জানা-অজানাপ্রযুক্তি

ইন্টারনেটের অদৃশ্য জগত: ডার্ক ওয়েব

অন্ধকার অন্তর্জাল, ডার্ক ওয়েব-বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট দুনিয়ায় খুব পরিচিত ও আলোচিত একটি শব্দ। ইন্টারনেটে দৃশ্যমান কনটেন্ট এবং তথ্যের ভান্ডারকে বলা হয় সারফেস ওয়েব। আর সারফেস ওয়েব হল ইন্টারনেটের মোট তথ্যের মাত্র ১০ শতাংশ। তাহলে বাকীটা? বাকী ৯০ শতাংশই রয়ে গেছে অন্ধকারে। আজ জানবো সেই “রহস্যময় ডার্ক ওয়েব” অর্থাৎ রহস্যময় ইন্টারনেট জগৎ সম্পর্কে কিছু কথা।

সারফেস ওয়েব থেকে সম্পূর্ণ ভাবে বিচ্ছিন্ন একটি নেটওয়ার্ক; যা অনেক ভয়ংকর তার নাম হল ডার্ক ওয়েব। সহজ সরল কোন লগ-ইন সাইন আপ সিস্টেমে এর ভেতর ঢোকা যাবে না। এতে ঢোকার জন্য লাগে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সফটওয়্যার আর এখানে কেউ কারও তথ্য জানতে পারে না। কেউ কোন তথ্য চুরি করতেও পারে না। এটি সার্চ ইঞ্জিন থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন। সার্চ ইঞ্জিনগুলো তাদের সার্চ তদারকি করে এক ধরনের ভার্চুয়াল রোবট তথা Crawler দিয়ে। এই Crawler গুলো ওয়েবসাইটের HTML tag দেখে ওয়েবসাইটগুলোকে লিপিবদ্ধ করে। এখন যে সমস্ত সাইটের ক্ষেত্রে এডমিন চান না যে তাদের সাইটটি সার্চ ইঞ্জিন খুঁজে পাক, তারা Robot Exclusion Protocol ব্যবহার করেন যা Crawler গুলোকে সাইটগুলো খুঁজে পাওয়া বা লিপিবদ্ধ করা থেকে বিরত রাখে। 

এসব সাইটে ঢোকার জন্য রয়েছে একটি বিশেষ ব্রাউজার, যার নাম হল Tor। আপনার প্রচলিত ওয়েব ব্রাউজার দিয়ে এই সমস্ত সাইটে ঢুকতে পারবেন না। এরা ইন্টারনেটের সমস্ত প্রথার বাইরে অবস্থান করে, গ্রাহ্য করে না কোন নিয়ম-কানুন। আর এদের ঠিকানাও থাকে এতটাই অদ্ভুত যে সাধারণ মানুষের পক্ষে এগুলো মনে রাখা ভীষণ কঠিন। এই অংশটিই ইন্টারনেটের প্রকৃত অদৃশ্য অংশ। বিশেষ কিছু জ্ঞান না থাকলে আপনি এই নেটওর্য়াকে প্রবেশ করতে পারবেন না। এই অংশের আরেকটি বিশেষত্ব হল এরা ওর্য়াল্ড ওয়াইড ওয়েবের সাইটগুলোর মত টপ লেভেল ডোমেইন ব্যবহার না করে “Pseudo Top Level Domain” ব্যবহার করে যা কিনা মূল ওর্য়াল্ড ওয়াইড ওয়েবে না থেকে দ্বিতীয় আরেকটি নেটওর্য়াকের অধীনে থাকে। এ ধরণের ডোমেইনের ভেতর আছে Bitnet, Onion, Freenet ইত্যাদি।

ডার্ক ওয়েব -এ ব্যবহৃত নেটওর্য়াকের মধ্যে সারফেস ওয়েবে বেশ জনপ্রিয় হয়ে পড়েছে এমন এক নেটওর্য়াক হল অনিয়ন নেটওর্য়াক। অনিয়ন মূলত মার্কিন নেভির জন্য তৈরী করা হলেও এই নেটওর্য়াক আজ বিশ্বব্যাপী ছদ্মবেশী নেট ব্যবহারকারীদের প্রথম পছন্দ। অনিয়নে সাধারণ কোন ব্রাউজার দিয়ে ঢোকা যায় না। এজন্য ব্যবহার করতে হবে টর ব্রাউজার। টর ব্রাউজার ব্যবহারকারীর পরিচয় লুকিয়ে ফেলে আর এর ফলে কারো পক্ষে ব্যবহারকারীর অবস্থান শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কেউ যখন টর দিয়ে কোন সাইটে ঢুকতে যাবে তখন টর ব্রাউজার তার এই রিকোয়েস্ট কঠিন এনক্রিপশনের মধ্য দিয়ে অনিয়ন প্রক্সিতে পাঠাবে। অনিয়ন প্রক্সিতে পাঠানো সেই ডেটা আর ডেটা থাকে না, সেটি দুর্বোধ্য এক স্ক্রিপ্টে পরিণত হয়। অনিয়ন রাউটারে প্রবেশের আগে অনিয়ন নেটওয়ার্কের প্রবেশপথে এই ডেটা আবার এনক্রিপশনের ভেতর দিয়ে যায়। নেটওর্য়াক থেকে বের হওয়ার সময় আরো একবার এনক্রিপশনের ভেতর দিয়ে যায়। পথিমধ্যে অনিয়নের বেশ কিছু রাউটারের ভেতর দিয়ে এনক্রিপশন হয় যেখানে এক এক রাউটারে এনক্রিপশন আউটপুট এক এক রকম এবং কোন রাউটারই জানে না যে ডেটা কোন রাউটার থেকে আসছে। সবশেষে ডেটা যখন প্রাপকের হাতে গিয়ে পৌঁছায় তা তখন ডিএনক্রিপশন প্রসেসের মাধ্যমে আদি অবস্থানে ফিরে আসে। এই রকম অনেকগুলো লেয়ার বা খোসা থাকার কারণেই এই নেটওর্য়াকের নাম অনিয়ন নেটওর্য়াক। এখন এই ডেটা চালাচালির সময় কেউ যদি এই ডেটা চুরি করতে সক্ষমও হয় তার পক্ষে এটা বের করা সম্ভব হবে না যে এটার প্রেরক কে বা প্রাপকইবা কে। এই ধরণের দুর্বোধ্য সিস্টেমের কারণেই এই সমস্ত নেটওর্য়াক সব সময়ই আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। 

