আন্তর্জাতিকইতিহাস

হুন সেনঃ কম্বোডিয়ার নৃশংস স্বৈরশাসক

হুন সেন কম্বডিয়ার বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। খেমার রুজ  শাসনের  সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞের অবসানের পর কম্বোডিয়ার অর্থনীতি পুনঃউদ্ধার এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় যিনি আসাধারণ ভূমিকা রাখেন।কিন্তু ৬৬ বছর  বয়সী এই নেতা বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে পরিচিত স্বৈরশাসক হিসেবে। কম্বোডিয়ায় সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েমসহ দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার ব্যবস্থা পরিচালনার মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছেন । নানা কায়দায় প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে সক্ষম হয়েছেন।   

হুন সেন

পঁচিশ বছরেরও অধিক সময় ধরে কম্বডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ  কারণে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘকালীন নেতৃত্বের অধিকারী হিসেবে। অবশ্য সারা বিশ্বে তার পরিচিতির আরও কিছু কারণ রয়েছে। যেমন কম্বডিয়া রয়েছে বেশ কিছু বিতর্কিত আইন। তার একটি হল  হুন সেনকে নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে যে কোন সংবাদ প্রচারের  সময় তার নামের আগে ব্যবহার করতে হয় ছয় টি সম্মানসূচক  শব্দ “সামদেক আকিক মহা সেনা পাদে টেকো ”। যার ইরেজি প্রতিশব্দ না থাকলেও অনুবাদ করলে যা দাঁড়ায় তার বাংলা হল “সুমহান, ক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রী ও শক্তিশালী অধিনায়ক ”। ১২মে ২০১৬ দেশটির তথ্য মন্ত্রণালয়  গণমাধ্যমকর্মীদের এ বিষয়ে নির্দেশনা দেয় । গণমাধ্যম প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কিছু লিখলে প্রথমেই এ পদবী দিতে হবে। অন্যথায় গণমাধ্যম  প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিল অথবা অন্য ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে। শুধু প্রধানমন্ত্রী নয় ফাস্ট লেডিসহ শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতার নামের আগে ও বিভিন্ন সম্মানসূচক শব্দগুছ ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা জারি করে সরকার ।

স্ত্রী বেন রেনির সাথে হুন সেন

৪ এপ্রিল ১৯৫১ সালে কম্বডিয়ার ক্যামপং চেম প্রদেশের একটি কৃষক পরিবারে জন্ম  গ্রহণ করেন হুন সেন।যদিও এ জন্ম তারিখটি তার নিজের দেওয়া। ১৬ মাস বয়স বাড়িয়ে খেমার রুজে যোগ দেন।তার প্রকৃত জন্ম তারিখ ৫ আগস্ট ১৯৫২।শুধু জন্ম তারিখ নয় বাবা মার দেওয়া নাম “হুন বুনাল”পরিবর্তন করে নিজের নাম রাখেন হুন সেন।বাবা হান নিয়াং ও মা ডি ইয়েনের ৬ সন্তানের মধ্যে তিনি হলেন তৃতীয়। কৃষক পরিবারে জন্ম হলেও হুন সেনদের পরিবার আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ছিল।হুন সেনের পিতা হান নিয়াং এর দাদা টিওচিউ ছিলেন চাইনিজ এলাকার সমৃদ্ধ ভূ-স্বামী। উত্তরাধিকার সূত্রে বেশ কিছু জমি পান হান নিয়াং।কিন্তু পরবর্তীতে অপহরণের ঘটনার কারণে বেশ কিছু জমি বিক্রয় করতে বাধ্য হয় হান নিয়াং। ১৩ বছর বয়সে পরিবার ছেড়ে নম পেনের সন্ন্যাসীদের স্কুলে ভর্তি  হন।এর আগে কৃষি শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।যদিও উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি শেষ করতে পারেননি। ১৯৭০ সালে রক্তপাতহীন অভুরথানে প্রিন্স নরোদম সিহানুকের পতন ঘটে এবং  ক্ষমতায় আসেন মার্শাল লন নল । উদ্ভুত অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে তিনি পড়াশোনার আগ্রহ হারিয়ে পেলেন। যোগ দেন মার্কসবাদী – লেলিনবাদী কাম্পুকিয়ান পিপলস রেভোলিউশন পার্টিতে।যা পরবর্তীতে খেমার রুজ হিসেবে পরিচিতি পায়।তিনি কমিউনিস্টদের হয়ে যুদ্ধ করেন।যারা ১৯৭৫ সালে দেশটির রাষ্ট্র ক্ষমতা গ্রহণ করে।  

