জীবনীসংবাদ

অনুপম খেরঃ ৩০ টাকায় ক্যারিয়ার শুরু করে এখন শতকোটি টাকার মালিক

অনুপম খের, ভারতীয় একজন সফল এবং জনপ্রিয় অভিনেতা। একেবারেই নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা এই অভিনেতা নিজের পরিশ্রমে সফলতার শীর্ষে অবস্থান করছেন এখন। কমেডি, খল চরিত্র কিংবা বিত্তশালী বা রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। শুধু অভিনয় গুণেই আলোচনায় এসেছে বহুবার। কিন্তু তার জীবনের শুরুর পথ টা ছিলো বন্ধুর। 

গতকাল ৭ ই মার্চ, এই অসাধারণ গুনি শিল্পীর ৬৬ তম জন্মবার্ষিকী ছিলো। তাকে নিয়েই আজকের এই লিখা। 

                                                       চিত্রঃ অনুপম খের

১৯৫৫ সালের ৭ মার্চ, ভারতের শিমলায় একটি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন অনুপম খের। বাবা ছিলেন বন বিভাগের একজন কেরানি। শিমলায় ডি এ ভি স্কুলে পড়াশোনার মাধ্যমে শিক্ষাজীবন শুরু করলেও খুব বেশিদূর চালিয়ে যেতে পারেন নি। থাকার জায়গা এবং অর্থসংকট এর কারণে তার জীবনের শুরু টা হয়েছিলো খুব ই কঠিন ভাবে। 

সম্প্রতি নিজের ফেসবুকে পেইজ এ বলেন, ‘যে কখনো হাল ছাড়ে না তাকে হারানো কঠিন।’ আসলেই হাল ছাড়েন নি তিনি। এত কষ্টের মাঝে থেকেও চেষ্টা চালিয়ে গেছেন কাক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে। 

নিজের আত্মজীবনী তে ব্যক্তিগত জীবনের অনেক ঘটনা উল্লেখ করেছেন তিনি। তিনি লিখেন, “মঞ্চ আমার প্রথম প্রেম, খুব ভালোবাসতাম। সারাক্ষণ অভিনয়ের কথা ভাবতাম। একদিন চণ্ডীগড়ে একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়, সেখানে বলা ছিল বিজ্ঞাপনে অভিনয়ের জন্য লোক দরকার। কিন্তু হাতে টাকা নেই। মায়ের থেকে পিকনিকের কথা বলে ১০০ রুপি নিয়ে অডিশন দিতে গেলাম। পরে অবশ্য মা জানতে পেরেও কিছু বলেননি, তিনি মেনে নিয়েছিলেন।”

ছোটবেলা থেকে একজন বড় অভিনয় শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন অনুপম। সেই লক্ষ্য থেকেই ১৯৮১ সালে, চণ্ডীগড়ে একটি অভিনয় স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। সেখানে তিনি দুই বছর শিক্ষকতাও করেছিলেন। 

এ প্রসঙ্গে অনুপম খের লিখেন, ‘একদিন জানতে পারি, মুম্বাইয়ে একটি নাটকের স্কুল আছে। সেখানে আবেদন করলে আমাকে ডাকা হলো। দেওয়া হলো একটি ছোট্ট ঘর। কিন্তু কোনো টাকাপয়সা কিছুই দিল না। বেশির ভাগ দিন খিদে পেটে ঘুমাতে হতো। পকেটে টাকা থাকত না। এমনও হয়েছে, কখনো সাগরপাড়ের সৈকতে, স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ঘুমিয়ে কাটিয়েছি।’

ইনস্টাগ্রামে নিজের জীবন সংগ্রামের কথা তুলে ধরে তিনি লিখেছেন, ‘যখন খুব ছোট ছিলাম, দাদাকে জিজ্ঞাস করেছিলাম, আমরা এত গরিব। তবু কীভাবে এত সুখে আছি? তখন তিনি বলেছিলেন, “দারিদ্র্য আমাদের সবচেয়ে সস্তা বিলাসিতা।” আমার বাবা খুব আশাবাদী ছিলেন। পরীক্ষায় কখনো ৬০-এর মধ্যে ৫৯ পেলেও বাবা বলে গিয়েছেন, পরেরবার যেন আরও ভালো হয়। আর এটাই আমাকে অদম্য সাহস জোগায় জীবনের ব্যর্থতার সময়।’

