ইতিহাস

সুলতান মাহমুদের সোমনাথ মন্দির অভিযান কি শুধু অর্থের জন্যই ছিল?

সোমনাথ মন্দির। বর্তমান ভারতের গুজরাটের সৌরাষ্ট্রে অবস্থিত একটি বহুল পরিচিত শিব মন্দির। ভারতের সর্বপ্রাচীন মন্দিরগুলোর মধ্যে অন্যতম এ মন্দিরটি সর্বকালেই ভারতীয় হিন্দু সমাজের কাছে পরম শ্রদ্ধেয়। একে হিন্দু দেবতা শিবের দ্বাদশ লিঙ্গের পবিত্রতম বলে ভাবা হয়ে থাকে। পোরাণিক ইতিহাস মন্ডিত এ মন্দির প্রাচীন কালেও পরম পূজনীয় ছিল এবং যার অর্থ ভান্ডারও ছিলো ঈর্ষনীয়।

অপরদিকে সুলতাম মাহমুদ গজনবী। বিশ্ব ইতিহাসে অন্যতম এক অপরাজেয় বীর। ভারত বর্ষে যিনি বহুবার আক্রমণের পরেও পরাজয়ের মুখ একবারো দেখেননি।

সে সুলতান মাহমুদই ১০২৬ সনে হিন্দুদের কাছে পরম পূজনীয় এ মন্দিরে হামলা করে বসেন এবং তৎকালীন বিশ্বাস মতে অপরাজেয় এ মন্দিরকেও জয় করেন।

সুলতান মাহমুদ ভারতের যে সকল অভিযানের জন্য বিখ্যাত এবং একইসাথে বিতর্কিত তার মাঝে অন্যতম এ সোমনাথ মন্দির অভিযান। সুলতানের সোমনাথ মন্দির অভিযানের সময় সমগ্র ভারতের সকল রাজপুতেরা সেখানে একত্রিত হয় এবং একইসাথে তারা তাদের সমগ্র সম্পত্তি এ যুদ্ধে উৎসর্গ করে। প্রাণান্তকর যুদ্ধ করেও তারা সুলতান মাহমুদের অসামান্য রণ কৌশলের সামনে নতি শিকার করতে বাধ্য হয়, বিজিত হয় সোমনাথ মন্দির।

বর্তমান কালের সুশীল সমাজ নানা ভাবে এটা প্রমাণ করতে তৎপর হয়ে উঠেছে সুলতান মাহমুদ শুধুমাত্র অর্থের লোভেই সোমনাথ মন্দির জয় করেছিলেন । তাদের এ সকল মনগড়া উক্তি ধোপে ঠিক কতটুকু টিকে তা আসলেই প্রশ্নের দাবি রাখে।

বিপক্ষ যুক্তিধারী মানুষরা বলেন, সুলতান হিন্দু বিদ্বেষী ছিলেন, অর্থ লোলুপ ছিলেন ।

এক্ষেত্রে প্রশ্ন আসে, সুলতান মাহমুদ গজনি হতে খায়বার গিরিপথ হয়ে এতটা বিশাল পথ পাড়ি দিয়ে পথিমধ্যে কোন মন্দির ধবংস না করে শুধুমাত্র সোমনাথ মন্দিরেই কেন অভিযান চালালেন? সুলতান মাহমুদ সোমনাথ অভিযানের পূর্বে আরো পনের বার ভারত অভিযান করেছেন। এতবার ভারত অভিযানের সময়কালে পথিমধ্যে থাকা হাজারো মন্দির কেন সুলতান ধবংস করলেন না? এছাড়াও এ জাতীয় বহু প্রশ্ন, যা ইতিহাসবিদরা করে থাকেন বিশ্লেষণ করলেই বুঝা যায় সুলতান মাহমুদের সোমনাথ অভিযানের কারণ শুধু অর্থ ছিলো না।

