ইতিহাস

ইতিহাস ও ঐতিহ্যে শরীয়তপুর জেলা

শরীয়তপুর জেলা বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলের ঢাকা বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। এই জেলার উত্তরে মুন্সীগঞ্জ জেলা, দক্ষিণে বরিশাল জেলা, পুর্বে চাঁদপুর জেলা এবং পশ্চিমে মাদারীপুর জেলা অবস্থিত। শরীয়তপুর জেলার মোট আয়তন ১,৩৬৩.৭৬ বর্গ কি.মি.।

                          চিত্রঃ বাংলাদেশের মানচিত্রে শরীয়তপুর জেলা

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, এই জেলার মোট জনসংখ্যা ১১,৫৫,৮২৪ জন।

প্রশাসনিক পটভূমি 

প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন সামন্ত প্রভু ও রাজা দ্বারা এ অঞ্চল শাসিত হয়ে এসেছিলো। তখন শরীয়তপুরের এ অঞ্চল পদ্মা নদীর দক্ষিণে বদ্বীপ অঞ্চলে বিস্তৃত তৎকালীন ‘বঙ্গ’ রাজ্যের অধীনে ছিল। এটি তৎকালীন ভাগীরথী এবং পুরাতন ব্রক্ষ্মপুত্র নদীর দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে বিস্তৃত অঞ্চল। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের (৩৮০ খৃঃ – ৪১২ খৃঃ) রাজত্বকালে প্রখ্যাত কবি কালিদাসের ‘রঘুবানসা’ গ্রন্থে তিনি এ অঞ্চলকে গঙ্গানদীর প্রবাহের দ্বীপ দেশ বলে আখ্যায়িত করেন। যার অধিবাসীগণ জীবনের সকল কর্মকাণ্ডে নৌকা ব্যবহার করতো। এমনকি যুদ্ধেও নৌকার ব্যবহার ছিলো। পরবর্তীতে বদ্বীপ অঞ্চল ক্রমে ক্রমে দক্ষিণে সরে যায় এবং ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা ও অন্যান্য নদী বাহিত পলি দ্বারা এ অঞ্চল গঠিত হয়।

               চিত্রঃ তৎকালীন বঙ্গ রাজ্য

প্রখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ ৬৩০ হতে ৬৪৩ সালের মাঝে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল সফর করেন যখন হর্ষবর্ধন ছিলেন ভারতের ক্ষমতার শীর্ষে। ঐ সময় তাঁর লেখাতেও জানা যায় যে, সপ্তম শতকের মাঝামাঝি সময় এ ‘বঙ্গ’ হর্ষবর্ধনের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

বর্তমানে মুন্সিগঞ্জের রামপাল অঞ্চল হতে আবিষ্কৃত তাম্র ফলকের খোদাইকৃত বক্তব্য হতে জানা যায় যে, দশম শতাব্দী হতে একাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এ অঞ্চল ‘চন্দ্রা’ নামক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী শাসকগণ দ্বারা পরিচালিত এবং শাসিত হয়েছিল।

১০৮০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১১৫০ খ্রিস্টাব্দ সময়কাল ঢাকার বিক্রমপুর হতে ‘বর্মন’ নামক হিন্দু পরিবার এ অঞ্চলকে শাসন করেন।

১৭৬৫ সালে, পলাশীর যুদ্ধে লর্ড ক্লাইভ সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করার পর এ জেলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সৃষ্ট প্রশাসনের আওতায় নিয়ে আসা হয়। শরীয়তপুর সহ ফরিদপুরের দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে ঢাকা নিয়াবত গঠন করা হয়। 

শরীয়তপুর জেলা পূর্বে বৃহত্তর বিক্রমপুর এর অংশ ছিল। ১৮৬৯ সালে, প্রশাসনের সুবিধার্থে এই অঞ্চল কে বাকেরগঞ্জ জেলার অংশ করা হয়। পরবর্তীতে জনগণের আন্দোলনের মুখে ১৮৭৩ সালে, এ অঞ্চলকে মাদারীপুর মহকুমার অন্তর্গত করে ফরিদপুর জেলার অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। 

