ইতিহাসজানা-অজানা

ইতিহাস ও ঐতিহ্যে খ্যাত নাটোর জেলা

‘বিল চলন গ্রাম কলম কাঁচাগোল্লার খ্যাতি

অর্ধ বালেশ্বরী রানী ভবানীর স্মৃতি

উত্তরা গণভবন রাজ-রাজন্যের ধাম

কাব্যে ইতিহাসে আছে নাটোরের নাম’।

কবি জীবনানন্দের, ‘বনলতা সেন’ এর জন্মস্থান এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি নাটোর জেলা বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত রাজশাহী বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। এই জেলার মোট আয়তন ১,৯০৫.০৫ বর্গ কি.মি.। আয়তনের দিক দিয়ে নাটোর বাংলাদেশের ৩৫ তম জেলা।

এই জেলার উত্তরে নওগাঁ জেলা ও বগুড়া জেলা, দক্ষিণে পাবনা জেলা ও কুষ্টিয়া জেলা, পূর্বে পাবনা জেলা ও সিরাজগঞ্জ জেলা এবং পশ্চিমে রাজশাহী জেলা অবস্থিত।

                                   চিত্রঃ বাংলাদেশের মানচিত্রে নাটোর জেলা

২০১৯ সালের বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী, নাটোর জেলার মোট জনসংখ্যা ১৮,২১,৩৩৬ জন। নাটোরের ৬টি উপজেলাতে বসবাসরত মোট আদিবাসী জনগোষ্ঠী প্রায় ৪৫,০০০। আদিবাসী সম্প্রদায় আছে ২২-২৩ টি। 

প্রশাসনিক পটভূমি

প্রাচীনকালে এ অঞ্চলটি পুণ্ড্র রাজ্যের অন্তর্গত ‘পুণ্ড্রবর্ধন’ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে মুঘল আমলে শাসনব্যবস্থা জমিদারিতে পরিণত হয়।

ইতিহাস ঘেটে জানা যায়, বাংলাদেশের অতি প্রাচীনতম নদ ‘নারদ’ নদকে ঘিরে প্রায় তিনশত বছর আগে নাটোর শহরের গোড়াপত্তন হয়। এরপর ধীরে ধীরে নারদ নদের চারপাশের উর্বর ভূমিকে কেন্দ্র করে বসতি গড়ে ওঠতে থাকে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল খরস্রোতা এই নারদ নদ।

                                     চিত্রঃ বর্তমানে মৃতপ্রায় ‘নারদ’ নদ

নাটোর মুঘল শাসনামলের শেষ সময় থেকে বাংলার ক্ষমতার অন্যতম প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়ে উঠে। বিশেষ করে নবাবী আমলে নাটোরের ব্যাপক বিস্তৃতি ছড়িয়ে পড়েছিলো। 

ঐতিহাসিকদের মতে, আনুমানিক অষ্টাদশ শতকে নাটোরের রাজবংশের উৎপত্তি ঘটে। রাজা রামজীবন রায় ছিলেন নাটোর রাজ বংশের প্রতিষ্ঠাতা।

১৭১০ খ্রিস্টাব্দে, রাজা রামজীবন রায় এ স্থানে মাটি ভরাট করে তার রাজধানী স্থাপন করেন। দিনেদিনে তা প্রাসাদ, দীঘি, উদ্যান, মন্দির ও মনোরম অট্রালিকা দ্বারা সুসজ্জিত নগরিতে পরিণত হয় উঠে ।

কিন্তু নাটোর রাজ্য উন্নতির চরম শিখরে পৌছে রাজা রামজীবনের দত্তক পুত্র রামকান্তের স্ত্রী রাণী ভবানীর রাজত্বকালে । ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে, ক্যাপ্টেন রেনেল এর ম্যাপ অনুযায়ী রাণী ভবানীর জমিদারীর পরিমাণ ছিল ১২,৯৯৯ বর্গমাইল।

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে, পলাশির যুদ্ধে ভারতবর্ষ  ইংরেজদের হাতে চলে যায়। ইংরেজ বেনিয়ারা এদেশে তাদের শাসন কার্যকর করতে চাইলেও রানী ভবানী ইংরেজদের সম-আধিপত্য অস্বীকার করে স্বাধীনভাবে তার জমিদারি পরিচালনা করে। ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে, রানী ভবানীর মৃত্যুর পর পর্যায়ক্রমে শাসনভার ইংরেজদের হাতে চলে যায়।

                                    চিত্রঃ শিল্পীর তুলিতে আঁকা ‘রানী ভবানী’

১৮২১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত, নাটোরে বৃহত্তর রাজশাহী জেলার সদর কার্যালয় ছিল। ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দে, নাটোর থেকে জেলা সদর রামপুর-বোয়ালিয়াতে স্থানান্তরিত হয়। নাটোর মহকুমা সৃষ্টি হয় ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে। ১৮৫৯-১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত, নাটোরে নীল বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে, নাটোর পৌরসভা স্থাপিত হয়। 

১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে, নাটোরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের অধিবেশন হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মহারাজা জগদিন্দ্রনাথের চেষ্টায় সেবারই প্রথম রাজনৈতিক সভায় বাংলা ভাষার প্রচলন করা হয়। ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে, পূর্ণাঙ্গ জেলায় রূপান্তরিত হয় নাটোর। 