সোমনাথ মন্দির কে তৎকালীন হিন্দু পুরোহিত সহ বরেন্য সমাজের মানুষরা অপরাজেয় ভাবত এবং তৎকালীন ভারতীয় সমাজে এক অপরাজেয় ত্রাস হিসেবে পরিচিত সুলতান মাহমুদকে লক্ষ্য করে অনেকটা চ্যালেঞ্জের সুরেই জানাত সুলতান মাহমুদ দ্বারাও এ মন্দির জয় করা সম্ভব নয়।

এছাড়াও সোমনাথ মন্দিরের তৎকালে প্রথা ছিল কুমারী নারী ধর্ষণ করে তাকে বলি দেওয়া। সকল কিছু ঠিকঠাকই যাচ্ছিল কিন্তু হিন্দুরা একবার যখন কোন এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম কুমারী কে ধরে এনে ধর্ষণ করে এর বলি দেয় তখনই মূলত সুলতান মাহমুদ প্রতিশোধের জন্য এ মন্দির জয়ের প্রতিজ্ঞা করেন।

ইতিহাসবিদরা সুলতান মাহমুদের সোমনাথ বিজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে যেটিকে দেখান সেটি হল হিন্দুদের অন্ধ গোড়া বিশ্বাসকে ভেঙে দেওয়া। প্রথমত তারা বিশ্বাস করত এ স্থান অপরাজেয় দ্বিতীয়ত সোমনাথ মন্দিরের মূল মূর্তিটি প্রায়ই শূন্যে ঝুলে থাকতে দেখা যেত যেটিকে তারা ঐশ্বরিক বলে প্রচার করত। তৌহিদে বিশ্বাসী সুলতান মাহমুদ এর কাছে তা অবিশ্বাস্য মনে হত।

অভিযান শুরুর আগে সুলতান মাহমুদ গজনি থেকে প্রকৌশলি ও ধাতুবিদ সাথে করে নিয়ে আসেন। সোমনাথ বিজয়ের পর তারা পরীক্ষা করে দেখেন সোমনাথের মূর্তিটি লোহার তৈরি এবং মন্দিরটির চারপাশের দেয়ালে চৌম্বক লাগানো রয়েছে। সুলতানের আদেশে চারপাশের দেয়াল হতে চৌম্বক খুলে নেয়া হলে মূর্তিটি তৎক্ষনাৎ মাটিতে পড়ে যায়। যাতে প্রমানিত হয় শূন্যে ঝুলে থাকার জন্য মূর্তিটির নিজস্ব কোন ক্ষমতা ছিল না। এভাবেই সুলতান তাদের গোড়া হিন্দু ধারণাকে চূর্ণ করে দেন।

সুলতান মাহমুদকে হিন্দু ধর্ম বিদ্বেষী বলা মানুষরা এ সত্য কখনো তুলে ধরেন নি সোমনাথ অভিযানে থাকা তার বারোজন কমান্ডারের মাঝে দু’জন কমান্ডার হিন্দু ছিলো। এবং যার বাহিনীর বিশাল একটি অংশ হিন্দু ছিলো।

সুলতান মাহমুদকে অর্থলোভী প্রমাণ করতে চাওয়া ঐতিহাসিকরা এটাও স্পষ্ট করে যাননি সুলতান মাহমুদ কেন এতবার ভারত অভিযানে তার বিজিত বিস্তৃত অঞ্চলে থাকা সহস্র মন্দিরে থাকা কোটি টাকার স্বর্ণ লুট করেন নি।

এসকল কিছু সাধারণ প্রশ্নের উত্তর খোজা শুরু করলে সহজেই বুঝা যায় সুলতান মাহমুদের সোমনাথ বিজয় ছিল কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যকে আঞ্জাম দেয়ার উপলক্ষ্য মাত্র যেটি মোটেই শুধুমাত্র অর্থে সীমাবদ্ধ ছিল না।

মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ খাঁন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

আরো পড়ুন;

বাংলাদেশ সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের জীবনীঃ- https://cutt.ly/IlFHam1

ভুলে যাওয়া আমেরিকান মুসলিমদের ইতিহাসঃ-https://cutt.ly/Gk70CYo

Show More

MK Muhib

A researcher,An analyst,A writer,A social media activist,student at University of dhaka.

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button