জীবনী

ক্রাউন প্রিন্স শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানঃ সবচেয়ে শক্তিশালী আরব শাসক

শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান, যিনি তাঁর নামের আদ্যাক্ষর ‘এমবিজেড’ নামেই বেশি পরিচিত।

২০১২ সালে, ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ তাকে সবচেয়ে শক্তিশালী আরব শাসক এবং পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী পুরুষ হিসাবে ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়াও তাকে পৃথিবীর ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির একজন হিসেবে গণ্য করা হয়। 

কিন্তু কে এই মোহাম্মদ বিন জায়েদ! চলুন জেনে নেওয়া যাক।

মোহাম্মদ বিন জায়েদ, আবু ধাবির বর্তমান ক্রাউন প্রিন্স এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সশস্ত্র বাহিনীর ডেপুটি সুপ্রিম কমান্ডার। সংযুক্ত আরব আমিরাতের হস্তক্ষেপবাদী বৈদেশিক নীতির পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেন তিনি। আরব বিশ্বে ইসলামপন্থী আন্দোলনের বিরুদ্ধে অভিযানের মূল নেতা ও তিনি। 

জন্ম এবং পরিবার

মোহাম্মদ বিন জায়েদ ১৯৬১ সালের ১১ ই মার্চ, আরব আমিরাতের আল আইনে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম মোহাম্মদ বিন জায়েদ বিন সুলতান বিন জায়েদ বিন খলিফা বিন শাখবুত বিন ধিয়ব বিন ইসা আল নাহিয়ান আল ফালাহী। 

চিত্রঃ শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান

তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং আবুধাবির শাসক জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান এবং তাঁর তৃতীয় স্ত্রী শেখা ফাতিমা বিনতে মোবারক আল কেতবী এর তৃতীয় পুত্র। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রপতি শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের ভাই। 

১৯৮১ সালে, শেখা সালামা বিনতে হামদান বিন মোহাম্মদ আল নাহায়ানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন তিনি। তাঁদের চার ছেলে এবং পাঁচ মেয়ে রয়েছে।

শিক্ষাজীবন

শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ রাবাত এর রয়্যাল একাডেমিতে পড়াশোনা করার মাধ্যমে তার শিক্ষাজীবন শুরু করেন। ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত আমিরাতের আল আইন ও আবু ধাবির স্কুলগুলিতে পড়াশোনা করেন তিনি। আমিরাতে, তার বাবা শেখ জায়েদ ‘ইজজেদিন ইব্রাহিম’ নামে একজন সম্মানিত মিশরীয় মুসলিম ব্রাদারহুডের ইসলামী পন্ডিতকে তাঁর শিক্ষার দায়িত্বে নিযুক্ত করেছিলেন।

পরবর্তীতে তার বাবা তাকে অনুশীলনের মাধ্যমে সুশৃঙ্খল অভিজ্ঞতা অর্জন করার জন্যে মরক্কো তে পাঠিয়ে দেন। সেখানে একটি স্থানীয় রেস্টুরেন্টে ওয়েটার হিসাবে কাজ করে বেশ কয়েক মাস ব্যয় করেছিলেন আল নাহিয়ান।

১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল, তিনি মর্যাদাপূর্ণ রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি সানহার্স্টে যোগদান করেছিলেন। যেখানে তিনি বর্ম, হেলিকপ্টার উড্ডয়ন এবং প্যারাট্রোপের প্রশিক্ষণ নেন। সানহুর্স্টে থাকাকালীন তাঁর সাথে মালয়েশিয়ার ভবিষ্যৎ রাজা আল সুলতান আবদুল্লাহর সাথে সাক্ষাত হয় এবং তারা ভালো বন্ধু হয়েছিলেন। তারা দুজনেই রয়েল মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহার্স্টের অফিসার ক্যাডেট ছিলেন।

কর্মজীবন

স্নাতক শেষ করার পর তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজায় অফিসার্স ট্রেনিং কোর্সে যোগ দিতে দেশে ফিরে আসেন। আমিরাত সেনাবাহিনীর আমিরি গার্ডের (ইউএইর অভিজাত সুরক্ষা বাহিনী) কর্মকর্তা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিমান বাহিনীর পাইলট থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সশস্ত্র বাহিনীর ডেপুটি সুপ্রিম কমান্ডার সহ বেশ কিছু রাষ্ট্রীয় কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।

২০০২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে আবুধাবি সরকারের মূল বিনিয়োগের বাহনকে প্রতিনিধিত্বকারী ‘মুবাডালা ডেভলপমেন্ট কোম্পানি’র চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন।

২০০৪ সালের ডিসেম্বর থেকে, তিনি আবুধাবি এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োজিত আছেন। 

