ইতিহাস

সিক্স আওয়ার্স ইন হেলঃবাস্তবের র‍্যামবোর গল্প

প্রচন্ড গতিতে জংগলের মধ্যে দিয়ে ছুটে যাচ্ছে এক গাট্টাগোট্টা যুবক। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা যেন ধুকপুক শব্দ করে প্রবল প্রতিবাদ করছে। তার আশেপাশে হিস হিস শব্দে একেকটা বুলেট আশেপাশের গাছগুলোকে  এফোঁড়ওফোঁড় করে দিচ্ছে। সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই।  একটু বাদেই সে তার আহত সঙ্গীদের কাছে পৌছে গেল। গোটা দলের মধ্যে একমাত্র দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটি একজন ক্যাপ্টেন। ১২ জনের কমান্ডো দলটার দলপতি। তার একচোখ শত্রুর ছোড়া গ্রেনেডের স্প্লিন্টারে কোটর ছেড়ে ঝুলে আছে।  বাকি এগারো জনের মধ্যে জীবিত মাত্র ৩ জন। এই ৫ জন মিলে মুহুর্তেই একটা ডিফেন্সিভ প্যারামিটার  গরে তুললেন। তাদের অপেক্ষা উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারের জন্য, কিন্তু বিধি বাম, হেলিকপ্টার আসা মাত্রই শত্রুর রকেট লাঞ্চারের গোলায় তা উড়ে গেল।

তাদের বাঁচার শেষ আশাটুকুও শেষ। মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছেন তারা!

সেনাদের উদ্ধারে আসা বেল ২১২ হেলিকপ্টার

ভিয়েতনামের জংগলে দৌড়াতে থাকা সেদিনের সেই যুবকের নাম রয় বেনভিদেজ। ৫ বছরের মধ্যে মা-বাবা হারানো অনাথ রয়ের ছিল প্রচন্ড জেদ। ছোট বেলা থেকেই একরোখা রয়ের খেলাধুলায় ছিল তীব্র আগ্রহ। দারিদ্র্যর জন্য স্কুলের গন্ডি পেরোতে পারেননি। ১৭ বছরে যোগ দেন মার্কিন সেনাবাহিনীতে। ১৯ বছরের মধ্যে এয়ারবোর্ন ট্রেনিং শেষ করে , যোগ দেন মার্কিন সেনার বিশেষ বাহিনী  ‘গ্রিন বেরেটস’ এ। ১৯৬৫ সালের ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় বিশেষ এক অপারেশনে তাকে পাঠানো হয় ভিয়েতনামে। তার কাজ উত্তর ভিয়েতনামী সেনার পোশাক পরে পুরো এলাকা রেকি করে আসা। কিন্তু রয়ের দুর্ভাগ্য, ল্যাণ্ড মাইনে পা দিয়ে ফেলেন তিনি। তাকে যখন  টহলরত মার্কিন সেনারা চিনতে পেরে হাসপাতালে নিয়ে যায়, ততক্ষণে তার শরীর থেকে চলে গেছে অনেক রক্ত। চিকিৎসক জানালেন রয় আর কোনোদিন হাটতে পারবেন না। রয়ের জন্য এ এক ভয়ানক দুঃসংবাদ। কিন্তু জেদি রয় দমে গেলেন না। প্রথমে তিনি হাপুড় কাটতেন, তারপর একদিন দাঁড়িয়ে গেলেন। আর একদিন চিকিৎসকদের ভুল প্রমাণ করে, তিনি দৌড়াতে লাগলেন।  আবার ফিরে গেলেন স্পেশাল ফোর্সে।

১৯৬৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামে পুরোপুরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। সে সেময় রয় ছিলেন মধ্য ভিয়েতনামে। একদিন তিনি বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এমন সময় ওয়্যারলেসে কিছু সেনার চিৎকার শুনলেন।

‘বাচাও আমদের ! ফর গডস সেক!’

পাশে থাকা রেডিও ম্যানকে জিজ্ঞেস করলেন,’ ওরা কারা?”

