সংবাদসাম্প্রতিক

পশ্চিমবঙ্গ কাঁপানো কে এই আব্বাস সিদ্দিকী!

এই মুহুর্তে ব্যাপক আলোচিত একটি নাম পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী। পশ্চিম বাংলার রাজনীতিতে উল্কার বেগে আগমন ঘটেছে তার। ইতিমধ্যেই সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় জনপ্রিয়তার তুঙ্গে আব্বাস সিদ্দিকী। বিগত চার বছরে তার জনপ্রিয়তা রাজনৈতিক দল ও নেতাদের পেছনে ফেলে দিচ্ছে। যার প্রকাশ্য সভায় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত জমায়েত অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সমাবেশকে ও ছাড়িয়ে যায়। ধর্মগুরু থেকে রাজনীতির ময়দানে আসতে ব্যাপক পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাকে। হয়েছেন আলোচিত এবং সমালোচিত। 

কিন্তু কে এই আব্বাস সিদ্দিকী! 

আব্বাস সিদ্দিকী ফুরফুরা শরিফ দরবার পরিবারের একজন সদস্য এবং পীরবংশের সন্তান। তাঁর বাবার নাম পীরজাদা আলি আকবর সিদ্দিকী। আব্বাস সিদ্দিকীর বয়স ৩৩ বছর। ফুরফুরা শরিফের প্রথম পির আবু বকর সিদ্দিকী’র পরিবারের চতুর্থ প্রজন্মের প্রতিনিধি হলেন পিরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী।

ফুরফুরা শরিফের ছোট হুযুর পীর জুলফিকার আলির নাতি এবং ফুরফুরা শরিফের আরেক আলোচিত নাম পীরজাদা ত্বহা সিদ্দিকীর ভাইপো তিনি।

চিত্রঃ আব্বাস সিদ্দিকী 

আব্বাস সিদ্দিকীর শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেকেই। জানা যায়, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুরফুরা টাইটেল মাদ্রাসার স্টাডি সেন্টার থেকে থিওলজি বিষয়ে এম.এ পাশ করেছেন তিনি।

পড়াশোনা শেষ করেই ধর্মীয় সভায় বক্তব্য রাখতে শুরু করেন আব্বাস। এইসব বক্তব্যের মাধ্যমেই যুব সমাজের মধ্যে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন তিনি। খুব শীঘ্রই জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে যান এই ধর্মনেতা। তার ভক্তরা তাকে ‘ভাইজান’ নামে ডাকে।

কিন্তু তিনি লক্ষ্য করেন, ধর্মীয় সভায় যুব সমাজের পরিবর্তন ঘটাতে পারলেও, পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর মানুষেরা সরকারি সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্বাধীনতার পরেও, এই শ্রেণীর মানুষেরা আজও পরাধীনতার শেকলে বন্দী। তার বক্তব্যের মধ্যেই সাম্প্রতিক রাজনৈতিক খবরাখবর ও ব্যাখ্যার কথা তুলে ধরেন তিনি। একইসঙ্গে কীভাবে গরীবরা বঞ্চিত হচ্ছেন সেই বিষয় টা ও মানুষের নজরে নিয়ে আসেন।

তারপর থেকেই শুধু মুসলিম সমাজের জন্য নয়, দলিত, আদিবাসী সমাজের জন্যও কাজ শুরু করেন তিনি। মুসলিম যুব সমাজকে একসাথে করে সমাজের পিছিয়ে পড়া জাতির জন্য লড়াই শুরু করেন তিনি। 

২০১৬ সালে, ফুরফুরা শরিফ আহলে সুন্নাতুল জামাত নামে এক অরাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করে সামাজিক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী।

এর মধ্যে ২০১৯ সালে, জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বা সিএএ নিয়ে যখন দেশজুড়ে বিতর্ক শুরু হয় তখনই সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরোধিতা শোনা যায় সিদ্দিকী’র মুখে। জানা যায়, তখন থেকেই ঘনিষ্ঠ মহলে রাজনীতিতে আসার আগ্রহ প্রকাশ করেন এই ধর্মীয় নেতা।

আব্বাস সিদ্দিকী’র এই তুমুল জনপ্রিয়তা একদিনে তৈরি হয়নি। হয়নি সামান্য কোনো কারনে। গত কয়েক বছর ধরে সমাজের জন্য কিছু করার তাগিদে নিজ দায়িত্বে সমাজের বিভিন্ন স্তরে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। জানা যায়, ছোটো থেকেই অন্যের উপকারে নিজেকে নিয়োজিত করতেন তিনি। জাত ধর্ম বিচার না করে ছোটো বেলায় বন্ধুদের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন পীরবংশের এই নেতা। যেখানেই মানুষ অত্যাচারিত হন, তাঁর পাশে ছুটে যান। বিভিন্ন প্রকৃতিক বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসতে দেখা গেছে তাকে। বহু মানুষের পড়াশোনার দায়িত্বও নিয়েছেন পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী। কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে বহু যুবককে সৎ পথে ফিরিয়ে এনেছেন। এলাকায় এলাকায় ঘুরে গরিব পরিবারের যে সব পুরুষরা উপার্জিত অর্থ মদ্যপান করে ব্যয় করত, সেই পুরুষদের কাউন্সিলিং করে মূল পথে ফিরিয়ে এনেছেন। এই সবের মধ্য দিয়েই যুব সমাজ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। হু হু করে তার ভক্তের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে। 

এরপরেই মানুষের সহযোগিতা নিয়ে নলেজ সিটি তৈরির পরিকল্পনা করেন তিনি। প্রসঙ্গত ২০১৯ সালে, ফুরফুরা ‘নলেজ সিটি’র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তিনি। মহিলা পরিচালিত মাতৃসদন, সুপারস্পেশালিটি হাসপাতাল থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও মেডিকেল কলেজ তৈরি পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী। 

