আন্তর্জাতিকইতিহাস

যেভাবে ফাঁস হয়েছিল ইজরায়েলের গোপন পরমাণু অস্ত্র প্রকল্প

বলুন তো মধপ্রাচ্যর কোন দেশটি তাদের পরমাণু স্থাপনায়  আন্তর্জাতিক পরমাণু নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে প্রবেশের অনুমুতি দেয় নি? কোন দেশটি জাতিসংঘের ৭৭টি রেজুলুশ্যন ভঙ্গ করার পরও কোনো শাস্তির মুখে পড়েনি? কোন দেশটি গোপনে জীবাণূ অও রাসায়নিক অস্ত্র তৈরি করছে?  দেশটির নাম ঈসরাইল। মধ্যপ্রাচ্যর বিষফোড়া।ইসরাইল রাষ্ট্র সৃষ্টির পরপরই এটি গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরীর পরিকল্পনা করে। তাদের এই পরিকল্পনায় পরোক্ষ ইন্ধন যুগিয়ে যাচ্ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।  তবে মার্কিন সরকারের ধারণার বাইরে উন্নতি করে বসেছিল ইসরাইল। ইসরাইলের কয়েকটি শহর জুড়ে পরমাণু ও জীবাণু অস্ত্রের গবেষণা কেন্দ্র বানিয়ে ফেলেছিল ইসরাইল।  মার্কিন কর্মকর্তারা ইসরাইলের এই উন্নতির কথা প্রেসিডেন্ট কেনেডিকে জানালে তিনি একটি পর্যবেক্ষক দল পাঠান। কিন্তু ধুর্ত ইসরাইল সেই পর্যবেক্ষকদের ভূয়া কিছু নিউক্লিয়ার সাইট দেখিয়ে  নিজেদের উন্নতির কথা জানতে দেয়নি। মার্কিন সরকার এক গোপন চুক্তিতে ইসরাইলের  পরমাণু কর্মসূচিকে সমর্থন যুগিয়ে যাবার আশ্বাস দেয়, যতক্ষণ না পর্যন্ত তা বাইরের পৃথিবীর কাছে গোপন থাকে। কঠোর গোপনীয়তায় চলতে থাকে ইসরাইলের গণ-বিধ্বংসী অস্ত্র তৈরীর প্রক্রিয়া। তবে শেষমেষ তা আর গোপন থাকেনি। ইসরাইলের নিজেদের লোকই বিশ্বের কাছে ফাঁস করে দিয়েছিল এই প্রকল্পের কথা। আজ জানবো সেই গল্প।  

তার আসল নাম জন ক্রসম্যান। কিন্তু তার পিতা-মাতা ইসরাইল রাষ্ট্রে এসে নাম পরিবর্তন করে রাখে মরদেচাই ভানুনু । ছোটবেলা থেকে একরোখা ও ডানপিটে স্বভাবের মরদেচাই যোগ দেন ইসরাইলি সেনাবাহিনীতে। ডানপন্থী প্রোপাগান্ডার বদৌলতে  তার মনে সবসময় ছিল তীব্র আরব বিদ্বেষ। কিন্তু ক্রমেই যখন ইসরাইল রাষ্ট্রের বিভিন্ন কুকর্মের ব্যাপারে জানতে থাকেন, তার মনে ভাবান্তর সৃষ্টি হয়। তিনি বামপন্থী রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে যান। আরব ইসরাইলিদের জন্য সমান অধিকারের আন্দোলনে যুক্ত হন। ১৯৮২ সালের লেবানন-ইসরাইল যুদ্ধে ফিল্ড ডিউটি দিতে অস্বীকৃতি জানান।  তিনি ক্রমেই ইস্রাইল রাষ্ট্রের বিরোধী  হতে থাকেন। তবে এর সবটাই চলছিল গোপনে। কারণ ১৯৭৬ সাল থেকে তিনি ইসরায়েলের ডিমোনা পারমাণবিক স্থাপনায় টেকনেশিয়ান হিসাবে কর্মরত ছিলেন। উচ্চ-বেতন আর পড়াশোনার সুযোগ-সুবিধার জন্যই মুলত এই পেশা বেছে নেন তিনি। ১৯৭৯ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং এ  ভর্তি হন নেগেভের বেন-গুরিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে।  এক সপ্তাহের মাথায় বিষয় পরিবর্তন করে আসেন অর্থনীতিতে। সেখানেই তার পরিচয় হয় কয়েকজন আরব শিক্ষার্থীর সাথে। এদের সাথে পরিচিত হয়ে তিনি প্রথমবার আরবদের সমস্যার কথা জানতে পারেন। যুক্ত হয়ে যান আরব অধিকার আন্দোলন কর্মীদের সাথে। ১৯৮০ সালে তিনি ইউরোপের বিভন্ন দেশে ভ্রমণ করেন। চেষ্টা করেন সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রবেশের। দেশে ফিরেই এর জন্য ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের জেরার মুখে পড়েন।  কিন্তু পুর্বে এ ধরনের কোনো রেকর্ড না থাকায় সে যাত্রায় তিনি বেচে যান।    

