ইতিহাসজীবনী

শ্রীহর্ষবর্ধনঃ পুষ্যভূতি রাজবংশের শ্রেষ্ঠ রাজা

শ্রীহর্ষবর্ধন বা হর্ষ (৫৯০–৬৪৭ খ্রিস্টাব্দ) উত্তর ভারতের এক খ্যাতনামা সম্রাট যিনি ৬০৬ থেকে ৬৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শাসন করেছিলেন। তিনি ছিলেন পুষ্যভূতি বংশীয় একজন রাজা, যাকে পুষ্যভূতি রাজবংশের শ্রেষ্ঠ রাজা হিসেবে গণ্য করা হয়।

                                             চিত্রঃ রাজা হর্ষবর্ধন

তার পিতার নাম প্রভাকর বর্ধন, যিনি নিজেও পুষ্যভূতি বংশীয় একজন রাজা ছিলেন। তার মাতার নাম যশোমতী, যিনি স্বামীর মৃত্যুর পর সহমরণে সতী হয়েছিলেন। তার বড় ভাই রাজ্যবর্ধন, যিনি থানেশ্বরের রাজা ছিলেন এবং একমাত্র বোন রাজ্যশ্রী। 

তাঁর সভাকবি বাণভট্ট ‘হর্ষচরিত’ নামে একটি বই লিখে গেছেন। যা পড়ে গবেষকরা প্রাচীন ভারত সম্পর্কে অনেক তথ্য খুঁজে পান।

৬ষ্ঠ শতকের মাঝের দিকে গুপ্ত সাম্রাজ্যের (৩২০-৫৫০) পতন ঘটলে উত্তর ভারত ছোট ছোট প্রজাতন্ত্র ও রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। হর্ষবর্ধনের বাবা প্রভাকরবর্ধন হুনদের পরাস্ত করে থানেশ্বরের  রাজা হন। হর্ষবর্ধন ছিলেন তার ছোট পুত্র।

৬০২ খ্রিস্টাব্দে, তার পিতা প্রভাকরবর্মণ হুনদের আক্রমণ প্রতিহত করার সময় যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর হর্ষবর্ধনের বড় ভাই রাজ্যবর্ধন সিংহাসন লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি থানেশ্বরের সিংহাসনে বসেন এবং সিংহাসন লাভের পর হুনদের প্রতিহত করেন।  রাজ্যবর্ধন তাদের বোন রাজ্যশ্রীকে বিয়ে দিয়েছিলেন মৌখরীর রাজ গ্রহবর্মণের কাছে। 

৬০৬ খ্রিস্টাব্দে, মালবের গুপ্ত-রাজা দেবগুপ্ত মৌখরীর রাজ্য আক্রমণ করে। এই আক্রমণে মৌখরী-রাজ গ্রহ বর্মণ নিহত হন এবং তাঁর স্ত্রী রাজ্যশ্রীকে বন্দী করা হয়।

জানা যায়, গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক নাকি এ চক্রান্তের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই সংবাদ পাওয়ার পর রাজ্যবর্ধন তার ছোট ভাই হর্ষবর্ধনের হাতে রাজ্যভার অর্পণ করে, দশ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে দেবগুপ্তের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অগ্রসর হন। এই সময় দেবগুপ্তকে সাহায্যের জন্য শশাঙ্কও অগ্রসর হন। কিন্তু শশাঙ্কের পৌঁছানোর আগেই রাজ্যবর্ধন দেবগুপ্তকে পরাজিত করে হত্যা করেন। এরপর তিনি রাজ্যশ্রীকে উদ্ধারের প্রস্তুতি নেন। কিন্তু কান্যকুঞ্জে পৌঁছানোর আগেই তিনি শশাঙ্কের হাতে পরাজিত হন ও মৃত্যুবরণ করেন।

বাণভট্ট, চৈনিক তীর্থযাত্রী হিউয়েন সাঙ এবং আরো অনেক ইতিহাসবিদদের মতে, রাজ্যবর্ধন গৌড়ের রাজার মিথ্যা আশ্বাসে আশ্বস্ত হয়ে নিরস্ত্র ও একাকী অবস্থায় শত্রুশিবিরে নিহত হন।