২০০৫ সালের জানুয়ারিতে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সশস্ত্র বাহিনীর উপ-সর্বোচ্চ কমান্ডার নিযুক্ত হন। পরবরর্তীতে তাকে জেনারেল পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। 

এছাড়াও তিনি দেশের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদ ‘আবুধাবি কাউন্সিল ফর ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট (এডিসিইডি)’ এর প্রধান, আবুধাবি শিক্ষা কাউন্সিলের প্রধান এবং তাওয়াজুন অর্থনৈতিক কাউন্সিলের প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

আল নাহিয়ান আমিরি গার্ডের (বর্তমানে প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ড হিসাবে পরিচিত) সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিমান বাহিনীর পাইলট, বিমান প্রতিরক্ষা কমান্ডার এবং উপ-সশস্ত্র বাহিনীর ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। 

এছাড়াও তিনি আবু ধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির সুপ্রিম পেট্রোলিয়াম কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান।

রাজনৈতিক জীবন 

২০০৩ সালের নভেম্বরে, শেখ মোহাম্মদ এর বাবা তাকে আবু ধাবির ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স নিযুক্ত করেছিলেন। পিতার মৃত্যুর পরে ২০০৪ সালের নভেম্বরে, তিনি আবু ধাবির ক্রাউন প্রিন্স হন। তিনি তাঁর বড় ভাই সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রপতি খালিফা বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এর বিশেষ উপদেষ্টা হিসাবেও কাজ করছেন। শেখ খলিফা বিন জায়েদের অসুস্থতার কারনে আল নাহিয়ান সংযুক্ত আরব আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

২০১৪ সালের জানুয়ারিতে, আবু ধাবির আমির খলিফা স্ট্রোকের শিকার হওয়ার পর, শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এখন এই রাজ্যের জনসাধারণের কাজ পরিচালনা করছেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় তাকে কখনও কখনও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘ডি-ফ্যাক্টো শাসক’ হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

রাজনৈতিক অঙ্গনে ভূমিকা

আল নাহিয়ান ‘মেনা’ অঞ্চলের বাইরের দেশগুলির সাথে সংযুক্তি বৃদ্ধি করার মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বৈদেশিক নীতিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি শিক্ষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, অর্থনীতি, বিনিয়োগ, শক্তি, স্থান, আঞ্চলিক শান্তি ও সুরক্ষা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, চরমপন্থার বিরুদ্ধে লড়াই এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ব্যাপারে ফ্রান্সের নিকট সহযোগিতা চেয়েছেন। তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবস্থান তৈরি এবং  আরও শক্তিশালী করতে যথেষ্ট আর্থিক সহায়তাও দিয়ে গেছেন। আল নাহিয়ান পূর্ব ইউরোপের দেশগুলির সাথেও নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। 

২০১২ এবং ২০১৪ সালের পরমাণু সুরক্ষা শীর্ষ সম্মেলনে সংযুক্ত আরব আমিরাতকেও প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে সংযুক্ত আরব আমিরাত অঞ্চলে প্রথম শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক বিদ্যুৎ চুল্লি, বড়াকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করেছিল।

পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতের শিক্ষার স্তরকে সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক মানের সাথে সমান করার জন্য ও কাজ করে যাচ্ছেন তিনি ।

নারীর ক্ষমতায়নে মোহাম্মদ বিন জায়েদ এর ভূমিকা

আল নাহিয়ান প্রচলিত পুরুষ-অধ্যুষিত ক্ষেত্রে নারীদের বর্ধিত উপস্থিতিকে সমর্থন করেছেন। এছড়াও শান্তিরক্ষা ও সুরক্ষা কার্যক্রমে মহিলা অফিসাররা যে ভূমিকা পালন করেন তার গুরুত্বের উপর জোর দিয়েছিলেন তিনি। জনসেবা খাতেও নারীদের উপস্থিতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন তিনি। 

২০১২ সালের অক্টোবরে, তালেবানদের দ্বারা মাথায় ও ঘাড়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মালালা ইউসুফজাইয়ের জন্য তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা এবং যুক্তরাজ্যে স্থানান্তরিত করার ব্যবস্থা করেছিলেন।

বিতর্কিত যে কারণে

২০২০ সালের ১৭ জুলাই, ইয়েমেন গৃহযুদ্ধের সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করে “নির্যাতনের ঘটনায় জড়িত” বলে মোহাম্মদ বিন জায়েদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে। এই বিষয় টি তদন্তের জন্য ফরাসী তদন্তকারী ম্যাজিস্ট্রেটকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল ।

সম্মাননা 

মোহাম্মদ বিন জায়েদ ২০০৮ সালেএ ২৩ মে, স্পেনের ‘জুয়ান কার্লোস’ দ্বারা নাইট গ্র্যান্ড ক্রস অফ দি অর্ডার অফ সিভিল মেরিট হিসেবে পুরস্কৃত হন।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button