ইতিহাসজীবনী

নারীত্বের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বিবি খাদিজা (রা)

আজ আপনাদের এক নারীর গল্প শোনাব। জাহেলী যুগের এক নারীর গল্প। যবে নারী সন্তান জন্ম নিলেই মাটির নিচে পুতে ফেলা হত , যবে নারীকে স্রেফ ভোগ-বিলাসের বস্তু মনে করা হত, যবে নারীদের আদতে ছিলো না কোথাও তেমন কোন সামাজিক অধিকার ছিলো শুধু লাঞ্চনা আর অপমান । আজ আমরা সে সময়কার এক নারীর গল্প শুনব । নারীটির নাম খাদিজা (রা)।

যখনকার ঘটনা শুনাচ্ছি তখন নারীটির বয়স চল্লিশের কোঠায়।ইতিমধ্যেই খাদিজার(রা) আগে দু’বার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। পিতা ও মৃত পূর্ব স্বামীদের থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদকে নিজ বুদ্ধিমত্তায় দিনকেদিন ফুলিয়ে-ফাপিয়ে বাড়িয়ে তদ্দিনে দাড় করিয়ে ফেলেছিলেন এক বিজনেস ইম্পায়ার।

পাপ-পঙ্কিলতায় ঢাকা তৎকালীন আরব সমাজ যেখানে যৌনতা-অশ্লীলতাকে পূজা করা হত সে সমাজে নিজ চরিত্র গুণে তাহিরা বা পূত পবিত্র নামে খ্যাতি পেয়েছিলেন সর্বজন ব্যাপি । সে সময়ে ব্যবসায়িক কাজে নারীটির প্রয়োজন পড়েছিল একজন সৎ এবং বিশ্বস্ত ম্যানেজারের । তৎকালীন মক্কায় সৎ এবং বিশ্বস্ত শব্দের সাথে এক কথায় মুহাম্মদ (স) নামটিই লোকমুখে সর্বাধিক প্রচলিত ছিল। ব্যাবসায়িক কাফেলা ম্যানেজমেন্ট করার এ প্রস্তাব সম্পর্কে পিতৃতুল্য চাচা আবু তালিবের সাথে পরামর্শ করে রাজি হয়ে গেলেন মুহাম্মদ (স)।

সিরিয়া থেকে ফেরা মুহাম্মদ(স) এর থেকে প্রাপ্ত নিজ বানিজ্য কাফেলার লভ্যাংশের পরিমাণে রিতীমত চমকে উঠেন খাদিজা (রা)। এছাড়াও ব্যাবসায়িক কাফেলায় থাকা তার সহযোগীদের থেকে মুহাম্মদ (স) এর আশ্চর্জ গুণাবলি, সকলের সাথে তার সদাচার, অধীনস্ত কর্মচারীদের সাথে তার সদ্ভাব খাদিজা (রা) কে তার প্রতি আকৃষ্ট করে। উচ্চ বংশীয়, অভিজাত পরিবার থেকে হওয়ায় খাদিজা (রা) বিয়ের প্রস্তাব নিজ বান্ধবী নাসিফা বিনতে মুনিয়ার মাধ্যমে রাসূল (স) এর কাছে পাঠান। চল্লিশের কোঠায় থাকা এক মহিলা কয়েক সন্তানের মা হওয়া সত্ত্বেও সৌন্দর্য, আভিজাত্য, চরিত্রে অসাধারণ খ্যাতি থাকার কারণে সেকালে বহু ব্যাবসায়ী, ধনাড্য ব্যাক্তিবর্গের বিয়ের প্রস্তাব আসতেই থাকত।

তৎকালীন আরবে পুরুষের মান-মর্যাদা মাপা হত তার অর্থ-বিত্ত দ্বারা। এত ধনাড্য মহিলা হওয়া সত্ত্বেও খাদিজা(রা) যখন মুহাম্মদের(স) এর মত নিস্ব গরীব একজন মানুষকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলেন তখন নানা মহল থেকে কটাক্ষ করে প্রশ্ন আসতে লাগল “তোমার এতো আভিজাত্য ও সম্পদের অধিকারী হবার পরও কেন দরিদ্র এক যুবককে বিয়ে করলে?”

