জানা-অজানা

‘দক্ষিণের স্বর্গ’ নামে পরিচিত বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন’

অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত টেকনাফ উপজেলার একটি ইউনিয়ন। এটি বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ যা বাংলাদেশের মূল ভূখন্ডের সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত। 

এ দ্বীপের চতুর্দিকেই বঙ্গোপসাগর, তবে উত্তরে টেকনাফ উপজেলার মূল ভূখণ্ডের সাবরাং ইউনিয়ন এবং পূর্বে মায়ানমারের মূল ভূখণ্ডের রাখাইন প্রদেশ অবস্থিত।

চিত্রঃ সেন্টমার্টিন দ্বীপ এর মানচিত্র 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক শেখ বখতিয়ার উদ্দিন এর মতে, ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে এই দ্বীপটিকে যখন ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মার্টিনের নাম অনুসারে এই দ্বীপটির নামকরণ করা হয়েছে।

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা থেকে ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে গড়ে ওঠা ছোট দ্বীপ এটি। মিয়ানমারের উত্তর-পশ্চিম উপকূল থেকে ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে নাফ নদীর মুখে এর অবস্থান। প্রচুর নারিকেল পাওয়া যায় বলে স্থানীয়ভাবে একে ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’ ও (Narikel Jinjira) বলা হয়ে থাকে।

এছাড়াও এই দ্বীপ টি ‘ দারুচিনি দ্বীপ’ হিসেবেও পরিচিত। কথিত আছে, অনেক বছর আগে প্রতিকুল আবহাওয়ার মধ্যে এখানে দারুচিনি বোঝাই আরবের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ পানির নীচে থাকা একটি বিশাল পাথরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ভেঙ্গে পড়ে, যার ফলে জাহাজে থাকা দারুচিনি এই দ্বীপের সবখানে ছড়িয়ে যায় এবং পরবর্তীতে সেন্টমার্টিন দ্বীপের নাম হয়ে যায় ‘দারুচিনির দ্বীপ’।

সেন্টমার্টিন দ্বীপের আয়তন প্রায় ১৯৭৭ একর বা ৮ বর্গ কিলোমিটার। এটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। এ দ্বীপের তিন দিকে ভিত শিলা যা জোয়ারের সময় তলিয়ে যায় এবং ভাটার সময় জেগে ওঠে। 

এ দ্বীপটি উত্তর ও দক্ষিণে প্রায় ৫.৬৩ কি.মি. লম্বা। এই দ্বীপের প্রস্থ কোথাও ৭০০ মিটার আবার কোথাও ২০০ মিটার। 

দ্বীপটির পূর্ব, দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে সাগরের অনেক দূর পর্যন্ত অগণিত শিলাস্তূপ আছে। সেন্টমার্টিন দ্বীপ সমতল ও সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতা থেকে ৩.৬ মিটার ওপরে। মূল ভূখণ্ড ও দ্বীপের মধ্যবর্তী ৯.৬৬ কি.মি. প্রশস্ত প্রণালী দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমের উন্মুক্ত সাগরের তুলনায় অনেক অগভীর। এখানে পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিক জুড়ে রয়েছে ১০-১৫ কি.মি. প্রবাল প্রাচীর।

চিত্রঃ প্রবাল প্রাচীর, সেন্টমার্টিন

উত্তরাঞ্চলীয় অংশকে বলা হয় নারিকেল জিনজিরা বা উত্তর পাড়া। এই অংশ ২ হাজার ১৩৪ মিটার দীর্ঘ ও ১ হাজার ৪০২ মিটার প্রশস্ত। দক্ষিণাঞ্চলীয় অংশটি দক্ষিণ পাড়া হিসেবে পরিচিত। যা ১ হাজার ৯২৯ মিটার দীর্ঘ এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বিস্তৃত একটি সংকীর্ণ লেজের মতো এলাকা, যার সর্বোচ্চ প্রশস্ততা ৯৭৫ মিটার। একটি সংকীর্ণ কেন্দ্রীয় অঞ্চল বা মধ্য পাড়া দুটি অংশকে সংযুক্ত করেছে। বেল্ট বা ফিতার মতো এই অঞ্চলের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে ১ হাজার ৫২৪ মিটার ও ৫১৮ মিটার এবং সংকীর্ণতম অংশটি ‘গলাচিপা’ নামে পরিচিত।

মূল দ্বীপ ছাড়াও এখানে ১০০ থেকে ৫০০ বর্গমিটার আয়তন বিশিষ্ট কয়েকটি ক্ষুদ্র দ্বীপ রয়েছে, যেগুলোকে স্থানীয়ভাবে ‘ছেড়াদিয়া বা সিরাদিয়া (ছেঁড়া দ্বীপ)’ নামে অভিহিত করা হয়। যার অর্থ বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। ছেঁড়া দ্বীপ হলো বাংলাদেশের মানচিত্রে দক্ষিণের সর্বশেষ বিন্দু। দক্ষিণ দিকে এর পরে বাংলাদেশের আর কোনো ভূখণ্ড নেই। 

