ইতিহাসখেলাধুলাজীবনী

ববি ফিশারঃএক উন্মাদ বিশ্বসেরা দাবাড়ুর গল্প

বলছি সোভিয়েত ও মার্কিনিদের মাঝে চলমান কোল্ড ওয়ারের সময়কার কথা। স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে দু’টো দেশের সম্পর্ক খুবই বাজে অবস্থায় পৌছে গিয়েছিল। এমনকি দু’জাতির মাঝে হওয়া যেকোন সাধারণ খেলাও তাদের সম্মানের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছিল । লড়াইয়ের অন্যতম উপজীব্য হয়ে দাড়িয়েছিল বুদ্ধির খেলা হিসেবে পরিচিত দাবার লড়াই । জাতিদু’টি খেলাটিকে এতটাই স্পর্শকাতর পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল যে এ খেলাটিকে সে জাতিদুটি বুদ্ধির পরিমাপক হিসেবে বিবেচিত করা শুরু করেছিল!   

মার্কিনিরা এদিক হতে বেশ কঠিন অবস্থায় ছিল সেদিনগুলোতে। দাবার লড়াইয়ে তখন বিশ্বব্যাপী একক আধিপত্য বিস্তার করছিল সোভিয়েত দাবুড়ুরা। সোভিয়েত দের হাত থেকে বুদ্ধির সম্মানের এ মুকুট ছিনিয়ে মার্কিনিদের চিন্তার ভাঁজ দূর করতেই যেন কোন এক দিন উদয় হয়েছিল ববি ফিশার নামটি। 

তর্কসাধ্যে সর্বকালের সেরা এই দাবাড়ুর জন্ম হয় ১৯৪৩ সালের ৯’ই মার্চ পদার্থবিজ্ঞানি ও গণিতবিদ পল নেময়ি ও  মেডিসিনে পিএইচডি হোল্ডার মা রেজিনা ফিশার নামক দু’জিনিয়াসের ঔরসেই জন্মগ্রহণ করেন ববি ফিশার নামক আরেক জিনিয়াস। 

মাত্র ছ’বছর বয়স হতেই বোনের সাথে দাবা খেলা শুরু হয় ববি ফিশারের। বোনের দাবাতে আগ্রহে ভাটা এবং মায়ের এ খেলায় সময় না করতে পারার কারণে অল্প বয়স হতেই ববি নিজের সাথেই নিজে খেলা শুরু করেন। ব্রুকলিন শহরে বেড়ে উঠা এ কিশোর খুব অল্প সময়েই এ খেলায় আসক্ত হয়ে পড়েন। তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও অভিনব মনোযোগের কারণে ন’বছর বয়সেই প্রথম কোন দাবা টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করেন ববি ফিশার। ১১ বছর বয়সেই হয়ে যান নিউইয়র্ক দাবা ক্লাবের সদস্য। 

ছোটবেলা হতেই দাবায় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখা অদম্য এ কিশোরের ধ্যান-জ্ঞান সবই হয়ে পড়েছিল দাবা । তার বন্ধুদের ভাষ্যনুযায়ী ববি এদিক ওদিক ঘুরাঘুরি করে দাবার কোন বই পেলেই বসে পরত, এবং সবকিছু মুখস্ত করে ফেলত। 

১৩ বছর বয়সেই ববি ফিশার আমেরিকান জুনিয়র দাবা খেতাব লাভ করেন এবং নিজ দেশের শীর্ষ গ্র‍্যান্ডমাস্টারদের সাথে দাবার কোটে মুখোমুখি হতে শুরু করেন। এমনকি তের বছর বয়সেই ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার রবার্ট বার্নকে এক শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে হারিয়ে আলোচনার পাত্র হয়ে বসেন ববি ফিশার৷ সময়ের সাথে নিজেকে আরো শাণিত করতে থাকেন ববি একইসাথে তার র‍্যাংকও বাড়তে থাকে সমানতালে৷ 