১৯৮৫ সালে এক জনসভায় হুন সেন

১৬ এপ্রিল ১৯৭৫ খেমার রুজ কর্তৃক নম পেন দখলের ১ দিন আগে যুদ্ধে বাম চোখ হারান হুন সেন। এবং তার কপালের ডান পাশে একটি বুলেট  আঘাত হানে। যে কারণে তিনি আংশিকভাবে পক্ষাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ঐ দুর্ঘটনার পর হুন সেনকে ৮ দিন কোমায় থাকতে হয়।জন্ম স্থান মেমটে আমেরিকা  কর্তৃক বোমা বর্ষণের ঘটনা তাকে বিচলিত করে (লন নল ক্ষমতা গ্রহণের এক বছর পূর্বে মেমটে আমেরিকা বোমা বর্ষণ করে ) । এ কারণে খেমার রুজে যোগ দেন।১৯৭৭ সালে হুন সেন ও তার কয়েক জন সঙ্গী কম্বডিয়ার চির শত্রু দেশ ভিয়েতনামে পালিয়ে গিয়ে খেমার রুজ বিরোধী বাহিনীতে যোগ দেয়।১৯৭৮ সালে হুন সেন হেন সাম্রিনে যোগ দেন(যা ছিল ভিয়েতনামের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি সামরিক সংগঠন)  ।উদ্দেশ্য খেমার রুজদের উৎখাত তথা জাতীকে তাদের হাত থেকে মুক্তি দেওয়া। ৭ জানুয়ারী ১৯৭৯ খেমার রুজদের পতন  হয় ।

 ভিয়েতনাম কম্বডিয়ায় নতুন সরকার প্রতিষ্ঠা করে।হুন সেন কম্বডিয়ায় ফিরে আসেন। এবং নব গঠিত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ডিসেম্বর ১৯৮৪ সাল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চান সাইয় চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাশিয়ার মস্কোতে মারা যান। তার মৃত্যুতে জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ কেপিআরপি দলের পক্ষ থেকে হুন সেনকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। মাত্র ৩২ বছর ১৬২ দিন বয়সে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হন। অক্টোবর ১৯৯১ সাল প্যারিস শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যা কম্বডিয়ার শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুতপূর্ন ভূমিকা রাখে। উল্লেখ্য এ চুক্তি সম্পাদনে হুন সেনের ভূমিকা খুবই প্রশংসা পায়। এরপর ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘ নিরীক্ষিত নির্বাচনে হুন সেন ও তার দল কম্বডিয়ান পিপলস পার্টি(সিপিপি)নামে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।  নির্বাচনে সিপিপি পরাজিত হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অপারাগতা প্রকাশ করে  হুন সেন।বিশ্লেষকদের মতে হুন সেনের  দুর্নীতি তার হারের জন্য দায়ী। ১৯৮৭ সালে অ্যাঁমেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল হুন সেনের বিরুদ্ধে কয়েক হাজার রাজনৈতিক বন্দীকে বৈদ্যুতিক শক, গরম লোহা দিয়ে ছেকা দেয়া,প্লাস্টিকের ব্যাগ দিয়ে শ্বাসরোধ করা সহ বিভিন্নভাবে নির্যাতন চালানোর অভিযোগ করে ।অবশেষে ফানসিনপেক পার্টির সাথে আলাপ-আলোচনান্তে হুন সেন যৌথভাবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রিন্স নরোদম রণরিদ্ধের সাথে রাষ্ট্র  পরিচালনা করতে থাকেন। ১৯৯৭ সালে রণরিদ্ধ ও হুন সেনের জোটটি ভেঙ্গে যায়। এবং রক্তাত অভুরথানের মাধ্যমে  হুন সেন ক্ষমতা দখল করেন। ক্ষমতা দখলের পর রণরিদ্ধকে দেশ ত্যাগে করতে বাধ্য করেন। ২০০৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে সিপিপি জয়লাভ করলে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হ্য়।প্রায় এক বছর ধরে চলা রাজনৈতিক অচল অবস্থার অবসান হ্য়  ২০০৪ সালে ফানসিনপেকের  সাথে চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে। জুলাই ২০০৪ সালে হুন সেন সংসদে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।   