সেই দিনগুলো অনেক কষ্টের মাঝে কাটিয়েছিলেন। একটা সময় বাড়ি ফিরতে চেয়ে চিঠি লিখলেও তার বড় ভাই অনুপ্রেরণা যোগায় তাকে। তার বড় ভাই তাকে চিঠি তে বলেন, অনুপম, তুমি তো সেই মানুষ, যে পানির স্রোতে বেরিয়ে গেছ, সে আবার বৃষ্টির পানিতে ভয় পাচ্ছ! তুমি এভাবে কোনো দিনই বড় হতে পারবে না।’ সংকল্পে অটুট হন অনুপম। সিদ্ধান্ত নেন, মুম্বাই থেকে ফিরবেন না।

১৯৮২ সালে, একদিন হঠাৎ ই মহেশ ভাটের একটি সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পান অনুপম। কিছু টাকা এবং থাকার জায়গা দুটোই মেলে সেখানে। কিন্তু হঠাৎ ই একদিন জানতে পারেন, ওই চরিত্রের জন্য অন্য কাউকে নেওয়া হয়েছে। মহেশ ভাট কে জিজ্ঞেস করলে ব্যাপার টা স্বীকার করেন তিনি। এ ঘটনার পর মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। 

এ প্রসঙ্গে তিনি লিখলেন, ‘আমি যেই মুহূর্তে মুম্বাই ছেড়ে বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, ঠিক সেই সময়ই মহেশ ভাট বলেন, “তোমার মতো এই চরিত্রে কেউ এত ভালো অভিনয় করতে পারবে না। তাই তোমাকে ছাড়া এই ছবি বানাব না।” আমাকে ডাকা হলো এবং আমি জীবনে প্রথম সিনেমায় অভিনয় করি মহেশ ভাটের হাত ধরে।’ 

১৯৮২ সালে, “আগ্‌মন” নামক এই সিনেমা টি দিয়েই বলিউডে পা রাখেন তিনি। 

পরবর্তী সময়ে রাজশ্রী প্রোডাকশনসের সঙ্গে বেশ কিছু কাজ করেন অনুপম। সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করে এই অভিনেতা লিখেছেন, ‘শেষ ৪০ বছরে আমি ওদের সঙ্গে ৪টি ব্লকব্লাস্টার ছবি করেছি। আমার প্রথম দিককার ছবি “সারাংশ” (১৯৮৪)। এরপর “হাম আপকে হ্যায় কৌন” (১৯৯৪), “বিবাহ” (২০০৬), “প্রেম রতন ধন পায়ো” (২০১৫)। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম, যখন রাজশ্রী প্রোডাকশনসের গুপ্তাজি ভালোবাসার প্রতীক ও স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে আমাকে ছবিটি পাঠিয়েছিলেন…!’

তিনি জানান, মাত্র ৩০ রুপি দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিলো তার। এখন তিনি কয়েক শ কোটি টাকার মালিক। ৪০ বছরের অভিনয় ক্যারিয়ারের এখন পর্যন্ত অভিনয় করেছেন ৫১৫ টির বেশি সিনেমায়। 

আজকের এই ক্যারিয়ার গড়তে অনেক উত্থান-পতনের স্বীকার হয়েছেন এই অভিনেতা। কিন্তু হাল ছাড়েন নি। আজও অভিনয় ছাড়া কিছুই ভাবতে পারেন না তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি জানান, ‘প্রতিদিন কাজে যাওয়ার সময়ে নিজেকে বলি অভিনয় সম্পর্কে কিছুই জানিনা। ‘ওটাই একমাত্র উপায়। যদি নিজের জ্ঞান নিয়ে বড়াই করা শুরু করি, তাহলে নতুন আর কিছু শিখতে পারব না।’।

