ইতিহাসজানা-অজানা

রাজপ্রাসাদের শহর কলকাতার ইতিহাস

কলকাতা ভারতের অন্যতম প্রাচীন একটি শহর এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী। কলকাতা পূর্ব ভারতের প্রধান বানিজ্যিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাকেন্দ্র। জনসংখ্যার বিচারে এই শহর টি ভারতের ৩য় বৃহত্তম শহর। কলকাতা শহরটি হুগলি নদীর পূর্ব পাড়ে অবস্থিত। এটি অন্য তিন দিক থেকে অখন্ড চব্বিশ পরগণা জেলা দ্বারা বেষ্টিত। কলকাতা মহানগরীর মোট আয়তন ১,৮৮৬.৬৭ বর্গকি.মি.।

চিত্রঃ  মানচিত্র

১৯শ শতাব্দী ও ২০শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে, বাংলার নবজাগরণের কেন্দ্রস্থল ছিল কলকাতা। অভিজাত ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের জন্য কলকাতাকে ‘প্রাসাদ নগরী’ ও বলা হত।

২০১১ সালের জনগণনা অনুসারে, কলকাতার জনসংখ্যা ৪,৪৯৬,৬৯৪ জন। অন্যদিকে বৃহত্তর কলকাতার জনসংখ্যা ১৪,১১২,৫৩৬ জন।

প্রশাসনিক পটভূমি 

বিশ্বের সব থেকে পুরনো শহরের মধ্যে অন্যতম একটি শহর কলকাতা। এটি এমন একটা শহর যার প্রতি অলিতে-গলিতে লুকিয়ে আছে ইতিহাস। এই ইতিহাসে রয়েছে হাজারো রোমাঞ্চকর গল্প। 

১৭৭২ থেকে ১৯১১, এই দীর্ঘসময় ধরে কলকাতা ছিল বিশাল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। যতদূর জানা যায়, বাংলার ধনী সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার বর্তমান কলকাতার বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে জমিদারি পরিচালনা করত।

গবেষকদের মতে, ৩০০ বছরেরও বেশি পুরনো এই কলকাতা। শিবনাথ শাস্ত্রী’র ‘রামতনু লাহিড়ী এবং তৎকালীন বঙ্গসমাজ’ বইতে আছে, কলকাতা শহরের গোড়াপত্তন হয় ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দে। জব চার্নক গোবিন্দপুর, সুতানুটি ও কলকাতাকে কেন্দ্র করে কলকাতা নগরীর পত্তন করেছিলেন। তাই লিখিত ইতিহাস মতে, ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দ কে ই আধুনিক কলকাতার জন্ম সাল বলা হয়ে থাকে।

চিত্রঃ ১৭০০ শতাব্দীর কলকাতা 

সুতানুটি ছিল সে সময়ে ঐ অঞ্চলের সুতা এবং বোনা কাপড়ের একটি বাণিজ্য কেন্দ্র। প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য চালিয়ে প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে যে, এই অঞ্চলটি বিগত দুই হাজার বছরেরও বেশি সময়কাল ধরে জনবসতিপূর্ণ। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের একাধিক গ্রন্থে হুগলি নদীর তীরবর্তী কলিকাতা গ্রামের উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৭শ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত, এই গ্রামগুলির শাসনকর্তা ছিলেন মুঘল সম্রাটের অধীনস্থ বাংলার নবাবেরা।

১৬৯৩ খ্রিস্টাব্দে, মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত চার্ণক তাঁর সময়ে খড় তালপাতার অল্প কয়েকটি স্থাপনা নির্মাণ ছাড়া আর কিছু করে যেতে পারেন নি। গভর্নর হিসেবে ফ্রান্সিস এলিস তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। এলিসের পরে আসেন চার্লস আইয়ার।

