ইতিহাস

যেভাবে মোসাদের হাতে খুন হন ইসলামিক জিহাদের প্রতিষ্ঠাতা

২৬শে, অক্টোবর ১৯৯৫,

মাল্টার সাগর তীরের বিখ্যাত ডিপ্লোমেট হোটেলের রাস্তা ধরে হেটে আসছেন মধ্যবয়সী এক ব্যাক্তি । তার হাতে একটা সুটকেস। সৈকতের বাতাসের ঝাপটায়  তিনি মাথা নিচু করে হেটে যাচ্ছেন। হোটেলে প্রায় পৌছে গেছেন তিনি। এমন সময় সামনে একটা বাইক এসে থামলো। বাইক থেকে দু’জন যুবক এসে নামলো। যুবক দু’জন বেশ শক্তসামর্থ্য।  চেহারায় একটা কাঠিন্য আছে।  তারা লোকটার সামনে এসে পথ আগলে দাড়াল। তাদের একজন তাকে জিজ্ঞাস করলো, “আপনি কি ফাতিহ শাকিকি?”

ভদ্রলোক মৃদু হেসে বললেন,” না, আমার নাম ডাঃইব্রাহিম আল শাউইস।“  

যুবকরা একে অপরের দিকে তাকালো। তাদের একজন একটা ডেজার্ট ঈগল পিস্তল বের করলো। পিস্তলের সাথে একটা ব্রাস-ক্যাচার যুক্ত ছিল, যাতে খালি গুলির কার্তিজ ঘটনাস্থলে না থাকে। সে প্রথমে তার পেট লক্ষ্য করে একটা গুলি করে। লোকটা পেট চেপে মাটিতে পড়ে যায়। ব্যাথা আর বিস্ময় ভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে। তারপর একে আরো ৫টি গুলি তার মাথা ঘাড় এফোঁড়ওফোঁড় করে দেয়। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া মাত্রই যুবক দু’জন বাইকে করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। মাল্টা পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে নিয়ে যায়। তিন দিনবাদে তার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয় তার, মারা যাওয়া ব্যক্তিটির নাম ফাতিহ শাকিকি। ফিলিস্তিনি সংগঠন ইসলামিক জিহাদের প্রতিষ্ঠাতা। ইজরায়েলের মোস্ট ওয়ান্টেড মানুষগুলোর একজন।  

ফাতিহ শাকাকি

ফাতিহ শাকিকিকে দীর্ঘদীন ধরে খুজছিল মোসাদ। এর কারণ তার সংগঠন ইসলামিক জিহাদ একের পর এক হামলায় ইজরায়েলকে ব্যতিব্যস্ত রাখছিল। একজন শরণার্থী হিসাবে জন্ম নেওয়া শাকিকি, ছোটবেলা থেকে তার জাতির মুক্তির কথা ভাবতেন। মিসরে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার সময় থেকেই তিনি আর তার সহমত পোষণকারী ফিলিস্তিনি যুবকদের নিয়ে তিনি মুক্তির পথ খুজতে থাকেন।  তিনি মুসলিম ব্রাদারহুড প্রতিষ্ঠাতা হাসান আল বান্নার মতাদর্শে বিশ্বাস করতে থাকেন । আর স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এমন একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করতে চান। যা ইজরায়েলকে রাজনৈতিক, সামরিক আর সাংস্কৃতিকভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে। তিনি বলতেন, আরবের সেকুলার সরকারগুলোর মধ্যমে কখনই স্বাধীন ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তিনি ইরানে আয়াতুল্লাহ খোমেনির ইসলামিক বিপ্লব দেখে উৎসাহিত হন। আর এ বিষয়ে খোমেনির প্রশংসা করে একটি বই লিখেন। যা মিসরে মাত্র দুইদিনেই ১০,০০০ কপি বিক্রি হয়ে যায়। ফলে মিসর সরকার তাকে গ্রেফতার করে।  

