জীবনীসাম্প্রতিক

এইচ টি ইমাম এর জীবনী

এইচ টি ইমাম নামে বহুল পরিচিত হোসেন তৌফিক ইমাম, বাংলাদেশের একজন সফল রাজনীতিবিদ এবং একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্ব পালন করা এইচ টি ইমাম ২০১৪ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক পরিচিত এই ব্যক্তি একজন সুবক্তা ও সুলেখক হিসেবেও সবার কাছেই অত্যধিক পরিচিত। 

জন্ম এবং শিক্ষাজীবন 

এইচ টি ইমামের পূর্ণ নাম হোসেন তৌফিক ইমাম। ১৯৩৭ সালের ১৫ জানুয়ারি, টাঙ্গাইল শহরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পিতার নাম তাফসির উদ্দীন আহমেদ এবং মাতা মরহুম তাহসিন খাতুন।

পিতার চাকুরি সূত্রে শৈশবে রাজশাহীতে বসবাস করতেন তিনি। সেখানেই প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন তিনি। পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া ও কলকাতায় পড়ালেখা করেছেন তিনি।

১৯৫২ সালে, ঢাকা কলেজিয়েট হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৫৪ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন তিনি। পরবর্তীতে রাজশাহী কলেজে অনার্স এ ভর্তি হন তিনি। সেখান থেকেই ১৯৫৬ সালে, অর্থনীতিতে অনার্স সহ বি.এ. ডিগ্রী অর্জন করেন তিনি। সেই বছরেই এমএ ডিগ্রি লাভের উদ্দেশ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি। এ সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৫৮ সালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এম.এ. ডিগ্রী নিয়ে বের হন তিনি।

১৯৬৮ সালে, তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স থেকে ‘উন্নয়ন প্রশাসনে’ পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা করেন। সেই সাথে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন এর সমাপ্তি ঘটে তার।

কর্মজীবন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে এম. এ. পাস করার পর রাজশাহী সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন হোসেন তৌফিক ইমাম। সেই সাথেই পাকিস্তানে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেন তিনি। ১৯৬১ ব্যাচের সিএসপিদের মধ্যে তিনি ৪র্থ স্থান লাভ করেন এবং পাকিস্তান সরকারের উচ্চ পদে যোগদান করেন। ১৯৬২-’৬৩ সালে রাজশাহী জেলার অ্যাসিসটেন্ট কমিশনার হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন তিনি।

পরবর্তীতে ১৯৬৩-১৯৬৪ সালে, পদোন্নতি লাভের মাধ্যমে নওগাঁ মহকুমায় মহকুমা প্রশাসক বা এসডিও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৬৪ সালে, নওগাঁ থেকে বদলি হয়ে নারায়ণগঞ্জের এসডিও দায়িত্বগ্রহণ করেন তিনি।

১৯৬৫ সালে, ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে নিযুক্তি লাভ করেন তিনি।

১৯৬৫-’৬৭ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র মন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিনের একান্ত সচিব হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন তিনি। 

পরবর্তীতে ১৯৬৮-’৬৯ সালে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান সরকারের অর্থবিভাগের উপসচিব পদে দায়িত্ব পালন করেন।

এছাড়াও চাকুরিজীবনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সড়ক ও সড়ক পরিবহণ বিভাগের সচিব, প্ল্যানিং ডিভিশনের সচিব, প্ল্যানিং কমিশনের সদস্য, পিএটিসি-র প্রকল্প পরিচালক এবং যমুনা বহুমুখী সেতু কর্তৃপক্ষের কার্যনির্বাহী পরিচালক পদের দায়িত্ব পালন করেন। 

১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তিনি অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম ক্যাবিনেট সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ এর পর তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে ক্যাবিনেট সচিবের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। ১৯৭৫-এর ২৬ আগস্ট পর্যন্ত এই পদে নিয়োজিত ছিলেন তিনি। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত, সাভারস্থ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬ পর্যন্ত, তিনি সড়ক এবং যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব-এর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৭ পর্যন্ত পরিকল্পনা সচিবের পদে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৬-’৯৭ সালে অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানও ছিলেন।

রাজনৈতিক জীবন 

১৯৫২ সাল থেকেই, পূর্বপাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন এবং প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট হন তিনি। ১৯৫২-’৫৪ শিক্ষাবর্ষে পাবনা কলেজে থাকাকালীন পাবনা কলেজ ছাত্র-সংসদের সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি।

পরবর্তীতে ১৯৫৪-’৫৬ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী সরকারি কলেজ ছাত্র-সংসদে সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৬-’৫৭ সালে বিনা-প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়নের (ডাকসু-র) কমনরুম সেক্রেটারি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

৬০-এর দশকে সরকারের উচ্চপদে অধিষ্ঠিত থাকায় তার চোখে পাকিস্তান মুসলিম লীগ ও সামরিক প্রশাসকদের শোষণ, বৈষম্য, বঞ্চনার রূপ প্রকট হয়ে ওঠে। পূর্ববাংলার রাজনৈতিক অবস্থা প্রত্যক্ষ করে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন তিনি।

হোসেন তৌফিক ইমাম ২০০৯ থেকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগদান করলেও ২০১৪ সালে, তাকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

মৃত্যুর আগে অব্দি তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও দলীয় নির্বাচনি পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। এছাড়াও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর প্রচার ও প্রকাশনা উপ-কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও কর্মরত ছিলেন তিনি।

১৯৭১’র মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা

১৯৭১ এর মার্চ, রাঙ্গামাটি জেলার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এর দায়িত্বে ছিলেন এইচ টি ইমাম। আমলা হয়েও পাকিস্তানের আনুগত্য ত্যাগ করে প্রবাসী সরকারের অধীনে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

ভয়াল পঁচিশে মার্চ রাতের সংবাদ পাওয়ার আগেই দেশের সংকটজনক পরিস্থিতির কর্মপন্থা নির্ধারণ করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ, বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংকট মোকাবিলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন জুন মাসে, পূর্বাঞ্চলের আঞ্চলিক প্রশাসনের পদে থেকে মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিক পদে যোগদান করেন তিনি।

১৯৭৫ সালের ২৬ আগষ্ট পর্যন্ত, তিনি এই পদে কর্মরত ছিলেন। এই দায়িত্বে সাড়ে চার বছরে তিনি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকারের নতুন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, কর্পোরেশন ইত্যাদির রূপরেখা তৈরি ছাড়াও পাকিস্তান আমলের পুরাতন নিয়ম-কানুন ও পদ্ধতির ব্যাপক সংস্কার ঘটান।

প্রকাশিত গ্রন্থ

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু থেকে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ অবধি বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমের বিশদ বিবরণ নিয়ে অনেক গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন তিনি। এর মধ্যে অন্যতম হলোঃ- বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১; বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১-৭৫; স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধু প্রাসঙ্গিক ভাবনা ইত্যাদি। 

মৃত্যু

২০২১ সালের ৪ মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। প্রসঙ্গত কিডনি এবং বার্ধক্যজনিত জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল তাকে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৮৬ বছর। 

তথ্যসূত্রঃ 

১. উইকিপিডিয়া 

২. যুগান্তর

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button