কিন্তু ১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দের ১০ নভেম্বর, পূর্ববর্তী জমিদার স্বর্ণ চৌধুরী পরিবারকে মাত্র ১,৩০০ টাকা প্রদান করে ব্রিটিশ কোম্পানি এ ক্ষুদ্র গ্রাম তিনটির নতুন জমিদারে পরিণত হয়। ১৭০০ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে, এখানে দুর্গ নির্মাণ করেন ইংরেজরা। মূলত তখন থেকেই নগরায়ন শুরু হয়। এর মধ্যে অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়েছে। 

১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে, নবাব সিরাজদ্দৌলা কলকাতা জয় করেছিলেন। কিন্তু পরের বছরই কোম্পানি আবার শহরটি দখল করে নেয়।

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে, নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ও নিহত হওয়ার পর মুর্শিদাবাদ থেকে সবকিছু গঠনমূলকভাবে প্রবাহিত হয় কলকাতার দিকে। এত অবিশ্বাস্য ভাবে নগরায়ন হতে থাকে যে, সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম নগরীতে পরিণত হয়। ফলাফলস্বরূপ ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে, মুর্শিদাবাদ শহর থেকে স্থানান্তরিত হয়ে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানীর গৌরব লাভ করে কলকাতা। সেইসাথে বিশ্বের অন্যতম বন্দর হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

চিত্রঃ ব্রিটিশ আমলের কলকাতা 

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে কলকাতা শহর দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। শহরের দক্ষিণে যে অংশে ব্রিটিশরা বাস করতেন সেটিকে বলা হত হোয়াইট টাউন এবং উত্তরে যে অংশে ভারতীয়েরা বাস করত সেটিকে বলা হত ব্ল্যাক টাউন।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার নবজাগরণ নামে পরিচিত যে যুগান্তকারী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্কার আন্দোলন বাঙালি সমাজের চিন্তাধারা ও রুচির আমূল পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল তার পটভূমিও ছিল এই কলকাতা শহর।

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে, বাংলা বিভক্ত হয়। কিন্তু তা আন্দোলনের মুখে রদ হয় ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে। ইতিহাস ঘেটে দেখা যায়, তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে লন্ডনের পরই কলকাতা দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী হিসেবে বিবেচিত হতো। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে, দিল্লীতে রাজধানী স্থানান্তর করা হয়। তখন শুধু অবিভক্ত বাংলার রাজধানী হিসেবে কলকাতা সচল থাকে। তখনও কলকাতার বিস্তৃতি ও বিভিন্ন রকম উন্নতি ক্রমবর্ধমান গতিতে এগিয়ে যেতে থাকে।

১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে, মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্টের অধীনে কলকাতা পৌরসংস্থা স্থাপিত হয় ।

১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে, ভারত স্বাধীনতা অর্জন করলে ব্রিটিশ বাংলা প্রেসিডেন্সির হিন্দুপ্রধান পশ্চিমাঞ্চল পশ্চিমবঙ্গ নামে ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়। তখন কলকাতা এই রাজ্যের রাজধানীর মর্যাদা পায়। পরবর্তীতে রেল যোগাযোগ প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে আধুনিক কলকাতার সূত্রপাত ঘটে।

নামকরণের ইতিহাস 

কলকাতা নামকরণের সঠিক ইতিহাস নিয়ে নানা মতভেদ রয়েছে। যদিও এটা সত্যি যে, কলকাতা নামটি এসেছে “কলিকাতা” নাম থেকে। 

মুঘল যুগের বিভিন্ন তথ্য ও পঞ্চদশ শতকের বিখ্যাত কবি বিপ্রদাস এর লেখায় স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় যে, কলকাতার প্রাচীন নাম ছিল কলিকাতা। কলকাতা শহরের নাম কিভাবে তা নিয়ে নানা মতবাদ রয়েছে। তার মধ্যে যেটি সর্বজনগ্রাহ্য তাতে বলা হয় হিন্দু দেবী কালীর নাম থেকে কলিকাতা নামটি উদ্ভব। যার প্রকৃত নাম ছিল ‘কালী ক্ষেত্র’ অর্থাৎ দেবী কালীর স্থান তারপর ক্রমে ‘কলিকাতা’ নামটি আসে।