তৎকালীন বিশ্ব দাবাতে একক আধিপত্য থাকা সোভিয়েত ইউনিয়ন যারা এতটাই আধিপত্য বিস্তার করেছিল স্বতন্ত্র এ খেলাটিতে যে অর্ধশত বৎসর যাবৎ কেও তাদের কাছ থেকে সে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট ছিনিয়েই আনতে পারছিল না। সোভিয়েত দের অপ্রতিরোধ্য এ স্বপ্নকে ববি ফিশার মাত্র পনের বছর বয়সেই একেবারে গুড়িয়ে দিয়েছিল, মার্কিনিদের জন্য নিয়ে এসেছল সে আরাধ্য শিরোপা। একইসাথে সর্বকনিষ্ঠ দাবা গ্র‍্যান্ডমাস্টারের খেতাব পর্যন্ত অর্জন করে নিয়েছিলেন ববি ফিশার। 

বয়সের সাথে সাথে ফিশারের নামডাক যেমন বৃদ্ধি পেতে থাকে তেমনই ঔদ্ধত্যও সমানতালে বৃদ্ধি পেতে থাকে। দাবার খেলা দিয়েই যে তিনি পত্রিকার শিরোনাম বনে থাকতেন তেমনটাও কিন্তু নয়, বেশিরভাগ সময়ই তিনি নানা বেফাস মন্তব্য করেই তুমুল সমালোচিত হয়েছেন এ জগতে। 

সেবার মস্কো শহরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল দাবা চ্যাম্পিয়নশিপ, যাতে অনূর্ধ্ব বয়সী ছেলেদের হারিয়ে মন ভরছিল না ববি ফিশারের। চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন তৎকালীন বিশ্বসেরা মিখাইল বটভিনিকের দিকে। সোভিয়েত ইউনিয়ন তার এই আবেদন নাকচ করে দিলেই বেঁকে বসেন ববি ফিশার,  জনসম্মখে বলে বসেন “এই রাশিয়ান শুকরদের উপর আমি অতীষ্ট” এছাড়াও রাশানদের নানা সময় নানা কটু কথা শোনাতেও পিছপা হননি এ দাবাড়ু। তার এ সকল উত্তপ্ত বাক্যের কারণে সোভিয়েত তার ভিসা পর্যন্ত বাতিল করে দেয়। 

তার মা’র সাথেও তার খুব একটা বনিবনা হয় নি, মা’ চেয়েছিলেন ছেলে পপড়ালেখার পাশাপাশি দাবা চালিয়ে যাক কিন্তু এক্ষেত্রে ১৬ বছর বয়সে স্কুলই ছেড়ে দেন ববি ফিশার । মায়ের থেকে আলাদাও হয়ে যান তিনি এবং কালের আবর্তনে তার দাবার ধার যেমন বাড়তে থাকে মানসিক অসঙ্গতিও তেমনটাই পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। বিভিন্ন টকশো, পাবলিক প্লেসে একের পর এক বিতর্কিত মন্তব্য ছুড়তে থাকেন এ ব্যাক্তি ;

ইহুদিদের সম্পর্কে বলে বসেন ;

মাত্রাতিরিক্ত ইহুদি এ খেলায় প্রবেশ করেছে, যারা এ খেলার জাত নিচের দিকে নিয়ে যাচ্ছে”

নারীদেরকেও ছেড়ে দেন নি এ জিনিয়াস উন্মাদ,

তাদের সম্পর্কে বলে বসেন,

তাদের এ খেলা খেলতে দেয়াই উচিত নয়, তারা এ খেলাকে নাকি পাগলা-গারদ বানিয়ে ফেলছে!

এমন কটুবাক্য প্রকাশ ও জনমানবে তুমুল সমালোচিত হওয়ার পরও দাবার কোটে এ ব্যাক্তি দিনকে দিন ধরা ছোঁয়ার বাহিরেই চলে যাচ্ছিলেন!