বর্তমানে নাটোর জেলায় ৬টি উপজেলা, ৪টি পৌরসভা, ৫২টি ইউনিয়ন, ৩৬টি ওয়ার্ড, ৯৩টি মহল্লা, ১২৭২টি মৌজা ও ১৩৭৭টি গ্রাম আছে।

জেলার নামকরণ 

প্রত্যেক জেলার নামকরণের পিছনেই রয়েছে নানা কল্পকাহিনি। নাটোর জেলা ও তার ব্যতিক্রম নয়।

বলা হয়ে থাকে, বর্তমান নাটোর শহরের ওপরেই একসময় চলনবিলের বিস্তৃতি ছিলো। জনৈক রাজা নৌকায় চড়ে সেই স্থানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় সাপকে ব্যাঙ ধরেছে দেখে নৌকার মাঝিদের ‘নাও ঠারো’ অর্থাৎ নৌকা থামাও বলেছিলেন। আবার হিন্দু ধর্ম মতে, সাপকে ব্যাঙ ধরলে মনসাদেবী ক্রোধান্বিত হন। সুতরাং নৌকা থামিয়ে মনসা পূজা করাই হিন্দু রাজার পক্ষে যুক্তিযুক্ত। সেজন্য ‘নাও ঠারো’ কথা থেকেই ‘নাটোর’ নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে অনুমান করা হয়।

আবার অনেকেই এর ভিন্নমত প্রদর্শন করেন। তাদের মতে, ‘ন-ঠারো’ অর্থাৎ নৌকা থামিও না। তখন জলপথে দস্যু-তস্করের আক্রমণ হতো। তারাও দস্যুকবলিত হতে পারেন, এই আশঙ্কায় তাড়াতাড়ি স্থান ত্যাগ করতে ‘ন-ঠারো’ বলেচজিলেন জনৈক রাজা।

বিলু কবীরের ‘বাংলাদেশের জেলাঃ নামকরণের ইতিহাস’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, নাটোর জেলার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ‘নারদ’ নদীর নাম থেকেই ‘নাটোর’ শব্দটির উৎপত্তি।

অনেকের মতে, নাটোর অঞ্চল নিম্নমুখী হওয়ায় চলাচল করা ছিল প্রায় অসম্ভব। এই জনপদের দূর্গমতা বোঝাতে বলা হতো ‘নাতোর’ ( না-অসম্ভব এবং তর-গমন)। ভাষা গবেষকদের মতে, ‘নাতোর’ হচ্ছে মূল শব্দ। উচ্চারণগত কারণে এটি হয়ে গেছে ‘নাটোর’।

এছাড়াও জনশ্রুতি আছে যে, এখানকার কোনো এক স্থানে ব্যাঙ সাপকে গ্রাস করেছিল এবং তা দেখে কয়েকজন বালিকা নৃত্য করেছিল। এ নৃত্যকে উপলক্ষ করেই ওই স্থানের নাম হয় নাট্যপুর। পর্যায়ক্রমে নাট্যপুর, নাটাপুর, নাট্টর ও নাটোর হয়েছে। 

দর্শনীয় স্থান

নাটোরের অন্যতম দর্শনীয় স্থানগুলো হলোঃ- চলন বিল; রানি ভবানী রাজবাড়ি; দয়ারামপুর রাজবাড়ি; বনপাড়া লুর্দের রাণী মা মারিয়া ধর্মপল্লী; উত্তরা গণভবন (দিঘাপতিয়ার রাজবাড়ি); ফকিরচাঁদ বৈষ্ণব গোঁসাইজির আশ্রম; শহীদ সাগর; হালতি বিল; চাপিলা শাহী মসজিদ; গ্রীন ভ্যালি পার্ক; ভেল্লাবাড়ি মসজিদ; চলন বিল জাদুঘর; তিসীখালি মাজার; ঔষধি গ্রাম; চৌগ্রাম জমিদার বাড়ি এবং ডিসি পার্ক ইত্যাদি। 

                                                চিত্রঃ চলন বিল

                                           চিত্রঃ উত্তরা ভবন

                                                 চিত্রঃ নাটোরের রাজবাড়ি 

প্রধান নদনদী

উল্লেখযোগ্য নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে পদ্মা নদী, আত্রাই নদী, বড়াল নদী, নারদ নদ, তুলসীগঙ্গা এবং নাগর নদ। এই জেলায় মোট ৩২ টি নদ-নদী এবং চলনবিল ও হালতির বিল সহ অসংখ্য খাল-বিল রয়েছে।

কৃতী ব্যক্তিত্ব

নাটোর জেলার কৃতি ব্যক্তিদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেনঃ- রাণী ভবাণী; জিন রহস্য আবিষ্কারক মোঃ মাকসুদুর রহমান; বীর উত্তম এয়ার ভাইস মার্শাল খাদেমুল বাশার; লালন শিল্পী ফরিদা পারভিন; রাজনীতিবিদ জুনাইদ আহমেদ পলক; অধ্যক্ষ এম. এ. হামিদ; ক্রিকেটার তাইজুল ইসলাম; মরমী কবি আহসান আলী এবং স্যার যদুনাথ সরকার প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। 

তথ্যসূত্রঃ 

১. বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন 

২.বাংলাপিডিয়া 

৩. বাংলা ট্রিবিউন 

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button