ইতিহাস

এফবিআইকে নাকানিচুবানি খাইয়েছিল যে জার্মান গুপ্তচর

নাটক বা সিনেমায় প্রায় দেখা যায় স্পাই একাই শত্রু শিবিরে প্রবেশ করে ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটিয়ে দেশ ও জাতিকে উদ্ধার করে। কিন্তুবাস্তবে স্পাই বা গুপ্তচর মোটেই এমন নয়। গুপ্তচর শব্দটি ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যায় এর মধ্যে  গোপনীয়তা কথাটা বিদ্যমান। আমরা একজন স্পাইয়ের জীবনকে যতটা রোমাঞ্চকর মনে করি না কেনো বাস্তবে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। রোমাঞ্চের  বদলে তার জীবন ভরে থাকে দুশ্চিন্তা, উৎকণ্ঠা আর আতঙ্ক ।আমাদের আশপাশে হয়তো স্পাই আছে। আমরা নিজেরা ও তা জানি না। দেখতে আমাদের মত অতি সাধারণ, সজ্জন, নিরীহ। তারা আমাদের মাঝেই মিশে আছে। কিন্তু আমাদের মত নয়।একজন স্পাইকে আমরা যতটা গৌরবান্বিত করে থাকি না কেনো বাস্তবতা এখানে ভিন্ন।  নিজের পরিচয় গোপন রাখতে এবং তথ্য চুরি করতে গিয়ে যত ধরনের হীন কর্ম রয়েছে তারা তা করতে বাধ্য।  একজন স্পাই নিজের স্বাভাবিক জীবন যাপন সম্পূর্ণ বির্সজন দিয়ে। সীমাহীন ত্যাগ তিতীক্ষার  মাধ্যমে বছরের পর বছর  কাজ করে যান। একারণে স্পাইকে ধরা জন্য অনেক শ্রম দিতে হয়।আবার অনেক সময় লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষের ভিড়ে  মিশে যাওয়া গুপ্তচরকে ধরা সম্ভব হয় না। ১৯৪৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অভ ইনভেস্টিগেশন এমনি লক্ষ্য লক্ষ্য  মানুষের ভিড়ে  মিশে যাওয়া এক গুপ্তচরকে আটক করে চমকপ্রদ ইতিহাস সৃষ্টি করে।

অন্যসব দিনের মত ১৯৪২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারী রাতে পোস্টাল সেন্সর একের পর এক চিঠি স্ক্যান করে যাচ্ছে। হঠাৎ একটি চিঠি সেন্সর শনাক্ত করল যা পর্তুগালগামী চিঠিপত্রের মধ্য থেকে নেয়া হয়েছিল। চিঠি থেকে প্রাপ্ত তথ্যে সন্দেহজনক কিছু  না পাওয়া গেলেও এর প্রাপকের ঠিকানা নিয়ে সমস্যা দেখা দিল।কারণ যে ঠিকানায় এটা পোস্ট করা হয়েছে সেটি কাউন্টার এসপিওনাজ এজেন্টদের কাছে জার্মান গুপ্তচরদের আস্থানা বলে চিহ্নিত। মুহূর্তের মধ্যে সবাই সতর্ক হয়ে গেল।আর ঘণ্টাখানিক বাদে এফবিআইয়ের ওয়াশিংটন ল্যাবে কেমিস্ট চিঠিটি যে এক বন্ধু আরেক পুরানো বন্ধুকে লিখেনি তা বের করলেন। রাসায়নিক মিশ্রিত স্পঞ্জ দিয়ে চিঠির খালি অংশ কয়েকবার মুছলে সূক্ষ্ম হাতে লেখা জার্মান অক্ষরগুলো স্পষ্ট হয়।যাতে নিউইয়র্ক সমুদ্রবন্দরে যুদ্ধ বহরে যুক্ত হওয়া সৈন্যবাহী জাহাজ ও ফ্রেইটারগুলোর গোপন সব তথ্য ছিল।আর এসব মূল্যবান তথ্য শত্রুর হাতে পড়লে নাবিক ও সেনাদের জীবন এবং সেই সাথে মূল্যবান সম্পদও ঝুঁকিতে পড়ে যাবে ।