কিন্তু মোসাদ তার উপর নজর রাখা শুরু করে। তার সিকিউরিটি ফাইলে তাকে বামপন্থী ও আরব ঘেষা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ১৯৮৪ সালে ভুগোল ও দর্শনের উপর স্নাতক সম্পন্ন করেন মরদেচাই। সেই বছর থেকে তিনি ইসরাইলে পরমাণু কর্মসুচি ফাঁস করে দেবার ব্যাপারে পরিকল্পনা আটতে থাকেন।গোপনে বেশ কিছু পরমাণু স্থাপনার ছবি তুলে ফেলেন। তার তোলা ছবিগুলোই এখন পর্যন্ত পাওয়া ইসরায়েলের পরমাণু স্থাপনাগুলোর একমাত্র ছবি। ১৯৮৫ সালে চাকরি হারাবার পর ট্রেড ইউনিয়নের সহায়তায় তিনি চাকরি ফিরে পান। কিন্তু সেখানে আর থিতু হতে পারেননি। তিনি প্রথমে ইসরাইলি কমিউনিস্ট পার্টির সভাগুলোত অংশগ্রহণ করতে থাকেন। কিন্তু পার্টি সদস্যদের নির্জীব্তায় বিরক্ত হয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেন।  তিনি ১৯৮৬ সালের ১৯শে জানুয়ারি, ইসরায়েলের হাইফা থেকে গ্রীসের এথেন্সের উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু সেখানেও তার মন না বসার কারণে, প্রথমে থাইল্যাণ্ড, তারপর মায়ানমার এবং সেখান থেকে নেপাল ভ্রমণ করেন। নেপালে থাকা অবস্থায় তিনি আবারও সোভিয়েত দুতাবাসে যোগাযোগ করেন। কিন্তু সাড়া না পেয়ে আবার থাইল্যান্ডে ফিরে আসেন। সেখান থেকে অস্ট্রেলিয়া সিডনিতে আসেন। সেখানে একটি গ্রীক রেস্টুরেন্টে কাজ করা অবস্থায় খ্রিস্টান ধর্মে  দিক্ষিত হন। এরপর কিছুদিন ত্যাক্সি চালানোর কাজ করেন।  সেখানেই তার সাথে একদিন কলম্বিয়ান সাংবাদিক অস্কার  গুয়েরোরর সাথে পরিচিয় হয়। গুয়েরো তাকে তার প্রমাণগুলোর জন্য এক মিলিয়ন ডলার  অফার করেন। কিন্তু মরদেচাই প্রথমে নিউজউইক এবং পরে  ব্রিটিশ পত্রিকা সানডে টাইমসের সাথে যোগাযোগ করেন। সানডে টাইমসের সাংবাদিক পিটার হনাম প্রথমে মরদেচাইয়ের ঘটনা ভূয়া ভেবে উড়িয়ে দিতে চান। কিন্তু মার্কিন পরমাণু বিজ্ঞানী  থিওডোর টেইলর মরদেচাইয়ের দেয়া তথ্য প্রমাণের সত্যতা নিশ্চিত করেন। এছাড়া মরদেচাই যে ডিমোনার পরমাণু স্থাপনার শিফট ম্যানেজার ছিল সে বিষয়েও নিশ্চিত হয় সানডে টাইমস।  নড়েচড়ে বসে সানডে টাইমসের কর্তারা। তারা মরদেচাইকে গোপন স্থানে সরিয়ে ফেলে। কিন্তু বাঁধ সাধে মোসাদ। সেই কলম্বিয়ান সাংবাদিক ইসরাইলি দুতাবাসে গিয়ে মরদেচাই সম্পর্কে মোসাদকে জানিয়ে দেন। মোসাদ কর্মকর্তা আভি কিলম্যান প্রথমে গুরুত্ব না দিলেও  তিনি মরদেচাইয়ের নাম ও পাসপোর্ট নাম্বার লিখে রাখেন। শীঘ্রই মোরদেচাই পরিচয় নিশ্চিত হয়ে তার উপর নজর রাখা শুরু করে মোসাদ।  