রাজ্যবর্ধনের মৃত্যুর পর রাজা হর্ষবর্ধন বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে রাজশ্রীকে উদ্ধার ও শশাঙ্ককে শাস্তি দিতে অগ্রসর হন। এই সময় এর সাথে যোগ দেন কামরূপ রাজ ভাস্করবর্মন। বাণভট্টের হর্ষচরিত সূত্রে জানা যায়, হর্ষবর্ধন বিন্ধ্যা পর্বতের জঙ্গলে অভিযান চালিয়ে রাজ্যশ্রীকে উদ্ধার করেন। এরপর শশাঙ্ক ভাস্করবর্মণ ও হর্ষবর্ধনের সেনাবাহিনী দ্বারা আক্রমণ এড়িয়ে, কৌশলের সাথে তিনি কনৌজ ত্যাগ করেন। এই কারণে হর্ষবর্ধন শশাঙ্ককে শাস্তি দিতে না পেরে রাজধানীতে ফিরে আসেন। বৌদ্ধ গ্রন্থ’আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প’ এ পুণ্ড্রবর্ধনের যুদ্ধে হর্ষের হাতে শশাঙ্কের পরাজয়ের কাহিনী এবং তাঁর ১৭ বছরের রাজত্বকাল সম্পর্কে বর্ণনা থাকলেও তা সামসময়িক অপর কোন উৎস দ্বারা সমর্থিত নয়।

পরবর্তীতে তিনি তার বোন রাজ্যশ্রীর অনুমতি নিয়ে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর।

                            চিত্রঃ ঘোড়ার পিঠে রাজা হর্ষবর্ধন

হর্ষবর্ধন পাঞ্জাব থেকে উত্তর ভারত ছুঁয়ে মধ্য ভারত পর্যন্ত তার সাম্রাজ্য বিস্তৃত করেছিলেন এবং এই প্রজাতন্ত্রগুলি কে একত্রিত করেছিলেন। পশ্চিমে পাঞ্জাব থেকে শুরু হয়ে পূর্ব বঙ্গ ও ওড়িশা পর্যন্ত এবং দক্ষিণে নর্মদা নদীর উত্তরে অবস্থিত সমস্ত সিন্ধু-গাঙ্গেয় অববাহিকাতে হর্ষবর্ধনের রাজত্ব বিস্তৃত ছিল। এছাড়াও পূর্ব দিকে কামরুপ রাজ্যের সীমানা ছুঁয়েছিলেন তিনি।

এরপর রাজ্যের উন্নয়নে হাত দেন এবং একটি বিশাল সেনাবাহিনী তৈরি করেন তিনি। ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে, সাম্রাজ্য সীমা নর্মদার দক্ষিণে বিস্তার করার উদ্দেশ্য অভিযান পরিচালনা করেন হর্ষবর্ধন। এই সময় দক্ষিণ ভারতের চালুক্য বংশীর রাজা পুলকেশী নর্মদা নদীর তীরে হর্ষবর্ধনকে বাধা দেন। এই যুদ্ধে হর্ষবর্ধন পরাজিত হয়ে ফিরে যান। হর্ষবর্ধনকে পরাজিত করায় রাজা পুলকেশী কে ‘পরমেশ্বর’ উপাধি দেওয়া হয়।

৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে, গৌড়ের রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর পর হর্ষবর্ধন এবং ভাস্করবর্মন গৌড় রাজ্যের বিভিন্ন অংশ দখল করে নেন। এছাড়া উড়িষ্যা আক্রমণ করে গঞ্জাম পর্যন্ত পর্যন্ত অগ্রসর হন। গঞ্জাম অধিকারের পর সেখানকার মহাযান বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি সভা আহ্বান করেন। সম্মেলনের পর তিনি জয় সেন নামক জনৈক বৌদ্ধ-আচার্যকে উড়িষ্যার ৮০টি নগরীর রাজস্ব অর্পণ করেছিলেন।

                                     চিত্রঃ রাজা হর্ষবর্ধন এর সময়কার মুদ্রা

হর্ষবর্ধন একাধিক বার কাশ্মীরে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। কাশ্মীরে অভিযানের ফলাফল জানা না গেলেও; যতটুকু জানা যায়, তিনি সিন্ধুদেশে অভিযান চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