খাদিজা(রা) তখন শক্ত কন্ঠে জবাব দিয়েছিলেন; “এই সমাজে মুহাম্মদ (সাঃ) এর মতো আর কেউ কি আছে? তার মতো সচ্চরিত্রবান ও মর্যাদাবান দ্বিতীয় কোন ব্যক্তিকে কি তোমরা চেন ? আমি তার সৎ গুণাবলীর কারণে তাকে বিয়ে করেছি।” হযরত খাদিজা(রা) যেন পরবর্তী নারী সমাজকে চোখে আঙুল দিয়ে শিখিয়ে দিয়ে গেলেন একজন নারীর স্বামী নির্বাচন কি গুণের ভিত্তিতে করা উচিত।

আবু তালিবের পরামর্শের ভিত্তিতে রাসূল(স) বিয়েতে সম্মতি দিলে হযরত খাদিজা (রা) বনে যান “উম্মুল মুমিনিন”। উভয় পক্ষের বিবাহের যাবতীয় খরচ খাদীজা(রা) নিজেই বহন করেন। সম্পদের অহংকার কিংবা দারিদ্রের হীনমন্যতা নয় জীবন সাথীর সমস্ত সুখ দুক্ষই যেন তারা ভাগ করা শুরু করে দিয়েছিলেন সেদিন থেকে।দীর্ঘ ২৫ বছর স্থায়ী হওয়া এ দাম্পত্য জীবন পৃথিবীর যেকোন দম্পতির জন্য শ্রেষ্ঠ অনুকরণীয় নিদর্শন হতে পারে।

রাসূল(স) এর বয়স যখন ৪০ এর কাছাকাছি পৌছায় তিনি একাকী জীবনের দিকে ঝুকে পড়েন। দূর হেরা পর্বতের গুহায় বসে শ্রষ্টা সম্পর্কে চিন্তা করাই তার কাছে অধিক প্রিয় হয়ে উঠে। সে সময়েও নবির পাশে ভরসার প্রতীক হিসেবে ঠায় দাড়িয়ে যান উম্মুল মুমিনিন খাদিজা (রা)। বর্তমান স্ত্রীদের ন্যায় স্বামীর পুরুষত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে বসেন নি, বলে বসেন নি কেমন পুরুষ আপনি সারাদিন পাহাড়ের হাওয়া খেয়ে বেরাচ্ছেন। সংসার,বাচ্চা-কাচ্চা সামলানোর দায়িত্ব কি শুধুই আমার!

এমন অভিযোগের জায়গায় যেখানে হাজীদের উঠতে দম ফুরিয়ে যায় হেরা পর্বত সেখানে স্বামীকে প্রতিদিন খাবার,পানি,ব্যবহার্য দিয়ে আসতেন। জিবরাইল (আ) থেকে প্রাপ্ত প্রথম ওহীর পর ভয়ে কুকড়ে যাওয়া রাসূল (স) আস্থা খুজতে যান নি পিতৃতুল্য আবু তালিব কিংবা পরম বন্ধু আবু বকরের কাছে, গিয়েছিলেন নিজ স্ত্রী খাদিজার পরম সান্নিধ্যে। খাদীজা স্ত্রী হিসেবে স্বামীর মনে এ জায়গা তৈরি করে নিতে পেরেছিলেন। যেখানে রাসূল(স) এর কথা শুনে পাগলের প্রলাপ না বলে স্ব-বুদ্ধিমত্তায় পরিস্থিতি যেমন সামাল দিয়েছিলেন, স্বামীকে তেমনই শক্তি ও সাহসও দিয়েছিলেন।

ওয়ারাকা ইবনে নাওফেলের ভবিষ্যৎ বাণী ‘রাসূল (স) জিবরাইল(আ) হতে প্রাপ্ত বাণি প্রচার শুরু করলে তার স্বজাতি তাকে নিজ দেশ থেকে বাহির করে দিবে’ শোনার পরই খাদীজা(রা) বুঝতে পেরে গিয়েছিলেন তার স্বামী পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে লড়তে যাচ্ছে। এরকম পরিস্থিতিতেও পিছু না হটে স্বামীকে দিয়ে গিয়েছিলেন পূর্ণ সহায়তা। নিজ অঢেল সম্পদের দ্বার পুরোপুরি খুলে দিয়েছিলেন রাসূল (স) এর জন্য, বলেছিলেন যা আমার সবই ত আপনার।