আর্নেস্তো লেহমিতজ

যে কোন মূল্যে আটক করতে হবে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা অই ভয়ঙ্কর গুপ্তচরকে।কিন্তু কিভাবে সম্ভব? বেনামে লিখা ঐ চিঠি এবং এটি লিখতে ব্যবহৃত হয়েছে ‘আন্দের উড-৩ ব্যাংক পর্টেবল’ নামক বহুল ব্যবহৃত টাইপরাইটার এই দুইটি ক্লু ছাড়া তার কোন কিছু নেই এফবিআইয়ের হাতে। কিছু দিনের মধ্যে ঐ গুপ্তচরের আরও দুটি চিঠি এফবিআইয়ের হাতে পড়ল ।দুটোই পোস্ট করা হয়েছে নিউইয়র্ক পোস্ট অফিস থেকে।তার মানে কি এই গুপ্তচর নিউইয়র্ক থাকে? দেখতে কেমন? এরূপ অনেক প্রশ্ন সবার মনে আসলেও  এফবিআইয়ের  কাছে এ ধরনের কোন তথ্য ছিল না ।স্পেশাল এজেন্টদের একজন চিঠিগুলোর ফটোকপিতে চোখ বুলাচ্ছিলেন হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল। তার কাছে মনে হলো চিঠিগুলোতে লিখা কল্পকাহিনীর সাথে সাথে কিছু সত্য কথাও আছে। এর পর তিনি এর সার –সংক্ষেপ তৈরি করলেন এইভাবে ।ধরা যাক এই গুপ্তচরের নাম এক্স  চিঠি থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে তিনি বিবাহিত এবং নিজের বাড়িতে থাকেন।তার একটি পোষা কুকুর আছে। অফিসে যাওয়ার জন্য প্রতিদিন সকাল আটটা বাজে বাড়ি থেকে বের হন। কিছু দিন হল তিনি চশমা বদল করেছেন এবং তিনি একজন এয়ার রেইড ওয়ার্ডেন। পুরো নিউইয়র্ক জুড়ে থাকা ৯৮৩৩৮ জন   এয়ার রেইড ওয়ার্ডেন থেকে কিভাবে এই একজনকে শনাক্ত করবে? তবু হাল ছাড়েনি এফবিআই । একে একে ওয়ার্ডেনদের ব্যাপারে খোঁজ নিতে শুরু করল এর মধ্যে আরও দুটি চিঠি এফবিআইয়ের হাতে আসল । যা থেকে আরো কিছু ক্লু পাওয়া গেল।যেমন তার একটি বাগান আছে।তার বাড়িটি মর্টগেজের কারণে যে কোন সময় হারাতে পারে এবং সে একটি মুরগির খামার করার ব্যাপারে আগ্রহী।

লেহমিতজের বাড়ি

দিনরাত কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে এফবিআই এজেন্টেরা ৯৮০০০থেকে এয়ার রেইড ওয়ার্ডেনের সংখ্যা ৮১০০০নামিয়ে আনল ,কিন্তু এ সংখ্যাটাও বিশাল। ১৪ এপ্রিল পাওয়া বারোতম চিঠি  যা এই  রহস্যময় গুপ্তচরকে শনাক্ত করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। চিঠির স্মৃতিকাতর  অংশটুকু তদন্তকারী অফিসারের দৃষ্টি আর্কষণ করে । যেখানে বসন্তে এস্তোরিল  বিচে কাটানো চমৎকার সময়ের স্মৃতিচারণ করা হয়। এস্তোরিল হল লিসবনের কয়েক মাইল বাইরে একটা রিসোর্ট যা জার্মান এসপিওনাজ এজেন্টদের ক্লিয়ারিং হাউস হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এরপর যে প্রশ্নটির  সমাধান করার দরকার সেটি হল, ১৯৪১ এর বসন্তের পর লিসবন থকে আমেরিকাতে প্রবেশকারীদের শনাক্ত করার সবচেয়ে ভালো উপায় কোনটি? কারণ এফবিআইয়ের হাতে কোন ছবি কিংবা ফিংগার প্রিন্ট ছিল না যা দিয়ে শনাক্ত করা যাবে ।তখন হঠাৎ একজন এজেন্ট প্রস্তাব করলেন ইউএসএতে প্রবেশের সময়কার ডিক্লারেশন ফর্ম  সংগ্রহ করে গুপ্তচরের হাতের লিখার সাথে মিলিয়ে শনাক্ত করা যেতে পারে ।কেননা চিঠিতে তার নাম ভুয়া হলেও হাতের লিখা ভুয়া নয় ।ফিংগার প্রিন্ট এর মতো নিজের হাতের লিখা লুকানো বেশ অসম্ভব ।

