ইতিহাস

ইতিহাসের পাতায় বিশ্ব-ঐতিহ্যের জেলা বাগেরহাট

বাংলাদেশ এর দক্ষিণ পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের কূল ঘেঁষে অবস্থিত একটি জেলা বাগেরহাট। এটি খুলনা বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। 

বাংলাদেশে ইউনেসকো কর্তৃক ঘোষিত যে তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান রয়েছে, তার দুটির গর্বিত অবস্থান এই বাগেরহাটে। এর একটি হচ্ছে – ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদসহ খানজাহান (রহ:) এর কীর্তি, অন্যটি প্রকৃতির অপার বিস্ময় সুন্দরবন। এই জেলার মোট আয়তন ৩,৯৫৯.১১ বর্গ কি.মি।

বাগেরহাট জেলার উত্তরে গোপালগঞ্জ ও নড়াইল জেলা, পশ্চিমে খুলনা জেলা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এবং পূর্বে পিরোজপুর ও বরগুনা জেলা অবস্থিত। 

চিত্রঃ বাংলাদেশ এর মানচিত্রে বাগেরহাট জেলা 

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, এই জেলার মোট জনসংখ্যা ১৫,১৫,৮১৫ জন।

প্রশাসনিক পটভূমি

উপমহাদেশের বহু প্রাচীন জনপদের একটি উল্লেখযোগ্য অঞ্চল এই বাগেরহাট জেলা। বাগেরহাট জেলার সমৃদ্ধির ইতিহাস ও বহু পুরাতন। 

এক সময় বাগেরহাট অঞ্চল ছিল সুন্দরবন-এর অংশ। এই অঞ্চলে অনার্য্য জাতির লোকেরা আদিবসতি স্থাপন করেছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, তারা বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে এসে এখানে বসবাস শুরু করেন। 

নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ যখন বাংলার শাসক (১৪৪২-১৪৫৯), তখন হজরত খানজাহান (র.) এ অঞ্চল আবাদ করে নামকরণ করলেন ‘খলিফাত-ই-আবাদ’ বা প্রতিনিধির অঞ্চল। মানুষের কল্যাণে তিনি তৈরি করলেন ষাটগম্বুজসহ অসংখ্য মসজিদ।  দিঘি, রাস্তা এবং অগণিত হাটবাজার ও পত্তন করেন।

   চিত্রঃ ‘খলিফাত-ই-আবাদ’ শহরের কাঠামো 

১৪৫০ খ্রিস্টাব্দে, হযরত খান জাহান (র:) খানজাহানের দীঘি খনন করান। হযরত খানজাহান (রঃ) এর মৃত্যুর পর হুসেন শাহী রাজবংশের শাসকরা (১৪৯৩-১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ) এ অঞ্চল শাসন করতেন। অনেকে মনে করেন, বাংলা সুলতান নসরৎ শাহ টাকশাল বাগেরহাট শহরের নিকটবর্তী মিঠাপুকুরের নিকটে অবস্থিত ছিল। উল্লেখ্য মিঠাপুকুর পাড়ে সে আমলের একটি মসজিদ আছে।

১৭৫৭ সালে, ভারতবর্ষ ইংরেজদের অধিকারে আসার পর, এই অঞ্চল প্রথমে ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং পরে ব্রিটিশ শাসনে চলে যায়। ১৭৮৬ সালে, লর্ড কর্ণওয়ালিসের শাসন আমলে যশোরকে জেলায় পরিণত করা হয়। ১৮৪২ সাল পর্যন্ত, খুলনা ছিলো যশোর জেলার একটি মহকুমা এবং বাগেরহাট ছিলো খুলনা মহকুমার অন্তর্গত একটি থানা।

১৮৪৯ সালে, মোরেল উপাধিধারী দু’জন ইংরেজ বাগেরহাটে ‘মোরেলগঞ্জ’ নামক একটি বন্দর স্থাপন করেন। ১৮৬১ সালের ২৬ নভেম্বর, ‘মোড়েল-রহিমুল্লাহ’ নামক এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ (নীল বিদ্রোহ) হয়। এই সময় সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র খুলনার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। বিদ্রোহের তদন্তের ভার তার উপরে ন্যস্ত হয়। সেই সংঘর্ষের কারণেই তিনি প্রশাসনিক প্রয়োজনে বাগেরহাটে একটি মহকুমা স্থাপন করার সুপারিশ করেন।

এই সুপারিশের সূত্রে ১৮৬৩ সালে, বাগেরহাট যশোর জেলার অন্তর্গত একটি মহকুমায় রূপান্তরিত হয়।

১৮৮২ সালে, খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট মহকুমা নিয়ে গঠিত হয় খুলনা জেলা।

পরবর্তীতে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৮৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, বাগেরহাট একটি জেলা হিসেবে উন্নীত হয়।

বর্তমানে বাগেরহাট ৯টি উপজেলা, ৩ টি পৌরসভা, ৭৫টি ইউনিয়ন, ৭২০ টি মৌজা এবং ১০৪৭ টি গ্রাম নিয়ে গঠিত।

