ইতিহাস

লিলেহ্যামার দুর্ঘটনাঃ ইসরাইলের সবচেয়ে দুধর্ষ এজেন্টদের ধরা পড়ার গল্প

১৯৭৩ সাল, মধ্যপ্রাচ্যর উত্তপ্ত আগুনের তাপ ইউরোপে একটু একটু করে আসতে শুরু করেছে।  আগের বছর মিউনিখের অলিম্পিক ভিলেজে ফিলিস্তিনি  গেরিলাদের হামলায় ১১জন ইসরাইলি খেলোয়াড়ের মৃত্যু হয়। ক্রোধে উন্মত্ত ইসরাইল কোনোরুপ আর্ন্তজাতিক নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে থাকা ফিলিস্তিনি নেতাদের হত্যা করতে থাকে।   

মোসাদ হিট স্কোয়াড

১৯৭৩’র গ্রীষ্মে ইসরাইলি গোয়েন্দাদের কাছে খবর আসে নরওয়ের এক ছোট শহর লিলহ্যামারে লুকিয়ে আছেন আলি হাসান সালামেহ। ফিলিস্তিনি সংগঠন ব্ল্যাক সেপ্টেম্বরের অন্যতম নেতা ও মিউনিখ হামলার মূল পরিকল্পনাকারী।খুবই রহস্যজনক চরিত্র এই আলি হাসান সালামেহ। বিভিন্ন সময় অনেক কাছে যেয়েও তাকে হত্যা করতে পারেনি মোসাদ।দ্রুত ছদ্মবেশ নেয়ার ক্ষমতা সালামেহকে মোসাদের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিচ্ছিল। এছাড়া সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি,সালামেহকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সাহায্য করতো বলে প্রচার আছে।তাই সালামেহ ছিলেন মোসাদের হিট লিস্টের শীর্ষে। সালামেহর খোঁজ পাওয়ার সাথে সাথেই ১৫জন সদস্যকে নিয়ে নরওয়ের পথ রওনা হন মোসাদের ডিরেক্টর যাভি যামির । সাথে ছিলেন অপারেশনাল কমান্ডার মাইকেল হারারি। টার্গেটের উপর নজরদারি করার দায়িত্বে থাকা এজেন্টের নাম সিলভিয়া রাফায়েল। এই কাজে মোসাদের অন্যতম সেরা এজেন্ট তিনি। শুরু থেকেই  টার্গেটের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছিলেন না সিলভিয়া । আহমেদ বুশিকি নামের যেই ওয়েটারকে তারা সালামেহ হিসেবে সন্দেহ করছেন তাঁর সাথে কোনো ফিলিস্তিনি সংগঠনের যোগাযোগ আছে বলে জানা নেই।পুরো নজরদারির সময় একবারও পেছন ফিরে তাকাননি বুশিকি। তাছাড়া এত বড় গেরিলা নেতা কোনো ধরনের নিরাপত্তা ছাড়া থাকবেন, সেটাও মানতে কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু সালামেহর সাথে চেহারায় মিল থাকায় অপারেশন চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেন সিলভিয়া। পরিচয় নিশ্চিত হতে এক নারী এজেন্ট সালামেহর সাথে ফ্রেঞ্চ ভাষায় কথাও বলেন। কারণ মোসাদের কাছে তথ্য ছিল, সালামেহ বেশ কয়েকটি ভাষায় পারদর্শী।

সিলভিয়া রাফায়েল

২১শে জুলাই সন্ধ্যায় পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে মোসাদ এজেন্টরা বুশিকিকে টানা নজরদারিতে রাখেন। আরেকটি দল তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে পিছু নেয়। গর্ভবতী স্ত্রীকে নিয়ে বাসার কাছে পোছানো মাত্রই, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ী থেকে নেমে  আসেন দুই ব্যক্তি। কিছু বুঝে উঠার আগেই বুশিকিকে গুলি করে পালিয়ে যায় তারা। কাছেই দাড়িয়ে থাকা পুলিশ সদস্যরা আসার আগেই মারা যান বুশিকি।   

