ক্ষতির সম্মুক্ষীন হয় টেসলা। অবস্থা বিবেচনা করে সিইও পদ থেকে পরামর্শক কমিটিতে পাঠিয়ে দেন এবারহার্ডকে এলন মাস্ক । নিজেরই প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিতে পদাবনতি মানতে পারেননি এবারহার্ড।  ২০০৮ এ কোম্পানিটির সাথে সকল সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলেন কোম্পানিটির প্রতিষ্ঠাতারা এবারহার্ড ও টর্পেনিং। এ পর্যায়ে এলন মাস্ক সিইও পদে নিয়োগ দেন জেভ ড্ররি নামক এক ব্যাক্তিকে। মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ চলতে থাকলেও রোডস্টার নির্মান সম্পন্ন হয়ে যায়। 

২০০৮ সালের মার্চে অফিসিয়ালি লঞ্চ হয় “রোডস্টার” নামক টেসলার প্রথম কার। দাম নির্ধারণ করা হয় ৮০ থেকে ১ লক্ষ ২০ হাজার ডলারের মধ্যে। একবার পরিপূর্ণ চার্জ দিয়ে গাড়িটি অতিক্রম করতে পারত ২৫০ কিমি। বাজারে আসার পর পরই মার্কেটে তুমুল জনপ্রিয়তা প্রায় রোডস্টার। প্রচুর অর্ডার আসতে শুরু করে। কিন্তু এখানেও আরেক বিপত্তি বাগড়া দিয়ে বসে। অর্ডারকৃত কারগুলো ম্যানুফ্যাকচারের জন্য প্রয়োজন পড়ত প্রচুর টাকার। কিন্তু নির্মানের মেয়াদকাল বেড়ে যাওয়ার কারণে কোম্পানিটি ছিল দেওলিয়ার দ্বার প্রান্তে প্রায়। মাত্র ১০ মিলিয়ন ডলারের মত হাতে ছিল কোম্পানিটির। কোম্পানিটির এরূপ দশায় এলন মাস্ক এবার নিজেই মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নেন। নিজেই কোম্পানিটির সিইও পদে বসে যান। 

সিইও পদে এসেই ২৫% লোক কে ছাটাই করেন তিনি, এছাড়াও এলন মাস্কের মত মানুষ কোম্পানিটির সরাসরি নেতৃত্বে আসায় বড় বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের চোখ আটকে যায় কোম্পানিটির প্রতি। ডাইমলার এজি নামক এক কোম্পানি ৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে কিনে নেয় কোম্পানিটির ১০% শেয়ার এছাড়াও একই বছর আমেরিকার এনার্জি ডিপার্টমেন্ট এলন মাস্কের ঋণ আবেদন মঞ্জুর করে ৪৬৫ মিলিয়ন ডলারের বিশাল অংকের ঋণ প্রদান করে। ফলে প্রায় ধবংসের হাত থেকে রক্ষা পায় টেসলা। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয় নি টেসলাকে। 

রোডস্টার বিক্রিত অর্থে আমেরিকান শেয়ার মার্কেটে প্রবেশ করে টেসলা। এরপরই ২০১১ সালে মডেল এস নামে দ্বিতীয় সংস্করণ বের করে কোম্পানিটি । যার মূল্য নির্ধারণ করা হয় মাত্র ৭৬ হাজার ডলার। যা আগের মডেলটির এক তৃতীয়াংশের সমান বলা চলে। রোডস্টারের মত মডেল এস ও মার্কেট জয় করে নেয়। 

এ মডেলটির সাথে সাথেই এলন মাস্ক খেলেন তার আরেকটি মাস্টারস্ট্রোক। সাধারণ গাড়ির যেমন পেট্রল পাম্প স্টেশন থাকে তেমনই ২০১২ সালে আমেরিকায় চালু করেন ৬ টি দ্রুতগতির চার্জিং স্টেশন, ফলে যেখান থেকে গ্রাহকরা দ্রুত তাদের গাড়ি চার্জ করতে পারে। সংখ্যায় মাত্র ৬ টি দ্বারা শুরু করা স্টেশনের বর্তমান সংখ্যা পৃথিবীব্যাপী আজ বারো হাজারেরও বেশি।   

গিগাফ্যাক্টরি

এতেই থেমে থাকলেন না এলন মাস্ক। বাজারে ক্রমে যতই টেসলার গাড়ি বাড়তে থাকল, চাহিদা বাড়তে থাকল গাড়ির আভ্যন্তরীণ বৈদ্যুতিক পার্টসের। এরই সমস্যা নিরসনকল্পে টেসলা লঞ্চ করে তাদের ‘গিগাফ্যাক্টরি’।

২০১৪ সালে টেসলা কোম্পানি তাদের এ যাবৎকালের সকল প্রযুক্তিকে ওপেন সোর্স হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে যে কেও টেসলা কোম্পানির প্রযুক্তিগুলোকে বিনা কপিরাইট ইস্যুতে ব্যবহার করার অধিকার পায়। 

