জীবনী

ইবন আল নাফিসঃ চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ

জ্ঞান, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, শিল্প, সাহিত্য ও বিশ্ব সভ্যতায় মুসলমানদের কী অবদান রয়েছে, তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন। সঠিক জ্ঞানের অভাব থেকেই মানুষের মধ্যে এসব প্রশ্নের উদয় হয়। এছাড়াও ইসলাম ধর্ম কে চিরতরে মুছে ফেলার জন্যে অনেকেই ইসলামের ইতিহাস এবং মুসলিম বিজ্ঞানীদের নামকে বিকৃতভাবে লিপিবদ্ধ করেছে। ফলে সঠিক ইতিহাস না জানার কারণে অনেকে অকপটে এ কথা বলতেও দ্ধিধা করেন না যে, সভ্যতার ‍উন্নয়নে মসুলমানদের তেমন কোন অবদান নেই আর চিকিৎসা বিজ্ঞানেও মুসলমানগন অমুসলিমদের নিকট ঋণী ।

কিন্তু ইতিহাস ঘাটলেই আমরা দেখতে পাই মানুষের এই ধারনা কত ভুল!

যুগে যুগ বহু মুসলিম ব্যক্তি তাদের কর্ম এবং অক্লান্ত পরিশ্রম দিয়ে ইতিহাস তৈরি করেছেন। রসায়ন, পদার্থ, জীববিজ্ঞান, কৃষি, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস সর্বত্র ছিল তাদের অগ্রণী ভূমিকা। যাদের কারণে আজকে আমাদের জীবন ধারণ অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে। তেমনি একজন মুসলিম মনীষীর জীবনী নিয়েই আজকের আয়োজন।

জন্ম এবং প্রাথমিক জীবন 

ইবন আল নাফিস, যিনি একজন বিখ্যাত আরব বিজ্ঞানী ও চিকিৎসাবিদ ছিলেন। ইবন আল নাফিস এর পুরো নাম আলা আল-দিন আবু আল-হাসান আলী ইবন আবি-হাজম আল-কারশি আল-দিমাশকি।

১২০৮ খ্রিস্টাব্দে, সিরিয়ার দামেস্ক শহরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। যদিও তাঁর জন্মস্থান দামেস্ক, মিসর না সিরিয়া এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে তাঁর নামের শেষে ‘দিমাশকি’ সংযুক্ত থাকায় তিনি দামেস্ক তেই জন্মগ্রহণ করেছেন বলে অনেকে মনে করেন। 

                                      চিত্রঃ ইবন আল নাফিস

দামেস্কেই তাঁর প্রথম জীবন অতিবাহিত করেন। মহাজজিব উদ্দীন আদ দাখওয়ারের নিকট তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে শিক্ষা নেন। তিনি এতটাই ভালো চিকিৎসক হয়ে উঠেন যে, তৎকালীন সময়ে তাঁর সমকক্ষ আর কেউ ছিল না।

১২৩৬ সালে, নাফিস মিশর গমন করেন এবং মিশরের কায়রোতেই নিজের কর্মজীবন অতিবাহিত করেন।

সেখানে ‘আল-নাসরি’ নামক হাসপাতালে তিনি চিকিৎসক হিসেবে নিয়োজিত ছিলন।পরবর্তীতে ‘আল-মুনসুরী’ হাসপাতালে তিনি প্রধান চিকিৎসক এবং সুলতানের ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ পান।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে অবদান

চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইবন আল নাফিসের অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি মানবদেহে রক্তসঞ্চালন পদ্ধতি, শ্বাসনালি, ফুসফুসের সঠিক গঠন পদ্ধতি, হৃৎপিণ্ড, শরীরে শিরা উপশিরায় বায়ু ও রক্তের প্রবাহ ইত্যাদি সম্পর্কে ব্যাপক তথ্য আবিস্কার এবং প্রকাশ করেন। সেইসাথে মানবদেহে রক্ত চলাচল সম্পর্কে গ্যালেনের মতবাদের ভুল ধরিয়ে ছিলেন তিনি এবং এর সম্বন্ধে নিজের মতবাদ সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন।