ইসলামের বাঁধ যখন আর থামানো যাচ্ছিল না কাফের কুরাইশরা তখন এ মানুষগুলোকে করে দিয়েছিল একঘরে, বয়কট। সামান্য খাবার দানাও মুসলমানদের কাছে পৌছানোর উপায় ছিল না। গাছের পাতা খেয়ে জীবন ধারণ করছিল ইসলামের এ সৈনিকরা। উচ্চ বংশীয় আভিজাত্যের মাঝে বেড়ে উঠা খাদিজা(রা) এ পর্যায়েও স্বামীর পাশ ছেড়ে চলে যান নি। বয়কটের অবর্ণনীয় কষ্ট খাদীজা (রা) আর নিতে পারেন নি। আল্লাহ তার প্রিয় বান্দীকে নিজ সানিধ্যে ডেকে নিয়ে যান।

মৃত্যুর পূর্বেও তার শেষ কথা ছিল “হে রাসূল আমি আপনার সব অধিকার পরিপূর্ণ ভাবে রক্ষা করতে পারিনি, আমাকে ক্ষমা করে দিন।” আল্লাহ ও তার রাসূলের জন্য এত ত্যাগ তিতিক্ষার পরও যেন তার মন ভরেনি। অবশেষে ৬১৭ হিজরীর ১৫’ই রমজান এ মহীয়সী নারী পৃথিবীকে বিদায় জানান।

বিদায় জানানোর পূর্বেই খাদীজা (রা) বিশ্ব নারী সমাজকে দিয়ে গিয়েছিলেন এক অপূর্ব নারীত্বের দৃষ্টান্ত। চরম পুরুষবাদী এক সমাজে ব্যাবসায়ী হিসেবে যেখানে পরিচয় দিয়েছিলেন অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার, স্বামীর পাশে থাকাতে সেই তিনিই দিয়ে গিয়েছিলেন অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত, যার পুরো জীবনই ছিলো অসাধারণ এক উপাখ্যান। মানব ইতিহাসের লাখো বছরের ইতিহাসে যিনি স্থান পেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠ নারীদের একজনের আসীনে।

এ সম্বন্ধে রাসূল(স) বলেন ;

“চার জন মহিলা: মারিয়াম বিনতে ইমরান, ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া, খাদিজা বিনতে খাওয়ালিদ এবং ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ ছাড়া কোন মহিলাই পরিপূর্ণতার স্তরে পৌছতে পারবেন না।”

খাদীজা (রা) ইসলামের দূর্বল লাঠিকে তখন ধরেছিলেন যখন এর পাশে কেও ছিল না, তিনি তার সমস্থ শক্তি দিয়ে একে আকড়ে ধরেছিলেন,প্রতিষ্ঠায় বিরাট অবদান রেখে গিয়েছিলেন বর্তমান বিশ্বের দ্বিতীয় জনসমর্থিত এক ধর্মকে । রাসূল (স) এর এ কথাটিই এর যথার্থতা প্রমাণে যথেষ্ট;

” মানুষ যখন আমাকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছে, তখন সে আমাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছে। সবাই যখন কাফির ছিল তখন সে ছিল মুসলমান। কেউ যখন আমার সাহায্যে এগিয়ে আসেনি, তখন সে আমায় সাহায্য করেছে।”

এভাবেই মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম নারীদের একজন খাদীজা(রা) অজ্ঞতা,মূর্খতা,অত্যাচার, অশ্লীলতায় ডুবে থাকা এক সমাজে অবস্থান করেও অশ্লীলতা, যৌনাচার, লিবার্টিজম বা তথাকথিত ফেমিনিজমের মাধ্যমে নয় বুদ্ধিমত্তা, চরিত্র, চিন্তা, ধৈর্য,ত্যাগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করে গেলেন নারীত্বের সর্বোত্তম নিদর্শন।

মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ খান (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

আরো পড়ুন;

মোঙ্গলদের ইসলাম গ্রহণের ইতিহাস;https://cutt.ly/yjbuYeg

Show More

MK Muhib

A researcher,An analyst,A writer,A social media activist,student at University of dhaka.

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button