তিনি পশ্চিম ভারতের সৌরাষ্ট্রের বলভী রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে দ্বিতীয় ধ্রুব সেনকে পরাজিত করেছিলেন। হিউসেন সাঙ এর বিবরণ থেকে জানা যায়, তিনি তাঁর নিজ কন্যাকে  ধ্রুব সেনের সাথে বিবাহ দিয়েছিলেন।

জানা যায়, প্রজারা তাঁর আমলে যথেষ্ট সুখে-শান্তিতে ছিল। তাঁর দরবারে লেখক এবং শিল্পীরা অনেক সম্মান পেয়েছেন। হর্ষের রাজত্বে সুশাসন এবং শান্তি বজায় থাকার কারণে বহুদূর দেশ থেকেও বহু শিল্পী, কবি, বিদ্বান ব্যক্তি ও ধর্ম প্রচারক তার রাজসভায় সমাদৃত হন।

হর্ষবর্ধন নিজেও কবিতা ও নাটক লিখতেন। তিনি ‘নাগানন্দ’,  ‘প্রিয়দর্শিকা’ এবং ‘রত্নাবলী’ নামে তিনটি সংস্কৃত নাটক লিখেছিলেন। কনৌজ শহর ছিল হর্ষবর্ধনের রাজধানী এবং সেখানে শিল্প-সাহিত্যের চর্চা করা হত।

                                  চিত্রঃ রাজা হর্ষবর্ধন এর স্বাক্ষর  

হর্ষবর্ধন এর সময়ে হিউয়েন সাঙ বাংলায় আসেন এবং তার আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলে গেছেন, হর্ষবর্ধন ন্যায়ের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন। এছাড়াও হর্ষবর্ধন এর রাজসভার সুবিচার এবং রাজার দানশীলতার সম্বন্ধে প্রশস্তি বাক্য লেখেন নিজের ভ্রমণকাহিনিতে।

কনৌজ ছিল তাঁর রাজধানী। তার উপাধি ছিল ‘পরম মাহেশ্বর রাজচক্রবর্তী’। হর্ষ তার রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে সরাইখানা নির্মাণ করেছিলেন। 

বিখ্যাত বাণভট্ট হর্ষবর্ধনের সভাকবি ছিলেন। তিনি হর্ষবর্ধনের জীবনীমূলক গ্রন্থ হর্ষচরিত রচনা করেন; এটি ছিল সংস্কৃত ভাষায় রচিত প্রথম ঐতিহাসিক কাব্যগ্রন্থ। 

হর্ষবর্ধন প‍্রথম জীবনে এক জন বৈশ্য এবং গোড়ায় শিবের উপাসক হলেও পরবর্তীকালে তিনি বৌদ্ধধর্মের অনুসারী হন। তিনি ভারতে বহু বৌদ্ধ মন্দির নির্মাণ করেন এবং নালন্দা মহাবিদ্যালয়ে অনেক দান করেন। প্রতি পাঁচ বছরে তিনি তার রাজধানী কনৌজে একটি বৃহৎ ধর্মসভার আয়োজন করতেন। ধর্মসভা বসাতেন প্রয়াগেও। তিনি ই প্রথম ভারতীয় রাজা যিনি চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন।

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় গুপ্ত আমলে প্রতিষ্ঠিত হলেও, এর সমৃদ্ধি তৈরি হয় হর্ষবর্ধনের আমলে। রাজা হর্ষ নালন্দার ছাত্রদের থাকা, খাওয়া ও পড়ালেখার সুব্যবস্থা করেছিলেন। কাউকেই কোনো কিছুর জন্য অর্থ গুনতে হত না। ১০০ টি গ্রামের কর পাওয়ার বন্দোবস্ত বিশ্ববিদ্যালয়কে করে দিয়েছিলেন হর্ষবর্ধন। 

৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে, হর্ষবর্ধন মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর কোনো উত্তরাধিকার না থাকায়, তাঁর অবর্তমানে অর্জুন নামক এক মন্ত্রী রাজত্ব লাভ করেন।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button