ইতিহাসখেলাধুলাজীবনী

দিদিয়ের দ্রগবাঃযে ফুটবলারের এক কথা থামিয়ে দিয়েছিল যুদ্ধ!

এলেক্স হেস নামক এক বিখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিকের অফিসে থাকা টেলিফোনটি সেদিন হঠাৎ করেই যেন তারোস্বরে বেজে উঠল! রিসিভারটি কানে লাগালে অপরপাশ হতে দরাজ কন্ঠী এক বার্তা ভেসে এসে বলতে লাগল ;

হ্যালো, 

আমি দিদিয়ের বলছি। আবিদজানে চলে এসো, হতাশ হবে না নিশ্চিত, বরং লেখার আরো অনেক খোরাক পাবে।”

কথাগুলো শুনে অবাক হয়েছিলেন হেস! রিসিভারের অপরপাশ হতে সদ্য আবিদজানে আমন্ত্রণ জানানো ব্যাক্তিটি আর কেও নন বিখ্যাত ফুটবল ক্লাব চেলসির স্বর্ণযুগের সারথী এবং তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে বিবেচিত দিদিয়ের দ্রগবা! বেশকিছুদিন যাবৎ দ্রগবার সাক্ষাৎকার নেয়ার চেষ্টায় ছিলেন হেস এবার সে কিংবদন্তিই তাকে আমন্ত্রণ জানালেন নিজ শহরে! 

রিসিভারটা রেখে  খানিক সময়ের জন্য দিদিয়েরের অতীতেই হারিয়ে গেলন সাংবাদিক হেস। 

ভাবনায় ডুবে গেলেন,  সে ১৫ বছরের সাদাসিধে দিদিয়েরে। কৈশর না পেরোতেই যাকে  পারিবারিক কারণে আইভেরিকোস্ট ছেড়ে পাড়ি জমাতে হয়েছিল ফ্রান্সে। রক্তে মিশে থাকা ফুটবল কে ভালোবাসার কারণে জীবনব্যাপি নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সাধারণ এক গলির ফুটবলার হতে কিংবদন্তি কোচ মরিনহোর কল্যাণে জায়গা করে নয়েছিলেন রয়্যাল ক্লাব চেলসিতে! শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চেলসির ঘরের ছেলে হয়ে থাকা দিদিয়ের কালের আবর্তে হয়ে গিয়েছিলেন চেলসির মেইন ম্যান! তৎকালীন ফুটবলে দ্রগবা খাদের কিনারা থেকে অসংখ্যবার টেনে তুলেছিলেন চেলসিকে, প্রিমিয়ার লীগ ট্রফি হতে শুরু করে এফএ কাপ সহ নানা চ্যাম্পিয়নশিপে দলকে এনে দিয়েছিলেন অসামান্য সব সাফল্য, এমনকি বহুদিন যাবৎ অধরা থেকে যাওয়া চ্যাম্পিয়নস ট্রফিকেও চেলসির হাতে ধরিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন  এ কিংবদন্তী খেলোয়াড়। 

হঠাৎই অতীতের জাল ছিড়ে ফের বাস্তবে ফিরে আসলেন এলেক্স হেস!  নানা দোনামনার পর রওনা দিয়েই দিলেন আবিদজানের দিকে। আবিদজানে পৌছে তিনি যখন এর রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন, যেন বার বার অবাকই হয়ে যাচ্ছিলেন। নিজেকেই যেন প্রশ্ন করে যাচ্ছিলেন, একটা দেশে এতটা জনপ্রিয়তা কিভাবে থাকে একজন মানুষের!  রেস্তোরা হতে জুতোর দোকান সব জায়গাই দ্রগবাতে ছেয়ে আছে। দ্রগবা যে তার নিজ এলাকায় এতটা জনপ্রিয় তা ধারণারও বাহিরে ছিল হেসের। 

আবিদজান আসার আগে বেশ সংকোচে থাকলেও এ ভ্রমণ আদতেই বদলে দিয়েছিল হেসের বহু ধারণা ; একইসাথে তার মনে বিশ্বের সবচাইতে প্রভাবশালী খেলোয়াড়ের জায়গাটিও নিয়ে নিয়েছিল সেদিন দ্রগবা।

