ইতিহাস

আলেকজান্ডার যে কারণে ভারতবর্ষ জয় করতে পারেনি

অর্ধ পৃথিবীর একচ্ছত্র অধিপতি নামে খ্যাত আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট এর নাম শুনেনি এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে জন্ম নেওয়া এই বীর কে আজো যেমন পৃথিবীর মানুষ মনে রেখেছে, বলাই বাহুল্য আরো আড়াই হাজার পরেও মানুষ মনে রাখবে তাকে। 

প্রাচীন গ্রিসের ম্যাসিডনের রাজা আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী এবং অত্যন্ত সুপুরুষ ছিলেন তিনি। বলিষ্ঠ চেহারায় রূপ আর শক্তির মিশেলে তিনি অন্য সব রাজার থেকে ছিলেন ব্যতিক্রম। মাত্র ৩০ বছর বয়সেই অ্যাড্রিয়াটিক সাগর থেকে সিন্ধু নদ পর্যন্ত এক বিশাল সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হয়ে ওঠেন আলেকজান্ডার। গ্রিসের ছোট্ট রাজ্য ম্যাসিডন ছাপিয়ে প্রায় অর্ধেক পৃথিবী জয় করেছিলেন তিনি। সেই জন্যেই ‘অর্ধ পৃথিবীর অধীশ্বর’ নামে বলা হয় তাকে। 

কিন্তু যথেষ্ট শক্তি এবং সৈন্য সামন্ত থাকার পরেও ভারত কেনো জয় করতে পারলেন না আলেকজান্ডার, এই নিয়ে অনেকের ই কৌতূহল জাগ্রত হয়। তা নিয়েই আজকের আয়োজন।

আলেকজান্ডার ৩৫৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে, গ্রিক মাস ‘হেকাতোম্বাইওন’ এর ষষ্ঠ দিনে বা ২০ অথবা ২১ শে জুলাই ম্যাসিডন রাজ্যের পেল্লা নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ম্যাসিডনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ ও তার চতুর্থ স্ত্রী অলিম্পিয়াসের পুত্র ছিলেন।

৩৩৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, আলেকজান্ডার এর যখন ২০ বছর বয়স। তখনই তার বাবা দ্বিতীয় ফিলিপ মৃত্যুবরণ করেন। ম্যাসিডোনিয়ার সম্ভ্রান্ত ও সেনাবাহিনীর সমর্থনে আলেকজান্ডার মাত্র ২০ বছর বয়সে ম্যাসিডোনিয়ার শাসক হিসেবে সিংহাসনলাভ করেন।

দ্বিতীয় ফিলিপ মারা যাওয়ার পর সাম্রাজ্যের নানা জায়গায় বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল, সিংহাসনে বসেই সেগুলোকে দমন করেন আলেকজান্ডার।

এরপর রাজ্য বিস্তারে মনোনিবেশ করেন তিনি। যারা ই আলেকজান্ডারের কর্তৃত্ব মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, আলেকজান্ডার তাকেই পরাভূত করে সেই রাজ্য দখল করে নিয়েছেন। মেসিডোনিয়ার সিংহাসনে বসার পর আলেকজান্ডার আর মাত্র ১৩ বছর জীবিত ছিলেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি জয় করে নেন পারস্য, মিশর, ব্যবিলন ও ভারতের পাঞ্জাব।

বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে তিনি অনেকটা পথ অতিক্রম করার পর পারস্য আক্রমণ করেন। যুদ্ধে পরাজিত হন পারস্যের সম্রাট তৃতীয় দারিয়ুস। যুদ্ধে জিতে আলেকজান্ডার নিজেকে এশিয়ার অধিপতি ঘোষণা করলেন। একের পর এক রাজ্য দখল করতে করতে তিনি এগিয়ে আসেন ভারতীয় উপমহাদেশের দিকে।

খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে, আলেকজান্ডার ভারতবর্ষ আক্রমণ করেন। ভারতবর্ষের ইতিহাসে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। সে সময় উত্তর-পশ্চিম ভারত অনেকগুলো পরস্পর বিবাদমান ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত ছিল। তাদের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বহিরাক্রমণ ঠেকানো সম্ভব ছিল না।

৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, সিন্ধু নদী পার করে আলেকজান্ডার তাঁর সেনাবাহিনীকে নিয়ে ভারত ভূখণ্ডে পা রাখলেন। প্রথমেই আশেপাশের সব রাজা ও গোষ্ঠীপ্রধানদের আত্মসমর্পণের বার্তা পাঠান তিনি। তক্ষশিলার রাজা ‘অম্ভি’ তার নিকট স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেন। কিন্তু এভাবে সবাই ম্যাসিডোনিয়ার সম্রাটের নিকট নতি স্বীকার করতে চায়নি। একের পর এক যুদ্ধ হয়। পুষ্কলাবতীর রাজা ‘অষ্টক’, অশ্বক জাতি, রাভি নদীর উপকূলে ছড়িয়ে থাকার রাজ্যগুলোর শাসকেরা পরাজিত হলেন গ্রিক বাহিনীর কাছে। কিন্তু ঝিলামের রাজা ‘পুরু’ তাঁর বিরুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে পরাজিত ও বন্দী হন। 