উইলিয়াম হার্ভের ও ৩০০ বৎসর পূর্বে রক্ত সঞ্চালন পদ্ধতি সম্বন্ধে সঠিক বর্ণনা করেন ইবন আল নাফিস। এই সম্বন্ধে তিনি ইবনে সিনার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ কানুন’ এর এনাটমি অংশের ভাষ্য ‘শরহে তসবিহে ইবনে সিনা’ গ্রন্থে একটি মতবাদ প্রকাশ করেন ।

যেখানে তিনি প্রমাণ করেন যে, “শিরার রক্ত এর দৃশ্য বা অদৃশ্য ছিদ্র দিয়ে ডান দিক থেকে বাম দিকের হৃৎকোষ্টে চলাচল করে না বরং শিরার রক্ত সব সময়ই ধমনী শিরার ভেতর দিয়ে ফুসফুসে গিয়ে পৌঁছায়; সেখানে বাতাসের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে শিরার ধমনীর মধ্য দিয়ে বাম দিকের হৃৎকোষ্টে যায় এবং সেখানে এ জীবন তেজ গঠন করে”।

এছাড়াও তিনি ৫ জায়গায় হৃৎপিন্ড (Heart) এবং ফুসফুসের  (Lungs) ভিতর দিয়ে রক্ত চলাচল সম্বন্ধে ইবনে সিনার মত উদ্ধৃত করেছেন এবং ইবনে সিনার এ মতবাদ যে গ্যালনের মতবাদেরই পুনরাবৃত্তি তাও দেখিয়ে দিয়ে এ মতবাদের তীব্র প্রতিবাদ করেছেন।

কিন্তু বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী ইবন আল নাফিসের মতবাদ সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত বলে গৃহীত হলেও তাঁকে পাশ্চাত্য চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বিজ্ঞান জগতে স্বীকৃতি দেয়নি। তাঁর এই যুগান্তকরী আবিষ্কার ৭০০ বছরের জন্য কালের গহবরে হারিয়ে গিয়েছিল। সকলের নিকট আজনাই থেকে গিয়েছিলো।

১৯২৪ সালে, হঠাৎ করেই বার্লিনের একটি লাইব্রেরীতে ‘সিয়ারাহ তাসরিহ আল-কুনুন’ নামক তাঁর লেখা একটি পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়। যেখানে তাঁর এই ব্যাখ্যা ছিলো। ফলে তাঁর এই আবিষ্কারটি বিশ্ববাসীর দৃষ্টিগোচর হয়।

এছাড়াও তিনি ফুসফুস এবং হৃৎপিণ্ডের এনাটমি নিয়ে ও বিশদ আলোচনা করেন। এ্যরিস্টটল এর ধারনা মতে, দেহের পরিমাপ অনুসারেই হৃৎপ্রকোষ্ঠ সংখ্যায় কম বেশী হয়। ইবন আল নাফিস এই মতকে ভুল প্রমাণিত করেন। তাঁর মতে হৃৎপিন্ডে মাত্র দু’টো হৃৎপ্রকোষ্ঠ আছে। একটা থাকে রক্তে পরিপূর্ণ এবং এটা থাকে ডান দিকে আর অন্যটিতে থাকে জীবনতেজ, এটা রয়েছে বাম দিকে। এ দু’য়ের মধ্যে চলাচলের কোন পথই নেই ।যদি তা থাকত তাহলে রক্ত জীবনতেজের জায়গায় বসে গিয়ে সেটাকে নষ্ট করে ফেলত। হৃৎপিণ্ডের এনাটমি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ইবন আল নাফিস যুক্তি দেখান যে, ডানদিকের হৃৎপ্রকোষ্ঠে কোন কার্যকরী চলন নেই এবং হৃৎপিন্ডকে মাংসপেশীই বলা হউক বা অন্য কিছুই বলা হউক তাতে কিছু আসে যায় না।

বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানে এ মতবাদটি ও সম্পূর্ণ বিজ্ঞান সম্মত বলে গৃহীত হলেও ইবন আল নাফিস কে বিজ্ঞান জগতে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি ।

অন্যান্য বিষয়ে অবদান

ইবন আল নাফিস শুধু একজন চিকিৎসা বিজ্ঞানী ই ছিলেন না; বরং তিনি সাহিত্য, আইন, ধর্ম এবং যুক্তিবিদ্যায় ও অগাধ

পাণ্ডিত্যের

অধিকারী ছিলেন। বিভিন্ন বিষয়ে অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেন তিনি। ২০ খন্ডে ইবনে সিনার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কানুন’ এর ভাষ্য প্রণয়ন করে, চিকিৎসা শাস্ত্রের বিভিন্ন কঠিন সমস্যার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বিভিন্ন রোগের ঔষধ সম্পর্কে ‘কিতাবুশ শামিল ফিল সিনায়াত তিব্বিয়া’ একটি গ্রন্থ রচনা করেন তিনি। এ গ্রন্থটির হস্তলিপি দামেস্কে রয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে তিনি হিপোক্রিটস,গ্যালেন, হুনায়েন ইবনে ইসহাক এবং ইবনে সিনার গ্রন্থের ভাষ্য প্রণয়ন করেন। তাঁর অন্যান্য বিখ্যাত বইগুলো হল- মুয়াজ আক-কানুন, আল-মুখতার ফি আল-আঘধিয়া।

তিনি হাদীসশাস্ত্রের উপরও কয়েকখানা ভাষ্য লেখেন । এছাড়া তিনি আরো বহু গ্রন্থ রচনা করেন যেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে :- ‘মুখতার মিনাল আগজিয়া (মানবদেহে খাদ্যের প্রভাব সম্পর্কে)’, ‘রিসালাতু ফি মানাফিয়েল আদাল ইনসানিয়াত (মানবদেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের কার্য সম্বন্ধে)’, আল- কিতাবুল মুহাজ ফিল কুহল (চক্ষু রোগ সম্বন্ধে )’, শারহে মাসায়েলে ফিত তিব্ব’, ‘তারিকুল ফাসাহ’ ‘মুখতাসারুল মানতেক’ প্রভৃতি ।

মৃত্যু

১২৮৮ খ্রিস্টাব্দে, কায়রোতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। তাঁকে সুস্থ করে তোলার প্রায় সকল চিকিৎসাই ব্যর্থ হয়ে যায়।  অবশেষে মৃত্যু শয্যায় তাঁর মিসর ও কায়রোর চিকিৎসক বন্ধুরা তাঁর রোগের প্রতিষেধক হিসেবে তাঁকে মদ পান করতে অনুরোধ করেন। কিন্তু মদ পান করার পরিবর্তে তিনি বন্ধুদেরকে উত্তর দেন, “আমি আল্লাহ পাকের দরবারে চলে যেতে প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমি চিরদিন এ নশ্বর পৃথিবীতে থাকতে আসিনি। আল্লাহ আমাকে যতটুকু ক্ষমতা দিয়েছেন আমি চেষ্টা করেছি মানুষের কল্যাণে কিছু করে যেতে । বিদায়ের এ লগ্নে শরীরে মদ নিয়ে আল্লাহ পাকের দরবারে উপস্থিত হতে আমি চাই না’’।

অবশেষে ১২৮৮ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ডিসেম্বর, এ মহামনীষী ইন্তেকাল করেন । মৃত্যুকালে তিনি তাঁর একমাত্র বাড়ি, লাইব্রেরী, তাঁর সমস্ত বইপত্র হাসপাতাল সব “আল-মনসুরী” হাসপাতালকে দান করে যান।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button