নিহত আহমেদ বুশিকি

লিলেহ্যামার শহরে গত ৩৬ বছরে এটাই প্রথম খুনের ঘটনা। হত্যার ধরনে টনক নড়ে নরওয়ে পুলিশের।ছোট শহরে একসাথে এতগুলো বিদেশীর আগমনে এমনিতেই সন্দেহের চোখে দেখছিল তারা । বিমানবন্দরেই পালিয়ে যাবার আগে ধরা পড়ে দুই এজেন্ট। তাদের দেয়া তথ্যমতে  ধরা পড়ে সিলভিয়াসহ আরো ৪ জন। পুরো ইউরোপ জুড়ে মোসাদের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে সাড়া পড়ে যায়। বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দাদের হাতে ধরা পড়তে মোসাদের একের পর এক এজেন্ট ও সেফ হাউজ। ধরা পড়া এসব এজেন্টদের একজন ছিল ড্যান আরবেল। তার কাছ থেকে পাওয়া একটি চাবির সুত্র ধরে পুরো ইউরোপ জুড়ে থাকা মোসাদের নেটওয়ার্ক ফাঁস করে দেয় ফরাসি পুলিশ। গা ঢাকা দিতে থাকে মোসাদের কর্মীরা। কেউ কেউ ইসরাইল পালিয়ে যায়। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা আসে যখন জানা যায়, হত্যার স্বীকার ব্যাক্তিটি সালামেহ নন। বরং একজন সাধারণ ওয়েটার । যিনি স্ত্রীসহ মরক্কো থেকে নরওয়েতে পাড়ি জমিয়েছিলেন। ব্যাপক কূটনৈতিক চাপের মুখে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার, ইউরোপে মোসাদের কার্যক্রম স্থগিত করতে বাধ্য হন। মুলত সালেমহ নিজেই ইসরাইলি গোয়েন্দাদের কাছে নিজের সম্পর্কে ভুল  তথ্য  দিয়ে বিভ্রান্ত করেন। এই ঘটনায় জড়িত ইসরাইলি গুপ্তচরদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয় নরওয়ে। কিন্তু দেড় বছর পর মার্কিন কূটনীতিক প্রচেষ্টায় তাদের ইসরাইলে ফেরত পাঠিয়ে দেয় নরওয়ে ।

আলি হাসান সালামেহ

সিল্ভিয়া রাফায়েলের জন্য সেটাই ছিল গোয়েন্দা ক্যারিয়ারের সমাপ্তি। দেশে ফিরে এক ডাক্তারকে  বিয়ে করেন তিনি। পালিয়ে যাওয়া বাকি মোসাদ এজেন্টদের এখনো নরওয়েতে ফেরারী হিসাবে  গণ্য করা হয়। ১৯৭৯ সালের ২২শে জানুয়ারি, বৈরুতে এক গাড়ি বোমা হামলায় সালেমহ মারা যান। এ ঘটনার পেছনেও মোসাদ জড়িত ছিল বলে ধারণা করা হয়। লিলহ্যামারের  ঘটনার দায় আজও স্বীকার করেনি ইসরাইল। তবে ১৯৯৬ সালে বুশিকির স্ত্রী ও মেয়েকে প্রায় ২,৮৩,০০০ ডলার ক্ষতিপুরণ দেয় ইসরাইল। এ ঘটনার রেশ  ইসরাইল কখনই কাটিয়ে উঠতে পারেনি ইসরাইল। ধারনা করা হয়, সিলভিয়া ও আরবেল দুজনেই ইসরাইলের পারমানবিক অস্ত্র সম্পর্কে গুরুত্বপুর্ন তথ্য নরওয়ের পুলিশের কাছে দিয়ে দেয়। কিন্তু সেসময় এ বিষয়ে নরওয়ের সরকার নিরব থাকে। কিন্তু ১৩ বছর পর, মরদেচাই ভানাউ নামে আরেক এজেন্ট গোটা বিশ্বের কাছে ইসরাইলে গণ বিধ্বংসী অস্ত্রের কথা ফাঁস করে দেন। যে গল্প আপনাদের কিছুদিনা আগেই জানিয়েছিলাম।       

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button