“ জানি না, কোনো কল সাইন বলে নি। কিন্তু ওদের মধ্যে সেই নিগ্রো ছেলেটা আছে, যে দু’দিন আগে তোমার জীবন বাঁচিয়েছিল।“ 

মাস্টার সার্জেন্ট রয় বেনভিদেজ

কি যেন একটু ভাবলেন রয়। তারপর এক দৌড়ে চলে গেলেন উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারে। সেই হেলিকপ্টারের মেশিন গানার এর মধ্যেই এক দফা উদ্ধার চেষ্টায় শত্রুর গুলিতে মারা গেছে। রয় নিজের রাইফেল ফেলে এসেছেন। অস্ত্র বলতে সাথে আছে একটা কমান্ডো নাইফ। আর একগাদা মেডিকেল সাপ্লাই।

সঙ্গীদের সাথে দাঁড়িয়ে হেলিকপ্টারের পুড়ে যাওয়া দেখলেন রয়। কিন্তু অত কিছু ভাববার সময় নেই। জীবিত আর আহতরা ইলে যতক্ষণ পারলেন শত্রুর গুলির জবাব দিলেন। এর মধ্যে কয়েকদফা বিমান হামলা চালিয়ে শত্রুদের পরাস্থ করার চেষ্টা করা হল। কিন্তু বিমান হামলা থেমে যেতেই ভিয়েতনামী সেনাদের একে-৪৭ গুলো গর্জে উঠলো।  যখন একবারেই উদ্ধারের আসা ছেড়ে দিচ্ছেন রয়  তখনই বেল-২১২ হেলিকপ্টারের পরিচিত আওয়াজ কানে ভেসে এল।  একে আহত সঙ্গীদের মাথায় তুলে নিয়ে হেলিকপ্টারে রাখতে লাগলেন রয় । এরমধ্যে দু’পায়ে ৩বার গুলিবিদ্ধ হয়েছেন রয়। কিন্তু পাশবিক শক্তি আর বুনো উদ্যমে তিনি একে একে ৫ জন সহযোদ্ধাকে হেলিকপ্টারে তুললেন। ভিয়েতনামী সেনারা বুঝতে পারছিল আমেরিকানরা পালিয়ে যাচ্ছে। তারা তাদের বৃত্ত ছোট করে আনলো।। এরই মধ্যে এক সহযোদ্ধাকে খুজতে গিয়ে ভিয়েতনামী সেনাদের সামনে পড়লেন রয়। শুরু হল হাতাহাতি যুদ্ধ। ছোরা হাতে ঝাপিয়ে পড়লেন রয়। শত্রুর বেয়নেট তার পেট চিরে দিল। আরেকটি বেয়নেট তার হাতে বিদ্ধ হল। মাথার পেছনে রাইফেলের বাটের বাড়ি খেলেন তিনি। কিন্তু সে অবস্থায় রয় ঘুরে দাড়ালেন। এক হাত দিয়েই ৩ ভিয়েতনামী সেনাকে ছুরি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করলেন তিনি। টলমল পায়ে যখন তিনি হেলিকপ্টারে উঠলেন তখন হাত দিয়ে পেটের বেরিয়ে আসা নাড়িভুঁড়ি চেপে ধরে আছেন।  হেলিকপ্টার মাটিতে নামা মাত্রই মার্কিন সেনারা বিস্ময়ে আবিষ্কার করলো রয় শুধু ৫ মার্কিন সেনাকেই উদ্ধার করেননি, গোয়েন্দা তথ্য নেবার জন্য ৩ জন আহত ভিয়েতনামী সেনাকেও তিনি নিয়ে এসেছেন। তার দেহে ৩টি গুলির পাশাপাশি ২৮টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। মৃত ভেবে তাকে যখন বডি ব্যাগে রাখা হচ্ছিল, তখন পরিচিত এক মার্কিন সেনা তাকে পরিক্ষার জন্য একজন  ডাক্তার  আসেন। ডাক্তার তাকে পরিক্ষা করে বলেন , রয় মৃত। তখনই আহত রয় কয়েকটা হেচকি দিয়ে, ডাক্তারের মুখে থুতু মেরে বললেন,’ আমি এখনো বেচে আছি ডাক্তার।“

প্রেসিডেন্ট রিগ্যানের থেকে পদক গ্রহণ করছেন রয়

যথারীতি রয় আবার সুস্থ হয়ে উঠেন এবং সেনাবাহিনীতে ফিরে আসেন। তাকে প্রাথমিকভাবে ডিস্টিংগুইস সার্ভিস অর্ডার পদক দেয়া হলেও পরবর্তীতে তিনি মার্কিন সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ পদক মেডেল অব অনারে ভূষিত হন। এছাড়া তিনি পার্পল হার্টস , মেরিটোরিয়াস সার্ভিস মেডেল, আর্মি এক্সপেডীশোনারি মেডেল  লাভ করেন। পরবর্তিতে মাস্টার সার্জেন্ট হিসাবে অবসরে যান। তার গল্প সিনেমার র‍্যাম্বোকেও হার মানায়। এ নিয়ে তার রচিত বই ‘সিক্স আওয়ার্স ইন হেল’ ব্যাপক সাড়া ফেলে। ১৯৯৮ সালের ২৯শে নভেম্বর ৬৩ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।  

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button