১৯৫৭ হতে ৬৭ এই দশটি বছর টানা আটবার ইউএস চ্যাম্পিয়নশিপ শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পড়েন এ দাবাড়ু! টানা ১১ বার জিতে যে রেকর্ড এ দাবাড়ু করে দিয়ে গিয়েছেন তা আজো কেও ভাঙতে পারে নি! 

সোভিয়েত-মার্কিনিদের বুদ্ধির পরিমাপক এ লড়াইয়ে সোভিয়েতদের একক আধিপত্য কেও তিনি ভেঙে দিতে সক্ষম হন। বড় বড় রাশান গ্র্যান্ডমাস্টার তিগরান পেত্রোসিয়ান ও মার্ক তাইমানোভকে তিনি দাবার বোর্ডে বলতে গেলে হেনস্তা করে ছাড়েন। এই অর্ধ-পাগল মার্কিনির কাছ হতে যেন রাশানরা তাদের এতদিনের গৌরব হারাতে বসেছিল এমন সময়েই তার জয়রথে বাধ দিয়ে বসেন ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন বরিস স্প্যাস্কি!

জার্মানিতে অনুষ্ঠিত ১৯তম দাবা অলিম্পিয়াডে ববি ফিশার বোরিস স্প্যাস্কির মুখোমুখি হলে শ্বাসরুদ্ধকর এক ম্যাচে হেরে যাওয়ার পর ববির উন্মত্ততা বেড়ে যায় বহুগুণ, রাশানদের সাথে মোকাবেলার জন্য জুড়ে দিতে থাকেন নানা শর্ত। 

মনোযোগে ব্যঘাত ঘটে এমন কোন শব্দ হতে পারবে না বলে তিনি আয়োজকদের দর্শক কিংবা মিডিয়া প্রবেশে নিষেধ করে দেন মঞ্চে।

সামান্য শব্দ তার মনোযোগে অনেক ব্যাঘাত ঘটাত। একেবারে রেগে গিয়ে তিনি খেলার মাঝখানে পরিচালনাকারীদের সাথে তর্কে লিপ্ত হতেন। ববির শর্ত মেনেই সেবার থেকে পরের খেলাগুলো অনুষ্ঠিত করা শুরু হতে লাগল টেনিস ফিল্ডে। এরপর হতেই ফের কারিশমা দেখাতে শুরু করেন ববি । একটাতে ড্র এবং বাকি সবগুলো ম্যাচে জয় লাভ করে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট নিয়ে আসেন মার্কিনিদের ঘরে। টানা ২৪ বছর ধরে দাবার শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট ধরে রাখা সোভিয়েত দের সে জয়রথ সেবার থামিয়ে দেন ববি ফিশার। 

এরপর বয়সের সাথে সাথে তার উন্মত্ততা বাড়তে থাকলে ধীরে ধীরে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যেতে থাকেন এ কিংবদন্তী!  তবুও যে তার বেফাস মন্তব্য বন্ধ হয়েছিল তেমনটাও নয়!  

৯/১১ এর পর তিনি আবার বলে বসেন ; তিনি আমেরিকার ধবংস দেখতে চান! 

 বিদেশে অনুমতি ছাড়া এক দাবার টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের কারণে আমেরিকান সরকার তাকে গ্রেফতারের  আদেশ দেন। সে ক্ষোভ হতেই এ উক্তির উদ্ভব হয়। ২০০৪ সালে জাপানে তাকে মার্কিনি পাসপোর্ট নিয়ে যাতায়াতের জন্য তাকে সরাসরি গ্রেফতার করে হলে তিনি পরবর্তীতে আইসল্যান্ডের নাগরিকত্ব নেন এবং ২০০৮ সালের জানুয়ারি মাসে আইসল্যান্ডের নাগরিক হয়েই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এ কিংবদন্তি দাবা প্রডিজি। 

মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ খাঁন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

আরো পড়ুন;

সুলতান মাহমুদের সোমনাথ অভিযানের কারণ;https://cutt.ly/yl0sZbT

Show More

MK Muhib

A researcher,An analyst,A writer,A social media activist,student at University of dhaka.

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button