ইসলামিক জিহাদের সশস্ত্র সদস্য

১৯৭১ সাল থেকেই একদল শিক্ষিত যুবকদের নিয়ে তিনি একটি গোপন সংগঠন দাঁড় করান। যারা ইজরায়েলের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালাত। ১৯৮৪ সালে ইজরায়েল সরকার তাকে গ্রেফতার করে। জেলে থাকতেই তিনি হিব্রু ভাষা শিখে ফেলেন। তিনি অনর্গল বিশুদ্ধ ইংরেজি বলতে পারতেন আর টানা শেকসপিয়ার, এলিয়ট, দান্তের কবিতা বলে যেতে পারতেন।  সাংবাদিক রবার্ট ফ্রিস্ককে তিনি বলেছিলেন,” রাজনীতিবিদ হবার আগে আমি একজন মানুষ আর তার আগে আমি একজন কবি।“   ১৯৮৮ সালে তাকে ইজরায়েল মুক্তি দিলে তিনি তেহরানে গিয়ে খোমেনির সাথে দেখা করেন। তিনি লেবানিজ সংগঠন হিজবুল্লাহর সাথে ভাল সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ১৯৯০ সালে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হাফিজ আল আসাদ তাকে সিরিয়ায় থাকার ব্যবস্থা করে দেন।  ১৯৯৪ সালে তার নেতৃত্বেই ইসলামিক জিহাদ, হামাস আর পিএলওর ৮টি সংগঠন অসলো চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়।

শাকিকি ১৯৯৫ সালের অক্টোবর মাসে লিবিয়ান পাসপোর্ট নিয়ে মুয়াম্মর গাদ্দাফির সাথে দেখা করতে যান। তিনি তার কাছে তার সঙ্গঠনের জন্য আর্থিক সাহায্য চান।  ধারণা করা হয়, তখন লিবিয়া আর ইসলামিক জিহাদের মধ্যে সম্পর্কে টানাপোড়ন চলছিল আর গাদ্দাফিই ইজরায়েলিদেরকে শাকিকির ব্যাপারে তথ্য দিয়েছিলেন। শাকিকিকে ইজরায়েলিরা দামেস্কে মারার ঝুকি নিতে চায়নি। শাকিকিতে তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা আগেই মাল্টায় মোসাদের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছিলেন । কিন্ত অনেকটা বাধ্য হয়েই তিনি লিবিয়া যান। তিনি যেদিন লিবিয়া থেকে মাল্টা ফেরত আসেন। সেদিনই মাল্টায় এথেন্স থেকে আসা বিমানে গিল আর রান নামে দুই মোসাদ এজেন্ট নামে। তারা মোসাদের কুখ্যাত হিট স্কোয়াড ‘কিডন’ গ্রুপের সদস্য।  সেখানে নামার পর এক স্থানীয় এজেন্ট তাদের থাকার ব্যবস্থা করে। স্থানীয় অপারেটিভদের মোসাদ বলতো ‘সায়ান’। আরেকজন স্থানীয় এজন্ট তাদের জন্য একটি বাইক চুরি করে দেয়, যা হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত হয়।  ইজরায়েলের হাইফা বন্দর থেকেই দুইদিন আগেই একটি জাহাজ মাল্টার বন্দরে যন্ত্রপাতি বিকল হবার অজুহাতে অপেক্ষা করছিল। ধারণা করা হয় মোসাদের ডিরেক্টর জেনারেল সাবিতাঈ শাভিত সেই জাহাজে করে রেডিওর মাধ্যমে পুরো অপারেশন নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন।  

শাকিকি মারা যাওয়ার ধাক্কা ইসলামিক জিহাদ কখনোই সামলে উঠতে পারেনি। ইজরায়েল সাথে সাথেই এ ঘটনার সায় অস্বীকার করে। তার জানাজা সিরিয়ার রাজধানী দামস্কে অনুশঠিত হয়। যেখানে প্রায় ৪০,০০ মানুষ অংশগ্রহণ করে। ফিলিস্তিনের বিভিন্ন রাস্তায় এখনো তার গ্রাফিতি পাওয়া যায়।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button