সেন্টমার্টিন দ্বীপটির ভূপ্রকৃতি প্রধানত সমতল। তবে কিছু কিছু বালিয়াড়ি দেখা যায়। দ্বীপ ও দ্বীপসংলগ্ন সমুদ্র মিলিয়ে উদ্ভিদ ও প্রাণীর সংখ্যাও প্রচুর।

২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের লোকসংখ্যা ৬,৭২৯ জন হলেও বর্তমানে এই দ্বীপের জনসংখ্যা ১২,০০০ ছাড়িয়ে গেছে।

সেন্টমার্টিন প্রবাল দ্বীপে প্রায় ৬৬ প্রজাতির প্রবাল, ১৮৭ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ১৫৩ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল, ১৫৭ প্রজাতির গুপ্তজীবী উদ্ভিদ, ২৪০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, ৪ প্রজাতির উভচর ও ১২০ প্রজাতির পাখি পাওয়া যায়। এছাড়াও রয়েছে ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী।

এই দ্বীপের অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেঃ- স্পঞ্জ, শিল কাঁকড়া, সন্ন্যাসী শিল কাঁকড়া, লবস্টার ইত্যাদি। সামুদ্রিক মাছের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেঃ পরী মাছ, সুঁই মাছ, উড়ুক্কু মাছ, প্রজাপতি মাছ, বোল করাল, রাঙ্গা কই, রূপচাঁদা, লাল মাছ ইত্যাদি। 

এছাড়াও অন্যান্য উদ্ভিদের মধ্যে কেয়া, শ্যাওড়া, সাগরলতা, বাইন গাছ, শিমুল, আম, সুপারি, বাবলা, কড়ই ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। 

সেন্টমার্টিন দ্বীপটি একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। বালি, পাথর, প্রবাল কিংবা জীব বৈচিত্র্যের সমন্বয়ে জ্ঞান আর ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে পরম আরাধ্য একটি স্থান এই দ্বীপ। প্রতি বছর হাজার হাজার দেশি ও বিদেশি পর্যটক চিত্তবিনোদন এর উদ্দেশ্য পাড়ি জমান এখানে।

বর্তমানে সেন্টমার্টিন দ্বীপে যাতায়াত ব্যবস্থা পূর্বের চাইতে কয়েক গুন সহজ হয়ে গিয়েছে। এখানে যোগাযোগের প্রধান পথ হল নৌপথ। টেকনাফ উপজেলার মূল ভূখণ্ড থেকে ট্রলার, স্পীড বোট, জাহাজ ইত্যাদি নৌযানের মাধ্যমে এ ইউনিয়নে যাওয়া যায়। 

থাকার জায়গার নিয়েও এখন আর চিন্তা করতে হয় না পর্যটকদের। চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে বেশ উন্নতমানের কয়েকটি হোটেল ও কটেজ গড়ে উঠেছে এখানে। এছাড়াও অনেক বাড়িতেই আছে পর্যটকদের জন্য থাকার ব্যবস্থা। এসবের বাইরে কেউ যদি তাঁবুতে থাকতে চায় সেটার ও সুব্যবস্থাও রয়েছে এখানে।

যদিও এখানে খাবারের দাম অনেক বেশি। পর্যটকদের খাবারের জন্য রয়েছে এখানে বেশ কিছু হোটেল ও রেস্তোরাঁ। সন্ধ্যা বেলা হোটেল-রেস্তোরাঁর সামনে পথের দু’ধারে, সৈকতের পাশে নানা রকম মাছ, কাঁকড়া, অক্টোপাস সাজিয়ে বসে দোকানিরা। রাতে প্রায় সব হোটেলের আঙিনায় চলে মাছের বার্বিকিউ উৎসব। যে যার পছন্দ মত খাবার বানিয়ে দিতে বললে বানিয়ে দেওয়া হয়।

এই দ্বীপের চারপায় সাগর আর আকাশের নীল মিলেমিশে একাকার হয়ে এর সৌন্দর্য কে কয়েক হাজার গুন বাড়িয়ে দিয়েছে। বলা হয়ে থাকে, প্রকৃতি দুই হাত ভরে সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে এখানে। ‘দক্ষিণের স্বর্গ’ নামে পরিচিত এই দ্বীপে সারি সারি নারিকেল গাছ, ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে চলা গাঙচিল। স্বচ্ছ সৈকতে স্বচ্ছ পানিতে পা ডুবিয়ে বসে স্নিগ্ধ বাতাসে গা জুড়িয়ে নেওয়া, কেয়া বন আর সাগরলতার মায়াময় স্নিগ্ধতায় মন জুড়িয়ে যায় নিমিষেই।

অনেকেই বলে থাকেন, একবার সেন্টমার্টিন ঘুরে আসলে বাঁচার ইচ্ছে বেড়ে যায়।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also
Close
Back to top button