ইন্টারনেটের এই দুনিয়াটা সবচেয়ে আলাদা, অন্ধকারাচ্ছন্ন। যা কখনো কেউ কল্পনা করেনি তাই পাওয়া যাবে এখানে। উইকিলিকস ঘোষণা করল- এ বছর তারা আরো নতুন কিছু ডেটা প্রকাশ করবে, কিন্তু এখানে ঢুকে হয়তো দেখা যাবে উইকিলিকস -এর এই সমস্ত কথিত নতুন ডেটা এই ডার্ক ওয়েবে আছে বেশ ক’বছর আগে থেকেই। যেকোন বইয়ের একদম লেটেস্ট এডিশন যা কিনা সারফেস ওয়েবে কপিরাইট ল’এর কারণে নেই তা এখানে দেদারসে আদান প্রদান হচ্ছে। আরো আছে বিকৃত রুচির বিনোদন। শিশু পর্ণোগ্রাফি থেকে শুরু করে নানা ধরনের ভিডিও যা কিনা সারফেস ওয়েবে নেই, তা এখানকার হট টপিকস। এমন কিছু সাইট আছে যেখানে মারিজুয়ানা, হেরোইন থেকে শুরু করে সব ধরণের মাদক হোম ডেলিভারী দেয়া হয়। আবার কিছু সাইট আছে যেখানে কট্টরপন্থী গ্রুপগুলো শিক্ষা দিচ্ছে কীভাবে গোলা বারুদ বানাতে হয়, কিছু সাইটেতো রেডিমেড অস্ত্রই বিক্রি হয়। একে ৪৭ থেকে শুরু করে রকেট লাঞ্চার, মর্টারের মত অস্ত্রও কিনতে পাওয়া যায়। আরব-বসন্তের সময় বিপ্লবকারীরা এই ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমেই যোগাযোগ করত।

ডার্ক ওয়েবে নানা ধরণের মেইল সার্ভিস, চ্যাট সার্ভিস আছে যেখানে পরিচয় গোপন রেখে অনেক কিছুই করা যায়। অস্ত্র পাচার, ভাড়াটে হত্যাকারী, পতিতা, সন্ত্রাসবাদ ইত্যাদি সব এই ডার্ক ওয়েবকে সব চেয়ে বড় ব্ল্যাক মার্কেটে পরিণত করেছে। এসব অনিয়ন নেটওর্য়াকে থাকা ব্ল্যাক মার্কেটগুলোর ভেতর সবচেয়ে জনপ্রিয় হল সিল্ক রোড। ফোর্বসের হিসেবে এখানে গত বছর ২২ মিলিয়ন ডলারের বেচা-কেনা হয়েছিল। সালফিউরিক অ্যাসিড, তরল পারদ, চোরাই ক্রেডিট কার্ড, চেক, নকল বিল, কয়েন, পাথর জাতীয় জুয়েলারি, চুরির স্বর্ণ এধরণের সব কিছুর জন্যই আলাদা আলাদা বিভাগ আছে। ডার্ক ওয়েব এর সর্বাধিক লেনদেন সাধারণত বিটকয়েন এর মাধ্যমে সঞ্চালিত হয়ে থাকে। ১ বিটকয়েন হল ১১০০  মার্কিন ডলার মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ বাংলাদেশে ৮৮,৫৮৮ টাকার সমান । বিটকয়েন নামক এই ডিজিটাল মুদ্রা দিয়ে সব কেনা যায়। সারফেস ওয়েবে যেসব হ্যাকিং টেকনিক দেখতে পান তা হল এই ডার্ক ওয়েব থেকে লীক হওয়া ১% তথ্যের অংশ বিশেষ।

শেষ কথা এটি এমনই এক অন্ধকার জগত যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ ফেলার আগে অন্ততঃ দু’বার ভেবে নিতে হবে। এক জরীপ থেকে জানা যায়  দৃশ্যমান ওয়েবে যে পরিমাণ ডেটা সংরক্ষিত আছে তার চেয়ে ৫০০ গুণ বেশী ডেটা সংরক্ষিত আছে অদৃশ্য এই ওয়েবে। প্রকৃতপক্ষে এই অদৃশ্য ওয়েব হল মহাসাগর পরিমাণ আর আমাদের ব্যবহার করা সচরাচর দৃশ্যমান ইন্টারনেটের ডেটা হল অসীম মহাসাগরের বুকে ভেসে থাকা এক টুকরো বরফের মত।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button