কম্বোডিয়ার রাস্তায় হুন সেন বিরোধী আন্দোলন

২০০৮ সালের নির্বাচনে ও বেশিরভাগ আসনে জয়লাভ করে সিপিপি।যদিও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও ইইউ দাবী করে  ক্ষমতাসীনরা  নির্বাচনী প্রচারাভিযানে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও ক্ষমতা ব্যবহার করেছে। শুধু কি তাই হুন সেন নিয়মিত কম্বডিয়ানদের এই বলে সতর্ক করেন যে যদি তিনি ক্ষমতা থেকে বহিষ্কৃত হন।তবে দেশে যুদ্ধ অবস্থা ফিরে আসবে। ৬মে ২০১৩ তারিখে হুন সেন ঘোষণা করেন যে কম্বডিয়ার ৭৪ বছর পূর্তি পর্যন্ত তিনি কম্বডিয়ার প্রধানমন্ত্রী থাকতে চান। পশ্চিমাদের অব্যাহত চাপে বিরোধী নেতা স্যাম রেনেসিকে কম্বডিয়ায় আসার অনুমতি দেন।রাস্তার ধারে হাজার হাজার লোক দাঁড়িয়ে রেনেসিকে স্বাগত জানায়। রেনেসির এ জনপ্রিয়তা ২০১৩ সালের নির্বাচনের ফলাফলে লক্ষ্য করা য়ায়। জাতীয় পরিষদে ৫৫টি আসন জিতে  রেনেসির সিএনআরপি( কম্বডিয়ান ন্যাশনাল রেসকিউ পার্টি)দল এবং৬৮টি আসন জিতে সিপিপি।বহু বছরের মধ্যে সিপিপির জন্য এটি ছিল খুবই খারাপ ফলাফল ।স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকগণ নির্বাচনে অনিয়ম ও ফলাফল বাতিলের বিষয়ে রেনেসির দল সিএনআরপি কে সমর্থন দেয় । প্রায় এক বছর ধরে নানা আন্দোলন চালায় রেনেসি ও তার সমর্থকেরা । অবশেষে  হুন সেন বাধ্য  হয় আলোচনার টেবিলে বসতে ।যদিও আলোচনা ভেঙ্গে যায় এবং বিরোধী দলের বহু নেতাকর্মীকে আটক করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী । স্যাম রেনেসি আবার দেশ থেকে পালিয়ে যান।এরপর ২০১৭ সালের কমিউন কাউন্সিল নির্বাচনে বিরোধী দলগুলো বেশি আসন পাওয়া । হুন সেন ও সিপিপি সিএনআরপি বিরুদ্ধে আরো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। সিএনআরপির নতুন নেতা কেম সোহাকে আটক করে এবং বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা কে নির্বাসিত করে। ডিসেম্বর ২০১৭  কম্বডিয়ার সুপ্রিম কোর্ট সিএনআরপি কে অবৈধ ঘোষণা করে। আর এ রায়ের মাধ্যমে ২০১৮ সালের নির্বাচনে হুন সেনের জয় নিশ্চিত হয় ।

ব্যক্তিগত জীবনে হুন সেন ছয় সন্তানের জনক। তার বড় ছেলে মানেত র‍য়াল কম্বডিয়ান আর্মড ফোর্সেস এর মেজর জেনারেল এবং প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার । হুন সেনের তিন ছেলে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বর্পূন পদে নিয়োজিত।  তার স্ত্রী বান রেনি নার্স এবং মানবাধীকার কর্মী।  

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button