রাজনীতিতে আসার পর ভক্তের সঙ্গে অনেক শত্রু পক্ষ ও তৈরি হয়েছে তাঁর। কয়েকটি ঘটনাকে ঘিরেই সেটা পরিস্কার। গত বছর হাওড়ার জগৎবলপুরে তাঁর উপর হামলা হয়েছিল। তাঁকে মারার চেষ্টা হয়েছিল। এছাড়াও সম্প্রতি তাঁর ওপর হামলার ঘটনা ঘটলো দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ে। আব্বাস সিদ্দিকীর উপর হামলার ঘটনায় রাজ্যজুড়ে প্রতিবাদে ঝড় উঠেছে। তীব্র সমালোচনা হয়েছে শাসক দলের বিরুদ্ধে। জানা যায়, এই ঘটনার জন্য মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আঙ্গুল তুলেছে নাগরিক সমাজ।

কিন্তু কেনো তার উপর হামলা করা হচ্ছে জানতে চাইলে আব্বাস সিদ্দিকী বলেন, “এর পিছনে বড় রহস্য আছে। বর্তমান তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় এসেছিল সংখ্যালঘু তথা মুসলিম ভোটের জন্য। তারপরে ২০১৬-তে মুসলিম ভোট। ২০১৯-এ লোকসভা ভোটেও যে ২২টি আসন পেয়েছিল সংখ্যালঘু মুসলিম ভোটে ভর করেই। সেই মুসলিম ভোটটা এখন আমার দিকে। আমি ধর্মগুরু পরিবারের ছেলে হয়ে কখনও রাজনীতির কথা বলিনি। ২০১৯ -এ সিএবি বিল পাশ হওয়ার সময় দিদির ৮ জন সাংসদ যখন নাটক বা প্রতারণা করল, তখন বললাম আমি রাজনৈতিক দল করব। আমাকে যাঁরা ভালবাসে তারা আমাদের দিকে আসছে। তৃণমূল যে সংখ্যালঘু ভোট পেয়েছে তাতে ভাঁটা পড়ে যাবে…..।”

পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকীকে নিয়ে বির্তকও কম হয়নি এই কয়েক বছরে। তাঁর বিরুদ্ধে প্রচার রয়েছে, তিনি নাকি কোনও ধর্মীয় সভায় বলেছেন, ‘তিনি নুরের তৈরি। তাঁর নামে দরুদ পড়তে হবে।’ এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আব্বাস সিদ্দিকী বলেন, ‘আমি কখনও এমন কথা বলিনি। কোনও ধর্মীয় সভায় কিছু বলতে গিয়ে নুরের কথা বা দরুদ পড়ার কথা বলে থাকতে পারি। সেই কথা বিকৃতি করে আমাকে বির্তকে জড়ানো হয়েছে। এটা একটা চক্রান্ত করা হয়েছে আমার বিরুদ্ধে।’

এছাড়াও আরো কয়েকটি বিষয়ে অনেকেই আঙ্গুল তুলেছেন তার দিকে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি নাকি বিজেপির কাছে টাকা নিয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখছেন। তাঁর কাজকর্মে বিজেপির সুবিধা হচ্ছে। কিন্তু এটা সম্পূর্ণ ভুল অভিযোগ আখ্যা করে তিনি বলেন, ‘আমি সরকার পরিবর্তনের পক্ষে নয়। আমার দাবি পিছিয়ে পড়া সংখ্যালঘু, দলিত, আদিবাসীদের ন্যায্য অধিকার পাইয়ে দিতে হবে। কোনও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে সরকারে আসতে দেওয়া যাবে না। সেক্ষেত্রে যে দল সব থেকে বেশি ধর্মনিরপেক্ষ এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রে জাতিগত বিভেদ করবে না, তাদেরই সরকারে দেখতে চাই।’ 

প্রসঙ্গত গত ২১ জানুয়ারি ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট নামে আত্মপ্রকাশ করে আব্বাসের রাজনৈতিক দল। রাজ্যের সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌছে যান ‘ভাইজান’। এবারের ভোটে তারদলই ফ্যাক্টর হতে চলেছে বলে ঘোষণা করেন তিনি।

রাজনীতিতে তার লড়াই কার বিরুদ্ধে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ব্যক্তিগতভাবে কোনও দলের বিরুদ্ধে নয়। আমার লড়াই হচ্ছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ন্যায়ের পক্ষে। অসহায়দের পক্ষে, সে যে কোনও ধর্মেরই হোক না কেন। যে জুলুম করবে তার বিরুদ্ধে লড়ব। সে যদি মুসলিম হয় তা ও।”

জানা যায়, আব্বাসের প্রার্থী তালিকাতেও শুধু মুসলিম সমাজ নয়, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষ থাকতে চলেছে। বাংলার রাজনীতিতে নতুন শক্তি হিসেবে উঠে আসা আইএসএফ ও তার প্রতিষ্ঠাতা সকলের প্রিয় ‘ভাইজান’ কতটা সাফল্য পান, সেটা এখন দেখার অপেক্ষা। সেই জন্যে অপেক্ষা করতে হবে ২ মে পর্যন্ত।

প্রসঙ্গত, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু হতে যাচ্ছে আগামী ২৭ মার্চ। করোনা মহামারির কারণে এবার আট দফায় ভোটগ্রহণ চলবে। আগামী ২৯ এপ্রিল ভোটগ্রহণ শেষ হবে এবং ফল প্রকাশ করা হবে আগামী ২ মে, ২০২১ সালে।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button