এই ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘বেঁচে আছি, এটাই তো অনেক বড় কথা। আমি মনে করি, মানুষ চাইলে অনেক কিছু করতে পারে। আমরা আমাদের মস্তিষ্কের মাত্র ১০ বা ২০ শতাংশ বা তার চেয়েও কম কাজে লাগাই। আপনার যদি ব্যর্থ হওয়ার ভয় না থাকে এবং সব সময় আশাবাদী হন, তাহলে আপনি অনেক কিছু করতে পারবেন। আমি তো অনেক কিছু করতে ভালোবাসি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব নেওয়ারও ব্যাপার থাকে।’

জীবন এবং অভিনয় জগতে অনেক গুলো বছর পাড়ি দিলেও মনের দিক দিয়ে এখনো তরুন এই অভিনেতা। বয়স টা তার মন কে ছুঁতে পারে নি। নিয়মিত শরীরচর্চা করেন তিনি। ফিটনেসের জন্যে আলাদা করে আলোচনায় এসেছেন বহুবার। সামাজিক যোগাযোগ  মাধ্যমে অনুপম খেরের জিমের ছবি, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার অ্যাকাউন্টে  বিভিন্ন ছবি, ভিডিও পোস্ট করেন নিয়মিত। এই বয়সেও তার জৌলুশ অবস্থা দেখে তাক লেগে যেতে হয়। 

                                   চিত্রঃ জিমনেসিয়াম এ অনুপম খের 

১৯৮৫ সালে, অণুপম খের তার চেয়ে কনিষ্ঠ অভিনেত্রী কিরণ খেরকে বিয়ে করেন।

                                     চিত্রঃ স্ত্রী কিরণ খের এর সাথে অনুপম খের

তার অভিনয়কৃত সিনেমার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে; কুছ কুছ হোতা হ্যায়; মোহাব্বতে; ওম জাই জাগদিশ; ব্রাইড এন্ড প্রিজুডিস; প্রাণায়াম; হাম; লামহে; শোলে অর শবনম; কাহো না… পেয়ার হে; জোডি নাম্বার ওয়ান; জাব তাক হে জান; প্রেম রতন ধন পায়ো সহ আরো অসংখ্য সিনেমার মাধ্যমে প্রশংসা কুড়িয়ে মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছেন এই অভিনেতা।

                             চিত্রঃ দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে সিনেমার একটি দৃশ্য

তিনি ভারতের সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশনের ও ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা পদে চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। ২০০৪ সালে, ভারত সরকার ভারতীয় সিনেমা/চলচ্চিত্রে অবদান রাখার জন্য তাকে পদ্মা শ্রী উপাধিতে সম্মানিত করেন। অণুপম খের কমেডি চরিত্রে সেরা কলাকার হিসেবে পাঁচবার ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার লাভ করেন।

এছাড়াও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার; সেরা অভিনেতা, সেরা সহ-অভিনেতা, সেরা কমেডিয়ান ; সেরা কলাকার ক্রিটিক্স ক্যাটেগরি পুরস্কার সহ অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেন এই সফল অভিনেতা। এছাড়াও তাকে ‘ওয়াক অব দ্য স্টারস্‌’ কর্তৃক সম্মাননা প্রদান করা হয়। তার হাতের ছাপ মুম্বাইয়ের বান্দ্রা বাসস্ট্যান্ডে পোষ্টেরিটির জন্য সংরক্ষিত রাখা আছে।

সর্বশেষ অনুপমকে দেখা গেছে ‘দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’ সিনেমায়। এখন মুক্তির অপেক্ষায় ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ সিনেমা টি।

কিন্তু তিনি অভিনয় জগতে এমন কিছু কাজ করে গেছেন যেগুলো তাকে মানুষের স্মৃতি তে ধরে রাখবে আজীবন।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button