জীবনীসাম্প্রতিক

প্রয়াত রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ জীবনী

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বাংলাদেশের একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং  স্বনামধন্য আইনজীবী ছিলেন। এর আগে উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্বরত ছিলেন তিনি। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম একজন সদস্য। এছাড়াও অষ্টম জাতীয় সংসদে আইন ও বিচার বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী ছিলেন প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ। 

জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য ছিলেন।

জন্ম ও পরিবার 

মওদুদ আহমেদ ১৯৪০ সালের ২৪ মে, নোয়াখালী জেলার কোম্পানিগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মমতাজ উদ্দিন আহমেদ এবং মা বেগম আম্বিয়া খাতুন। তারা মোট ছয় ভাইবোন ছিলেন এবং মওদুদ আহমেদ ছিলেন ভাই-বোনের মধ্যে চতুর্থ। তার স্ত্রীর নাম হাসনা মওদুদ।

শিক্ষা ও কর্মজীবন

মওদুদ আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মান পাশ করেন। পরবর্তীতে বৃটেনের লন্ডনে অবস্থিত লিঙ্কন্স ইন থেকে ব্যারিস্টার ডিগ্রি অর্জন করেন।

ব্যারিস্টার ডিগ্রি অর্জনের পর দেশে ফিরে আসেন তিনি। হাইকোর্টে ওকালতি শুরু করার মাধ্যমে সম্পূর্ণ ভাবে আইন পেশায় নিজেকে নিয়জিত করেন। এছাড়াও ব্লান্ড ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন তিনি।

রাজনৈতিক জীবন

১৯৭৭ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানে সরকারের মন্ত্রী ও উপদেষ্টা ছিলেন মওদুদ আহমেদ। ১৯৭৯ সালে, প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তাকে উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। ১৯৮১ সালে, জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেন। ১৯৮২ সালে, এরশাদ সামরিক শাসন জারি করার পর বিশেষ সামরিক আদালতে ১০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন এই রাজনীতিবিদ।

১৯৮৫ সালের নির্বাচনে দ্বিতীয় বারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মওদুদ আহমেদ। ১০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়া অবস্থায় ই সরকারের তথ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এর এক বছর পর ১৯৮৬ সালে, তাকে আবারও উপ-প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯৮৮ সালে,

উপ-প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে অব্যাহতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। এর ৩ বছর পর ১৯৮৯ সালে, তাকে শিল্প মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি উপ-রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনিত করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে, জনরোষের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে দেয় এরশাদ সরকার। এরপর জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন নিয়ে ১৯৯১ সালে আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মওদুদ আহমেদ। এরশাদের পতনের পর ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত, জাতীয় পার্টিতে থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি।

১৯৯৬ সালে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে আবার বিএনপিতে যোগ দেন মওদুদ আহমেদ। ২০০১ সালে, নির্বাচনে তিনি বিএনপি থেকে মনোনয়ন নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এই নির্বাচনের পর আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী মওদুদ আহমদ ধানের শীষ ও লাঙ্গল; দুই প্রতীকেই নির্বাচন করেছেন। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালে সংসদ সদস্য হিসেবে প্রার্থী ছিলেন মওদুদ আহমেদ। এই পাঁচবারই নোয়াখালী জেলার কোম্পানিগঞ্জ উপজেলা থেকে নির্বাচন করেন তিনি।

জিয়াউর রহমান ও এরশাদের শাসনামলে মওদুদ আহমেদ যেসব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তা হলোঃ-

-শিল্প মন্ত্রণালয়;

-পরিকল্পনা, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়;

-বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়;

-পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়;

-বন্যা নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রণালয়;

-যোগাযোগ ও রেলযোগাযোগ মন্ত্রণালয়;

-সড়ক যোগাযোগ মন্ত্রণালয়;

-টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন মন্ত্রণালয়।

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ। ওই সময় ইয়াহিয়া খান কর্তৃক আহুত গোলটেবিল বৈঠকে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও  আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে অন্যতম একজন আইনজীবী ছিলেন তিনি।

মৃত্যু

গত ১৬ই মার্চ, ২০২১ সালে বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যে ৬.৩০ মিনিট নাগাদ মৃত্যুবরণ করেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ। প্রসঙ্গত, রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ হ্রাস এবং সেই সাথে বুকে ব্যথা অনুভব করায় গত ২৯ ডিসেম্বর ঢাকায় এভার কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। সেখানে তার হার্টে ব্লক ধরা পড়ায় তার হৃদযন্ত্রে স্থায়ী পেসমেকার বসানো হয়। পরবর্তীতে গত ২ ফেব্রুয়ারি, সিওপিডি রোগ ধরা পড়লে উন্নত চিকিৎসার জন্যে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় তাকে। গত ৯ মার্চ বিকেলে আশঙ্কাজনক অবস্থায় মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়ার পর তার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। যদিও  তখনও তার অবস্থা সংকটাপন্ন ছিল। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button