যুদ্ধের শেষে আহত পুরুকে আলেকজান্ডারের কাছে ধরে নিয়ে যাওয়া হলে তিনি পুরুকে জিজ্ঞেস করেন, “আপনি আমার থেকে কী ধরনের আচরণ প্রত্যাশা করেন?” পুরু উত্তর দিলেন, “একজন রাজার আরেকজন রাজার সঙ্গে যেরকম আচরণ করা উচিত, সেই রকম”। এই জবাব শুনে পুরুকে মুক্তি দেন আলেকজান্ডার।

পরবর্তীতে বিপাশা নদী পর্যন্ত তিনি অগ্রসর হয়েছিলেন। এখানে তিনি ‘নিকাসিয়া’ এবং তাঁর প্রিয় ঘোড়া যে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিয়েছিল সেই ‘আলেকজান্ডার বুসেফেলাস’এর নামে দুটি নগরীর পত্তন করেন।

আলেকজান্ডারের সামনে সর্বসাকূল্যে তখন একটাই বাধা। বিপাশা নদীর ওপারের পরাক্রমশালী রাজ্য ‘গঙ্গারিডাই’। ভারতের মূল ভূখণ্ড। এটুকু জয় করতে পারলেই সমগ্র ভারত তার দখল হয়ে যাবে। যে স্বপ্ন নিয়ে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন গ্রিক রাষ্ট্র মেসিডোনিয়া থেকে, তা পরিপূর্ণতা পাবে। গঙ্গারিডাই রাজ্যের রাজা ও  তার বিশাল বাহিনী নিয়ে নদীর এপাড়ে আলেকজান্ডারকে প্রতিহত করতে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যান।

অন্যদিকে আলেকজান্ডার তাঁর সৈন্যদের নিয়ে গঙ্গারিডাই আক্রমণের জন্য পরিকল্পনা করতে বসেছিলেন। কিন্তু তাঁর কোনো সেনাপতিই এই রাজ্য আক্রমণ করতে রাজি হলেন না। গ্রিক দূত মেগাস্থিনিস (৩৫০ খ্রিষ্টপূর্ব-২৯০ খ্রিষ্টপূর্ব) তাঁর ‘ইণ্ডিকা’ বইতে লিখেছেন, “গঙ্গারিডাই রাজ্যের বিশাল হাতিবাহিনী ছিল। এই বাহিনীর জন্য এ রাজ্য কোনোদিন বিদেশিদের কাছে পরাজিত হয়নি। এদের হাতিবাহিনীর সংখ্যা ও শক্তিতে বাকি রাজ্যগুলি আতঙ্কিত থাকত”। 

এ ব্যাপারে ডিওডোরাস (৯০ খ্রিষ্টপূর্ব-৩০ খ্রিষ্টপূর্ব) বলেন, “ভারতের সমূদয় জাতির মধ্যে গঙ্গারিডাই সর্বশ্রেষ্ঠ। এই গঙ্গারিডাই রাজার সুসজ্জিত ও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত চার হাজার হস্তী-বাহিনীর কথা জানিতে পারিয়া আলেকজান্ডার তাহার বিরূদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হইলেন না”। 

এছাড়াও ২ লক্ষ পদাতিক সৈন্য, ২০ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য, ২ হাজার রথ ছিলো এই রাজ্যের। তাই গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডার আশঙ্কা করেছিলেন যে গঙ্গারিডাই আক্রমণের পরিণতি হবে ভয়াবহ।

এছাড়াও আলেকজান্ডারের সৈন্যরা বছরের পর বছর মাতৃভূমির বাইরে যুদ্ধ করতে করে খুবই ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিল। তারা আর সামনে অগ্রসর হতে চাইলনা। তারা নিজেদের বাবা-মা-স্ত্রী-সন্তানদের দেখতে ও জন্মভূমিতে ফিরতে হয়ে উঠেছিল উদ্গ্রীব। তাই বাধ্য হয়ে তিনি ফিরে গেলেন পাঞ্জাব থেকে। ফেরার পথে বিজিত অঞ্চলগুলোতে শাসন পাকাপোক্ত করার জন্য কিছুদিন করে অবস্থান করেন আলেকজান্ডার।

ভারত থেকে প্রত্যাবর্তনের কিছুদিন পর খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মাত্র ৩৩ বছর বয়সে ব্যবিলনে তার অকাল মৃত্যু হয়। 

মৃত্যুর পর আলেকজান্ডারের সাম্রাজ্য তাঁর ৭ জন সেনাপতি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন। ভারত পড়েছিল সেনাপতি সেলুকাসের ভাগে। তবে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের উত্থানের কারণে ভারতবর্ষে গ্রিক শাসন বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। তিনি ভারত ত্যাগের পর প্রায় দুই বৎসর তার বিজিত অঞ্চলসমূহে গ্রিক শাসন বজায় ছিল।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button