এতটা জনপ্রিয়তার কারণ কি? জানতে হলে ইতিহাসের পাতা উল্টাতে হয় হেসের। 

২০০৫,  আফ্রিকান দেশগুলোর বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের খেলা চলছিল । শ্বাসরুদ্ধকর এক ম্যাচে সুদানকে হারিয়ে সেবার প্রথমবারের মত বিশ্বকাপের মঞ্চে জায়গা করে নেয় আইসল্যান্ড। পুরো দেশ আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছিল এ অর্জনে। অবশ্য হবে নাইবা কেন! টানা পাঁচটি বৎসর যাবৎ রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে পিড়ীত এক জাতির কাছে এ প্রাপ্তি আদতেই এনে দিয়েছিল অনাবিল প্রশান্তি। পুরো দেশ যখন আনন্দে মাতোয়ারা তখনই  সকল সাংবাদিককে ডেকে বসেন দ্রগবা । পুরো আইভেরিকোস্ট যখন টিভির সামনে দাঁড়ানো মাইক্রোফোন হাতে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে দ্রগবা বিবাদমান দু’পক্ষের কাছে অনুরোধ জানাতে লাগলেন, এ রক্তক্ষয় বন্ধ করতে, দেশকে নবনির্মাণ করতে।

রূপকথার গল্প নয় আসলেই সেদিন গৃহযুদ্ধ থেমে গিয়েছিল দ্রগবার একথায়! সেদিন হতেই আইভেরিকোস্টের প্রতিটি হৃদয় কুঠোরে এক অনন্য জায়গা দখল করে নিয়েছিলেন দ্রগবা, প্রতিটি মানুষের কাছ থেকে পেয়েছিলেন অসম্ভব ভালোবাসা ও মর্যাদা। 

এ সম্পর্কে দ্রগবা হেসকে বলেন ;

“আমি অনেক ট্রফি জিতেছি, অ্যালেক্স। কিন্তু এদের কোনোটিই আমাকে গৃহযুদ্ধ থামিয়ে দেওয়ার চেয়ে বেশি মর্যাদা ও আনন্দ দেয়নি!”

সেই যুদ্ধবিরতির বছর দুয়েক পর আবারো উত্তেজনা, রক্তক্ষয় বাড়তে থাকলে এবারো বাধার প্রাচীর হয়ে দু’পক্ষের মাঝে দেয়াল দাড় করিয়ে দিয়েছিলেন দ্রগবা। নানা কাঠখড় পুড়ানোর পর বিদ্রোহী অধ্যুষিত অঞ্চলে একটি প্রিতী ম্যাচ আয়োজন করেন সবাইকে আবারো ঐক্যবদ্ধ করার আশায়। সে ম্যাচে আইভরিকোস্টের জাতীয় সঙ্গীতের সময় দুই নেতাকেই যখন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে দেখছিলেন , তখন দ্রগবার কাছে মনে হচ্ছিল এ যেন এক নতুন আইভরিকোস্ট জন্ম নিচ্ছে।

আসলেই সেদিন নতুন এক আইভেরিকোস্টের জন্ম হয়েছিল যার অগ্রনায়ক ছিলেন দ্রগবা নিজেই। একজন ফুটবলার হয়েও যিনি জাতির দুঃসময়ে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেননি, জয়ের উল্লাসে মত্ত না থেকে হাটু গেড়ে দেশের মানুষের জন্য শান্তি ভিক্ষা করতেও পিছপা হননি । আলেক্স হ্যাসের সে ভ্রমণ হতে ফেরার সময় হয়ত তার মনেও একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল শুধুই কি কিংবদন্তি দ্রগবা?  নাকি আরো বেশিকিছু? পৃথিবীতে আর কোন ফুটবলার কি পেরেছিল কোন যুদ্ধ থামিয়ে দিতে? 

মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ খাঁন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

আরো পড়ুন;

মোঙ্গলদের ইসলাম গ্রহণের ইতিহাস;https://cutt.ly/yjbuYeg

Show More

MK Muhib

A researcher,An analyst,A writer,A social media activist,student at University of dhaka.

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button