ইতিহাসজীবনী

শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহঃ বাঙালি জাতীয়তাবাদের জনক

মধ্যযুগীয় বাংলার সুলতানদের মধ্যে এক বিশেষ  স্থান দখল করে আছেন ইলিয়াস শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ। অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুসলিম স্বাধীন সুলতান ছিলেন তিনি। শুধু ইলিয়াস শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা ই  নয়, মধ্যযুগের মুসলিম বাংলার ইতিহাসে প্রথম বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্রষ্টা ও তিনি। সেই কারণে বাঙালি জাতীয়তাবাদেরও জনক বলা হয় তাকে। তিনিই প্রথম বাঙালি জাতিকে বাঙালি হিসেবে পরিচিত করেন। তিনি ছিলেন বাংলার একজন স্বাধীন শাসনকর্তা।

ইলিয়াস শাহ এর জন্ম পূর্ব পারস্যের সিজিস্তানের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তার পিতার নাম সুলতান। 

দিল্লির মালিক ফিরুজের অধীনে চাকরি করার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। কিন্তু সেখান থেকে কোনো এক কারণে তিনি বাংলায় পালিয়ে আসেন। পরবর্তীতে সাতগাঁও এর তুগলক শাসনকর্তা ইজ্জউদ্দীন ইয়াহিয়ার অধীনে চাকরি গ্রহণ করেন। সেখানে নিজ যোগ্যতা বলে মালিক পদে উন্নীত হন তিনি।

১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে, ইজ্জউদ্দীন ইয়াহিয়ার মৃত্যুর পর সাতগাঁওয়ের ক্ষমতা দখল করে, একে দিল্লির অধীন থেকে মুক্ত ঘোষণা করেন তিনি। সেখানে তাঁর কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত করে তিনি লখনৌতির আলাউদ্দীন আলী শাহ-এর বিরুদ্ধে প্রায় দুই বছর ব্যাপী এক দীর্ঘ যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। ১৩৪২ খ্রিস্টাব্দে, যুদ্ধে জয়লাভ এর পর সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ উপাধি নিয়ে লখনৌতির সিংহাসনে আরোহণ করেন ইলিয়াস শাহ। সেই সাথে ইলিয়াস শাহী বংশের সূচনা করেন।

ইলিয়াস শাহী বংশ ১৩৪২ সাল থেকে ১৪১৫ সাল পর্যন্ত একটানা ৭৩ বছর ধরে অবিভক্ত বাংলা শাসন করে এবং এরপর মাঝখানে প্রায় ২০ বছর বাদ দিয়ে আরো ৫২ বছর তাদের শাসন অবধারিত থাকে।

লখনৌতিতে তাঁর ক্ষমতা সুদৃঢ় করে রাজ্যবিস্তারে মনোনিবেশ করেন তিনি। পরবর্তীতে ১৩৪৪ খ্রিস্টাব্দে, ত্রিহুত দখল করেন। তখন কার ত্রিহুতের আত্নকলহই ইলিয়াস শাহকে অনুপ্রানিত করে ত্রিহুত বিজয় করতে।

শম্ভুনাথের শিলালিপি ও নেপাল রাজবংশাবলিতে ইলিয়াস শাহের নেপাল আক্রমণের কথা বিস্তারিত উল্লেখ আছে। ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দে, নেপালের তরাই অঞ্চলে এক দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করেন তিনি। যে অঞ্চলে এর পূর্বে কোনো মুসলিম বাহিনী প্রবেশ করতে পারে নি। এর পর রাজধানী কাঠমুণ্ডু পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে শম্ভুনাথ মন্দির ধ্বংস করেন এবং বিপুল ধনসম্পদ নিয়ে ফিরে আসেন তিনি। কিন্তু অদ্ভুতভাবে নেপালের কোনো অংশ তাঁর রাজ্যভুক্ত করেন নি তিনি। 

১৩৫২ খ্রিষ্টাব্দে, তিনি যখন পূর্ব বাংলার রাজধানী সোনারগাও আক্রমণ করেন তখন ফখরউদ্দিনের পুত্র ইখতিয়ার উদ্দিন গাজী শাহ এর শাসনকর্তা ছিলেন। ইলিয়াস শাহ তাকে বিতাড়িত করে সোনারগাঁও দখল করেন। এভাবে তিনি বাংলার তিনটি প্রদেশ যথাঃ-  সাতগাঁও, লখনৌতি ও সোনারগাঁও অঞ্চল একত্রিত করে স্বাধীন সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন। এই কারণে তার রাজ্যসীমা আসাম হতে বানারসী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

পরবর্তীতে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দে বিহার আক্রমণ করেন ইলিয়াস শাহ। বিহারের পরেও তিনি তাঁর কর্তৃত্ব চম্পারণ, গোরখপুর এবং বেনারস পর্যন্ত বিস্তৃত করেন।