১৯৪৭ সালের ১৪ ই আগস্ট হতে ১৯৭১ সালের ১৫ই ডিসেম্বর পর্যন্ত শরীয়তপুর জেলা সহ এ প্রদেশ ছিল পাকিস্তানেরই একটি অংশ।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে জেলাটি ফরিদপুরের মাদারীপুর মহকুমার অন্তর্ভূক্ত ছিল।

১৯৮৪ সালের ১ মার্চ, প্রশাসন শরিয়তপুর জেলা গঠিত হয়। ইতিহাস সমৃদ্ধ বিক্রমপুরের দক্ষিণাঞ্চল এবং প্রাচীন বরিশালের ইদিলপুর পরগণার কিছু অংশ নিয়ে বর্তমান শরীয়তপুর জেলা গঠিত। জেলা হিসেবে ১৯৮৪ সালে আত্মপ্রকাশ করলেও এ অঞ্চলটি সৃষ্টির প্রথম হতেই বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় সকল ব্যাপারেই বিকশিত হতে থাকে। ১৯৯০ সালে, শরিয়তপুর পৌরসভা গঠিত হয়।

বর্তমানে শরীয়তপুর জেলা ৬ টি উপজেলা, ৭ টি থানা, ৫টি মিউনিসিপ্যালিটি, ৬৪টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৫টি ওয়ার্ড, ৯৩টি মহল্লা, ১২৩০টি গ্রাম এবং ৬০৭টি মৌজা নিয়ে গঠিত।

নামকরণের ইতিহাস 

বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক, বৃটিশ বিরোধী তথা ফরায়েজী আন্দোলনের নেতা হাজী শরীয়ত উল্লাহর নামানুসারে এই জেলার নামকরণ করা হয় শরীয়তপুর। 

চিত্তাকর্ষক স্থান ও পর্যটন আকর্ষণ

শরীয়তপুর জেলার চিত্তাকর্ষক স্থান ও স্থাপনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ- কার্তিকপুর জমিদার বাড়ি; বুড়ির হাট ঐতিহ্যবাহী মসজিদ; রুদ্রকর মঠ; ফতেহজংপুর দুর্গ; জেড এইচ সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়; রামসাধুর আশ্রম; মনসা মন্দির; বাহাদুর খলিলুর রহমান সিকদারের বাসস্থান; মানসিংহের বাড়ী; ধানুকার মনসা বাড়ি; মহিষারের দিগম্বরী দীঘি; মডার্ন ফ্যান্টাসি কিংডম ইত্যাদি। 

                                                         চিত্রঃ বুড়ির হাট মসজিদ

                                                  চিত্রঃ কার্তিকপুর জমিদার বাড়ি

                                          চিত্রঃ মডার্ন ফ্যান্টাসি কিংডম

                                              চিত্রঃ ফতেহজংপুর দুর্গ

নদনদী 

শরীয়তপুর জেলার উল্লেখযোগ্য নদী হচ্ছে পদ্মা, মেঘনা, পালং ও কীর্তিনাশা নদী।

উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব

শরীয়তপুর জেলার কৃতি ব্যক্তিদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেনঃ- বার ভুঁইয়ার ও বিক্রমপুর পরগনার জমিদার কেদার রায়; গীতিকার অতুলপ্রসাদ সেন; আয়ুর্বেদ শাস্ত্র বিশারদ এবং শিক্ষাবিদ যোগেশচন্দ্র ঘোষ; ফুটবলার গোষ্ঠ পাল; কবি ও সাহিত্যিক আবু ইসহাক; মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক কর্নেল (অবঃ) এ. শওকত আলী; বিপ্লবী নেতা নগেন্দ্রশেখর চক্রবর্তী; রাজা রাজবল্লভ সেন; বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হক সরদার এবং ক্রিকেটার আমিনুল ইসলাম বিপ্লব প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। 

তথ্যসূত্রঃ 

১. বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন 

২. বাংলাপিডিয়া 

৩. বৃহত্তর ফরিদপুর চাকরিজীবী কল্যাণ সমিতি, ঢাকা

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button