পরদিন সকাল থেকে এফবিআইয়ের হস্তাক্ষর বিশেষজ্ঞদের একটা দল ফটোকপি করা চিঠি নিয়ে হাজার হাজার ডিক্লারেশন ফর্ম থেকে লাখা মেলানোর কাজে  ঝাঁপিয়ে পড়ল । হস্তাক্ষর বিশেষজ্ঞদের কাজতা পুরোপুরিই বৈজ্ঞানিক। সূত্রগুলো লুকিয়ে থাকে সামান্য বাঁকানো ই অথবা একটু প্যাঁচানো এল এর মধ্যে। ১৯৪৩ সালের ৯ জুন রাত ৯টা।৪৮৮১ তম ডিক্লারেশন ফর্মটি হাতে নিলে স্পেশাল এজেন্ট।হঠাৎ তার চোখ ফর্মের নিচের স্বাক্ষরে আটকে গেল। নিমেষে উধাও হয়ে গেল তার সব ক্লান্তি। সে দ্রুত ম্যাগনিফাইং গ্লাসের নিচে ফর্মটা ধরল।তার সন্দেহ সত্যে প্রমাণিত হল। স্বাক্ষরতার ছবি বড় করে তুলে ওয়াশিংটন ল্যবে।গুপ্তচরের আসল চিঠির সাথে মেলানোর জন্য।  অবশেষে রাত ১টা বেজে ৪৫ মিনিটে  এফবিআইয়ের অফিস থেকে আর্নেস্টা এফ লেহমিতজকে খুঁজে বের করার আদেশ দেওয়া হল।

লেহমিতজ আর তার সহযোগী

এয়ার রেইড ওয়ার্ডেন লিস্ট চেক করে পাওয়া গেল তার নাম ও ঠিকানা। এক ঘণ্টার মধ্যে স্পেশাল এজেন্টরা ম্যানহাটন থেকে স্ট্যাটেন আইল্যন্ডের উদ্দেশ্যে ফেরিতে করে রওনা দিল।নির্দেশ দেওয়া হল খুঁজে পাওয়ার সাথে সাথে তাকে গ্রেপ্তার বা গুলি করা যাবে না। এর কারণ তখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া বাকি ছিল। তার সাথে এর কে কে আছে?কোথা থেকে এবং কিভাবে এত তথ্য পাচ্ছে ? এসব ছাড়াও গুপ্তচরেরা আটক হওয়ার পর সহজে মুখ খোলে না। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্পাইদের বিচারের ক্ষেত্রে আমেরিকাতে জুরিদের সন্তুষ্ট করতে শাক্তিশালী  প্রমান উপস্থাপন করতে হয় ।

সারা রাত ধরে এফবিআইয়ের এজেন্টরা অক্সফোর্ড প্লেসে গুপ্তচরের বাড়িটির উপর নজর রাখছিল।পরদিন সকাল ৭টা ১৫ মিনিটের সময় একজন রোগা লম্বা চশমা পরা লোক বাড়িটি থেকে বের হয়ে বাড়ির কাছের রেস্টুরেন্টে গেল। এজেন্টরাও তার পিছু নিল।রেস্টুরেন্টের ভিতরে ঢুকে দেখল একটা নোংরা অ্যাপ্রন পরে লোকটা মেঝে  পরিষ্কার করছিল।হাল্কা নীল চোখ এবং পাতলা বাদামি চুল তার বয়স আনুমানিক ৫৫ বছর। সে আর দশটা সাধারণ মানুষের মতো একজন মানুষ।যার দিকে কেউ সচরাচর দ্বিতীয়বার তাকাবেনা । পরের ১৬ দিন ছায়ার মতো গুপ্তচরের পেছনে লেগে থাকল  এফবিআইয়ের এজেন্টরা ।তার সাথে মিশে তারা বের করে আনল ভয়াবহ সত্য। ভয়াবহ কারণ তার পাঠানোর চিঠির সাথে পুরোপুরি মিলে যাচ্ছিল।ধীরে ধীরে জাল গুটিয়ে আনা  শুরু হল। ২৭ জুন ১৯৪৩ সকাল ৮ টা প্রথম  চিঠি পাওয়ার এক বছর ৪ মাস ৭ দিন পর লেহমিতজকে এফবিআইয়ের সদর দপ্তরে আনা হলো । তার পাঠানো চিঠি এবং তার বিরুদ্ধে জোগাড় করা সব প্রমাণ তাকে দেখানো হল। অবশেষে সে সবকিছু স্বীকার করে স্বীকারোক্তি দিল।

বিচারকের কাঠগড়ায় লেহমিতজ

১৯০৮ সালে জার্মান দূতাবাসে ক্লার্ক হিসেবে প্রথম আমেরিকাতে আসে।১৯৩৮সালে জার্মান এসপিওনাজ সংস্থা তাকে রিক্রুট  করে এবং গুপ্তচরবৃত্তির ট্রেনিং দেওয়া হয়। ১৯৪১ সালে বসন্তে তাকে আমেরিকাতে ফেরার নির্দেশ দেয়। এবং তাকে বলা হয় স্থায়ী  কাজের ব্যবস্থা করে ভালো নাগরিকের বেসে সেখানে বসবাস করতে। তার স্বীকারোক্তিতে আরও একজন গুপ্তচরকে ধরা হ্য।তাদের দুজনেরই ৩০ বছরের কারাদন্ড হয় ।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button