শামস-ই-সিরাজ আফিফ তাঁকে ‘শাহ-ই-বাঙ্গালাহ’, ‘শাহ-ই-বাঙ্গালিয়ান’ ও ‘সুলতান-ই-বাঙ্গালাহ’ ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত করে।

দিল্লির কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে নিজেকে শক্তিশালী করার জন্য তিনি একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠন করেন। সুলতান ফিরুজ শাহ তুগলক ইলিয়াস শাহকে দমন করার জন্য বাংলা অভিমুখে অভিযান করেন। যদিও এ অভিযানে তিনি সাফল্য লাভ করতে পারেন নি। বরং ইলিয়াস শাহের সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করে তুগলক দিল্লি ফিরে যান ফিরুজ শাহ। ফলে ইলিয়াস শাহ স্বাধীন সুলতান হিসেবে বাংলা শাসন করতে থাকেন। বাংলা ও দিল্লির সুলতানদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উপহার ও দূত বিনিময়ের মাধ্যমে আরও দৃঢ় হয়। তাঁদের মধ্যে ১৩৫৫, ১৩৫৬, ১৩৫৭ ও ১৩৫৮ খ্রিস্টাব্দে দূত ও উপহার বিনিময় হয়েছিল। দিল্লির সুলতানের সঙ্গে বন্ধুত্ব ইলিয়াস শাহকে পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরা রাজ্যের ওপর তাঁর প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ করে দেয়।

সাহসী যোদ্ধা ইলিয়াস শাহ সফল সমরনায়কের সকল গুণের অধিকারী ছিলেন। তিনি বাংলা এবং বাংলার বাইরে ও তার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কৃতিত্বপূর্ণ বিজয় অর্জন করেছিলেন।

লখনৌতির শাসক হিসেবে বাংলা অধিকার করলেও তিনি বাংলা ভাষাভাষীদের সমন্বয়ে ১৩৫২ সালে গৌড় এবং বঙ্গ রাজ্য একত্রিত করে এই ভূখন্ডের নাম রাখেন ‘বাঙ্গালাহ’। তিনিই প্রথম এই ভূখণ্ডের একই ভাষাভাষী ও নৃতাত্বিক বৈশিষ্টসম্পন্ন জনগোষ্ঠীকে ‘বাঙালি’ নামে নামকরন করেন এবং বাঙালি পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ করেন।  মূলত এ সময় হতেই বাংলার সকল অঞ্চলের অধিবাসী বাঙালি জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং বাংলার বাইরের দেশগুলোও তাদের কে বাঙালি বলে অভিহিত করে। আর এ কারণেই তাকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্রষ্টা হিসেবে অভিহিত করা হয়।

এছাড়াও প্রথম ফার্সির পাশাপাশি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার কৃতিত্ব ও সুলতান ইলিয়াস শাহ এর। তিনি বাঙালিদের কে বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চায় উৎসাহিত করেন। এভাবেই একজন মুসলিম শাসকের হাত ধরে বাঙালি জাতি এবং বাংলা ভাষা বিকশিত হওয়া শুরু করে ।

উনার আগে হিন্দুরা সংস্কৃত ভাষার চর্চা করত এবং বাংলা ভাষাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য অবহেলা করত বলে জানা যায়। এমনকি হিন্দু ব্রাহ্মণরা ফতোয়া দিয়েছিল বাংলা ভাষার চর্চা করলে রৌরব নামক নরকে গমন করতে হবে।

তিনি বাংলার রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে উন্নতি সাধনের প্রবল চেষ্টা করেছিলেন। প্রকৃত জাতীয় নেতা হিসেবে তিনি সকলের সাথে সমান আচরণ করতেন। স্থানীয় জনগণকে উদারভাবে সুযোগ সুবিধা দিয়ে তিনি তাঁর শাসনকে গণশাসনের রূপ দেন। তিনি বর্ণ, গোত্র ও ধর্ম নির্বিশেষে যোগ্য লোকদের চাকরিতে নিয়োগ লাভের সুযোগ দেন। সম্ভবত তিনিই সর্বপ্রথম স্থানীয় লোকদেরকে অধিক সংখ্যায় সৈন্যবাহিনীতে নিয়োগ করেন।

ইলিয়াস শাহ একজন নিষ্ঠাবান ধার্মিক ব্যক্তি ছিলেন। সুফি দরবেশ ও হিন্দু সন্ন্যাসীদের প্রতি তাঁর ছিল গভীর শ্রদ্ধা।

এসব কিছুর বাইরে ইলিয়াস শাহ একজন নির্মাতাও ছিলেন। তিনি হাজিপুর শহরের প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়া দিল্লির শামসী হাম্মামখানার অনুকরণে একটি হাম্মামখানা নির্মাণ করেন। ১৩৫৮ খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি ষোল বছর একক ভাবে রাজত্ব করেছিলেন।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button