আবার কেউ কেউ মনে করেন, কলিকাতা নামটি ‘খাল ও কাটা’ অর্থাৎ ‘খনন করা’ শব্দ দুটি থেকে উৎপন্ন হয়ে থাকতে পারে।

অনেকের মতে, বাংলা শব্দ ‘কিলকিলা’ (অর্থাৎ চ্যাপ্টা ভূখন্ড) কথাটি থেকে কলিকাতা নামের উৎপত্তি। যদিও ব্যুৎপত্তি গত ভাবে কলিকাতার সঙ্গে এর কোনো মিল নেই।

আবার অনেকের মতে, এই অঞ্চলে কলিচুন ও দাতা বা নারকেলের ছোবড়া প্রচুর উৎপাদিত হতো । সে জন্যেই এই শহরের নাম হয়েছে কলিকাতা । 

এই ক্ষেত্রে আরও কয়েকটি মতামত জনপ্রিয়। যেমন কেউ কেউ বলেন, এই শহরের জনবসতি গড়ে উঠেছিল খালের ধারে তা থেকে নামটি এসেছে আবার আরো একটি ধারনা প্রচলিত রয়েছে যেখানে বলা হয় ব্রিটিশরা যখন এই শহরে এসেছিলেন তখন তারা গোলায় নর কঙ্কাল এর মালা দেওয়া দেবীকে দেখেন সেই থেকে পরে কলিকাতা নামটি আসে।

কলকাতা নাম প্রসঙ্গে ইতিহাস ঘেটে যতটুকু জানা যায়, শিবের তান্ডব নৃত্যকালে সতীর দেহের একটি অংশ কালীঘাটে পড়েছিল। কালীঘাট মন্দিরটির নামানুসারেই কলকাতার নামকরণ করা হয়েছে। এই যুক্তি টি অনেকের কাছেই বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। 

বাংলায় কলিকাতা বা কলকাতা নামটি প্রচলিত হলেও ইংরেজি ভাষায় এই শহর আগে ক্যালকাটা (ইংরেজি: Calcutta) নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে ২০০১ সালে, বাংলা নামটির উচ্চারণের সঙ্গে সমতা রেখে ইংরেজিতেও শহরের নাম কলকাতা (ইংরেজি: Kolkata) রাখা হয়।

দর্শনীয় স্থান

‘প্রাসাদ নগর’ কলকাতার স্থাপত্যিক সম্পদ ঘরোয়া এবং পাবলিক উভয় রকমই ছিল। এছাড়াও বহু দৃষ্টিনন্দন জায়গা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এই কলকাতায়। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলোঃ- কফি হাউস; প্রিন্সেপ ঘাট; কালীঘাট; ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল; বোটানিক্যাল গার্ডেন; অ্যাকোয়াটিকা; সায়েন্স সিটি; রবীন্দ্র ভারতি মিউজিয়াম; আলিপুর চিড়িয়াখানা; জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি; নন্দন; দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির; হাওড়া ব্রীজ; বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়াম; সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল; ইকো পার্ক; নিকো পার্ক; ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গ; ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম; ন্যাশনাল লাইব্রেরি; কলেজস্ট্রিট; মাদার্স ওয়াক্স মিউজিয়াম; ভাসমান বাজার; স্নো পার্ক; বোটানিক্যাল গার্ডেন সহ অসংখ্য নয়নাভিরাম স্থান।

চিত্রঃ ন্যাশনাল লাইব্রেরী 

চিত্রঃ জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি

চিত্রঃ সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল

বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; অক্ষয়কুমার বড়াল; সত্যেন্দ্রনাথ বসু; সত্যজিৎ রায়; স্বামী অখণ্ডানন্দ এর মতো বিখ্যাত পন্ডিত ব্যক্তির জন্মস্থান এই কলকাতা।

তথ্যসূত্রঃ 

১. বাংলাপিডিয়া 

২. bn.quora.com

৩. উইকিপিডিয়া

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button