এদিকে একাকী গোপন  আস্তানায় সময় কাটাতে কাটাতে বিরক্ত হয়তে পড়েন মোরদেচাই। তিনি জানতেন মোসাদ তার উপর নজর রাখছে। একদিন তিনি যখন শহরে হাটছিলেন তখন সিন্ডি নামে এক মার্কিন তরুণীর সাথে তার পরিচয় হয়। এই সিন্ডির প্ররোচনায় তিনি ইতালি ভ্রমণে রাজি হয়ে যান। রোমে পৌছে যখন তিনি হোটেলে উঠেন, তার কিছুক্ষণ পরই দরজায় নক শুনতে পান। তিনি যখন দরজা খুলতে যাবেন তখনই পেছন থেক সিন্ডি তাকে আঘাত করে মাটিতে ফেলে দেয় এবং লুকিয়ে থাকা মোসাদ এজেন্টরা তাকে অজ্ঞান করে বেঁধে ফেলে। মুলত সিন্ডির আসল নাম শেরিল বেনতভ। যে একজন মোসাদ এজেন্ট। যদিও পরবর্তীতে মরদেচাই তাকে সিআইএ এজেন্ট বলে দাবি করেন। মরদেচাইকে প্রথমে বোটে করে একটি ইসরাইলি জাহাজে তুলে দেয়া হয়। সেখানে তাকে মোসাদ দীর্ঘক্ষন জিজ্ঞাসাবাদ করে। জাহাজে করে তাকে ইসরাইলে নেয়ার পর ‘সিন বেথ’ সদস্যরা তাকে আরো তিনমাস জিজ্ঞাসবাদ করে। এদিকে মরদেচাই অপহৃত হবার পর সানডে টাইমস ইসরায়েলে পরমাণু কর্মসূচির কথা ফাঁস করে দেয়। সংবাদ মাধ্যমগুলো মরদেচাইয়ের  অপহরণের ব্যাপারে খোঁজ নেয়া শুরু করলে ইসরাইয়েল মরদচেয়াইয়ের আটকের কথা নিশ্চিত করে।

শুরু হয় তার গোপন বিচার। তাকে ট্রায়ালের নেয়ার সময় তিনি এক তার হাতে লিখে আনেন “ kidnapped from Rome 30/9/86” । সারা পৃথিবীর মিডিয়া তার অপহরণের কথা জানতে পারে। এরপর থেকে তাকে আর কথা বলতে দেয়া হয়নি। বিচারের সময় তার মুখ ঢেকে রাখা হত। তার আইনিজীবিদেরকেও নানাভাবে হেনস্থা করা হয়। তার জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড থাকলেও তাকে ১৮ বছরের জেল দেয়া হয়। তাকে এই ১৮ বছর সলিটারি কনফাইনমেন্টে আটকে রাখা হয়। প্রায় উন্মাদে পরিণত হওয়া মরদেচাইকে ২০০৪ এ মুক্তি দেয়া হয়। কিন্তু সাথে একগাদা শর্ত জুড়ে দেয়া হয়। যেমন তেলাবিবের বাইরে যেতে না পারা, আরব অধ্যুষিত স্থানে না যাওয়া, কোনো বিদেশীর সাথে কথা না বলা প্রভৃতি। কিন্তু একগুয়ে স্বভাবের মরদেচাই জেল থেকে বেরিয়েই নিজের ইসরাইলি নাগরিকত্ব  অস্বীকার করেন। হিব্রুতে কথা বলতেও তিনি অস্বীকৃতি জানান। এখনো তিনি একের পর এক নিয়ম ভেঙে নিয়মিত শাস্তির মুখে পড়েন। তার লক্ষ্য ইসরাইল ছেড়ে চলে যাওয়া।  ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে তিনি লিখেন,’ সুপ্রিম কোর্ট আমকে শিগ্রই জানবে আমি ইসরাইল ছাড়তে পারবো কি না? যাই হোক, গত ৩১ বছর ধরে আমি যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি। মুক্তি আসবেই।“ 

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also
Close
Back to top button