নামকরণের ইতিহাস 

বাগেরহাট জেলার নামকরণ কিভাবে হলো  বা কে এই নাম দিয়েছে তা উদঘাটন করা এখন প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি।  সাধারণভাবে অনেকেই মনে করেন, বাগেরহাটের নিকটবর্তী সুন্দরবন থাকায় এলাকাটিতে বাঘের উপদ্রব ছিল। এ জন্যে এ এলাকার নাম হয়ত ‘‘বাঘেরহাট’’ হয়েছিল এবং ক্রমান্বয়ে তা বাগেরহাট-এ রূপান্তরিত হয়েছে। যদিও এটা শুধুই অনুমানভিত্তিক। কারণ, ঐতিহাসিক ভাবে বাঘ এর সঙ্গে বাগেরহাট নামকরণের কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায় নি।

ঐতিহাসিক ষাট গম্বুজ মসজিদের শহর আজকের বাগেরহাট খ্রিস্টীয় চৌদ্দ শতকে ছিল ‘‘খলিফাত-ই-আবাদ’’ নগর রাজ্যের রাজধানী। ১৯১৪ সালে প্রকাশিত, ঐতিহাসিক সতীশ চন্দ্র মিত্রের লেখা সুবিখ্যাত ‘যশোর-খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, হযরত খান জাহানের এর প্রতিষ্ঠিত ‘‘খলিফাত-ই-আবাদ’’ এর অন্যতম স্থাপনা ‘বড় আজিনা’ সংলগ্ন বর্তমান বাগেরহাট শহর এলাকায় খান জাহানের ‘বাগ’ ছিলো। ফার্সি ‘বাগ’ শব্দের অর্থ বাগান বা বাগিচা। সেই বাগ এলাকায় বসা হাট থেকে বাগেরহাট নামকরণ হয়েছে বলে মনে করা হয়।

অনেকের মতে, মুঘল আমলে বাখরগঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা (বরিশালের শাসক) ‘আগা বাকেরে’র নামানুসারে এই এলাকার নামকরণ করা হয়েছিল বাকেরহাট। কালক্রমে তা বাগেরহাট-এ পরিণত হয়।

আবার অনেকের মতে, পাঠান জায়গীরদার বাকির খাঁ’র নাম থেকে বাগেরহাট। যদিও এসব ক্ষেত্রে উপযুক্ত যুক্তির সংকটও রয়েছে।

তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মতটি হচ্ছে, বাগেরহাট শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত ভৈরব নদীর উত্তর দিকের হাড়িখালী থেকে বর্তমান নাগের বাজার পর্যন্ত যে লম্বা বাঁক অবস্থিত, পূর্বে সে বাঁকের পুরাতন বাজার এলাকায় একটি হাট বসত। আর এ হাটের নামে এ স্থানটির নাম হলো ‘বাঁকেরহাট’। কালক্রমে বাঁকেরহাট পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘বাগেরহাট’ নামে। প্রসঙ্গত, বর্তমান বাগেরহাট বাজার স্থানান্তরিত হওয়ার আগে পুরনো বাজারই ছিলো বাগেরহাটের প্রধান বাজার। অনেক ইতিহাসবিদই বাঁকের হাট থেকে বাগেরহাট নামকরণের মতটি সমর্থন করেন।

দর্শনীয় স্থান-সমূহ

ঐতিহাসিক মসজিদের নগরী’ বাগেরহাট জেলার অন্যতম দর্শনীয় স্থান সমূহ হলোঃ- 

ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদ; সুন্দরবন; খানজাহান আলীর দীঘি; অযোধ্যা মঠ/কোদলা মঠ; রেজা খোদা মসজিদ; জিন্দা পীর মসজিদ; ঠান্ডা পীর মসজিদ; সিংগাইর মসজিদ; বিবি বেগুনি মসজিদ; চুনাখোলা মসজিদ; নয় গম্বুজ মসজিদ; সেন্ট পলস্ গির্জা; রণবিজয়পুর/দরিয়া খাঁ’র মসজিদ; দশ গম্বুজ মসজিদ; মংলা বন্দর;সুন্দরবন যাদুঘর; সুন্দরবন-এর করমজল; কুটিবাড়ি; বনগ্রামের রাজবাড়ি; পীর আলীর সমাধি; মুনিগঞ্জ শিবমন্দির ইত্যাদি।

                                    চিত্রঃ ষাট গম্বুজ মসজিদ 

                                চিত্রঃ কোদলা মঠ

                      চিত্রঃ সেন্ট পলস্ গির্জা

নদনদী 

বাগেরহাট জেলার উল্লেখযোগ্য নদনদী হলোঃ- দড়াটানা, পানগুছি, মধুমতি, পশুর, হরিণঘাটা, মোংলা, বলেশ্বর, ভাংগ্রা, গোসাইরখালী ও বগুড়া নদী।

কৃতি ব্যক্তি-বর্গ

বাগেরহাট  জেলার কৃতি ব্যক্তিদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেনঃ- বীর উত্তম লিয়াকত আলী খান; বীর বিক্রম খিজির আলী; বীর প্রতীক মোহাম্মদ হোসেন; বীর প্রতীক এনামুল হক; কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ এবং ক্রিকেটার রুবেল হোসেন, আব্দুর রাজ্জাক প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। 

তথ্যসূত্রঃ

১. বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন 

২. বাংলাপিডিয়া 

৩. বাংলা ট্রিবিউন 

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button