২০১৯ সাল পর্যন্ত টেসলা বাজারে ছাড়ে আরো বেশ কয়েকটি মডেল যার এখন পর্যন্ত সর্বনিম্ন মূল্য চল্লিশ হাজার ডলার  মানে এলন মাস্ক তার করা সেই সিক্রেট মাস্টারপ্ল্যান এর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মাত্র তেরো বছরের মাথাতেই বৈদ্যুতিক গাড়িকে মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসেন। কিন্তু মাঝে আরো কিছু বিপত্তি ঘটে গিয়েছিল, কোম্পানির কিছু আভ্যন্তরীণ ঝামেলার কারণে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে বহিস্কৃত হন এলন মাস্ক, কিন্তু কোম্পানিটিতে তার অসাধারণ সাফল্যের কারণে আজও তিনি কোম্পানিটির সিইও পদে রয়ে গিয়েছেন।  টেসলার সর্বশেষ সংযোজন হতে যাচ্ছে তাদের “সাইবারট্রাক” মডেল যার প্রোটোটাইপ ডিজাইন দেখলে আপনি হঠাৎই ভাবতে বাধ্য এলিয়েনদের কোন যন্ত্র ভুলে এ ধরায় চলে এসেছে। 

সাইবারট্রাক

এত গেল কোম্পানিটির গল্প শুধু কি বৈদ্যুতিক কার হওয়ার জন্যই এটির এতটা জনপ্রিয়তা? আসলে মোটেই তা নয়,

কারগুলোর ডিজাইন থেকে শুরু করে ফিচারস প্রত্যেকটিই একটি আরেকটিকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

মডেল “এস” নামক গাড়িটি একবার চার্জেই চলতে পারে ৫০০ কিলোমিটার! ০ থেকে ১০০ কিমি.ঘন্টায় স্পিড যেতে গাড়িটি সময় নেয় মাত্র ৪.৪ সেকেন্ড! 

ইলেট্রিক এ গাড়িগুলো চলার সময় এতটাই কম শব্দ করে যে “ফিস ফিস ” করে কথা বললেও তা শুনা সম্ভব।  

গাড়িগুলোতে ঢুকলেই চালক প্রথমেই ১৭ ইঞ্চির টাচস্ক্রিনের একটি বিশাল মনিটর দেখতে পান। যেটি বর্তমানের অনেকটা এন্ড্রয়েড মোবাইল সিস্টেমের মত।  যার মাধ্যমে সানরুফ থেকে শুরু করে গাড়ির হেডলাইট পর্যন্ত সবকিছু নাড়ানো চাড়ানো যায়।গাড়িগুলো সম্পূর্ণ কম্পিউটার দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এমনকি গাড়িটির নতুন কোন ফিচার আসলে ঘরে বসেই তা অনেকটা বর্তমান মোবাইলের সফটওয়ার আপডেটের মত করে ডাউনলোড করে নেয়া সম্ভব!  এছাড়াও গাড়িগুলো সর্বাধিক ইনভায়রনমেন্ট ফ্রেন্ডলি  কোন কার্বন নিঃসরণ করে না। 

২০১৬ সাল থেকেই গাড়িগুলো স্বয়ংক্রিয় ড্রাইভিং মুড সংযুক্ত করা হয়েছে। গাড়িগুলোতে রয়েছে ৮ টি হাই কোয়ালিটির ক্যামেরা, ১২ টি আল্ট্রাসোনিক ডিটেকটিভ মোশন, ফ্রন্ট ফেসিং রাডার সিস্টেম। যা গাড়িগুলোর ঝুকিপূর্ণতা নামিয়ে এনেছে প্রায় শূন্যের কোঠায়। গাড়িটি বিদ্যৎনির্ভর হওয়ায় যেকোন দূর্ঘটনায় গাড়িটি বিস্ফোরিত হবে না।  এসকল কারণের জন্যই বিশেষজ্ঞ বিবেচনায় অবিশ্বাস্য হলেও সত্য ৫ এর মধ্যে ৫.৪ পয়েন্ট পেয়ে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ কার হিসেবে বিবেচিত টেসলা।  

কোম্পানিটি বর্তমানে তাদের প্রতিষ্ঠানটিকে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার কাজ করে যাচ্ছে। যারই ফলস্বরূপ কিছুদিন আগেই ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে অফিসিয়ালি প্রবেশ করেছে দ্য টেসলা। ইতিমধ্যে কোম্পানিটিতে কর্মী নিয়োগ কার্যক্রমও শুরু হয়ে গিয়েছে। 

বিরাট স্বপ্ন নিয়ে আগানো ‘এলন মাস্ক’ হেটে যাচ্ছেন পরিবেশবান্ধব টেসলা কে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার দৌড়ে, বর্তমান বিশ্বের কার মার্কেটের ১২ শতাংশ ক্রেতা নিজেদের অধিকারে রাখা কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ যে খুব বেশি কঠিন হবে না তা আজ বলাই যায়।

মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ খাঁন 

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

Show More

MK Muhib

A researcher,An analyst,A writer,A social media activist,student at University of dhaka.

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button