ইতিহাস

ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সিলেট জেলা

সিলেট জেলা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট বিভাগের অধিভুক্ত একটি প্রশাসনিক অঞ্চল এবং একটি প্রাচীন জনপদ।  বনজ, খনিজ ও মৎস্য সম্পদে ভরপুর এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মন্ডিত এ জেলা দেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী ও বিশ্বের দ্বিতীয় লন্ডন হিসেবে খ্যাত।

সিলেট জেলার উত্তরে ভারতের মেঘালয় ও খাশিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়, পূ্র্বে ভারতের আসাম, দক্ষিণে মৌলভীবাজার জেলা ও পশ্চিমে সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলা অবস্থিত। এই জেলার মোট আয়তন ৩,৪৫২ বর্গ কি.মি.।

                               চিত্রঃ বাংলাদেশ এর মানচিত্রে সিলেট জেলা 

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, এই জেলার মোট জনসংখ্যা ৩৫,৬৭,১৩৮ জন। 

প্রশাসনিক পটভূমি

চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং এর ৬৪০ খ্রিষ্টাব্দের ভ্রমণ বিবরণী থেকে সিলেট জেলা সম্পর্কে ব্যাপক তথ্য পাওয়া যায়। তৎকালীন সময়ে বর্তমান সিলেট জেলা শ্রীহট্টমণ্ডল নামে পরিচিত ছিলো।

সিলেটের আঞ্চলিক ইতিহাস গ্রন্থে এই অঞ্চলের প্রাচীন সীমানার যে উল্লেখ পাওয়া যায় সে অনুসারে, তৎকালীন শ্রীহট্টমণ্ডল বর্তমান সিলেট বিভাগের চেয়ে আয়তনে অনেক বড় ছিল। এমনকি বাংলাদেশের বর্তমান সরাইল বা সতরখণ্ডল (ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অন্তর্গত), জোয়ানশাহী (বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার অন্তর্গত), ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের অনেকাংশ শ্রীহট্টের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর পরবর্তী সময়ে, এই অঞ্চলের ভৌগোলিক রুপরেখার বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটে। অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগে, সিলেট বিভাগের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কিছু অংশ ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত  এবং দক্ষিণ-পশ্চিমের অনেক অংশ হারিকেল রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। অবশিষ্টাংশে শ্রীহট্টের প্রাচীন রাজ্য জয়ন্তীয়া, লাউড় ও গৌড় বিস্তৃত ছিল। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে সিলেট এলাকায় মানুষের বসবাস বাড়তে থাকে। 

১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে, গৌড় গোবিন্দকে পরাজিত করে হজরত শাহ্জালাল সিলেট অধিকার করে ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করেন। যার ফলে সিলেট চলে আসে মুসলমান সুলতানদের অধীনে। সুলতানী আমলে সিলেটের নাম ছিল জালালাবাদ। 

১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে, এ অঞ্চল ব্রিটিশদের অধীনে যাওয়ার পর ১৭৭২ সালের ১৭ মার্চ, সিলেট জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৮৭৪ সাল পর্যন্ত, সিলেট জেলা ঢাকা বিভাগ এর অন্তর্ভুক্ত ছিলো। ঐ বছরেরই ১২ সেপ্টেম্বর নবসৃষ্ট আসাম প্রদেশের সাথে সিলেটকে সংযুক্ত করা হয়। সিলেট পৌরসভা সৃষ্টি হয় ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে ।

ঔপনিবেশিক আমল থেকেই সিলেট দ্রুত বিকাশ লাভ করতে থাকে। ১৮৯০ এর দশকের শেষ ভাগে বেশ কিছু রাস্তাঘাট তৈরি করা হয়।

১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ১২ জুন, এক মারাত্মক ভূমিকম্পে গোটা সিলেট শহরটি প্রায় সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়। পরবর্তী কালে ধংসস্তুপ এর ওপর গড়ে উঠে আরো সুন্দর ও আধুনিক শহর। যেটি অনেক টাই ইউরোপীয় ধাঁচের ছিলো।

১৯১২-১৫ সালে, আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের একটি শাখা সিলেটের সাথে সংযুক্ত হলে দেশের অন্যান্য অংশের সাথে সিলেটের বিচ্ছিন্নতার প্রকৃত অবসান ঘটে।

১৯৪৭ সালে, দেশ ভাগের সময় গণভোটের মাধ্যমে সিলেট জেলা তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান এর সাথে সম্পৃক্ত হয়। তখন প্রশাসনিকভাবে সিলেট ছিল চট্টগ্রাম বিভাগ এর অন্তর্ভুক্ত। 

স্বাধীনতার পর ১৯৮৩-৮৪ সালে, প্রশাসনিক পুনর্গঠন এর সময় বৃহত্তর সিলেট জেলাকে সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার নামে ৪টি নতুন জেলায় বিভক্ত করা হয়।স্বাধীনতাপূর্ব সদর মহুকুমার এলাকা নিয়ে বর্তমান সিলেট জেলা গঠিত।

১৯৯৫ সালের ১ আগস্ট, দেশের ষষ্ঠ বিভাগ হিসেবে মর্যাদা পায় সিলেট।

সিলেট জেলা ২৭ ওয়ার্ড বিশিষ্ট ১টি সিটি কর্পোরেশন, ১৩টি উপজেলা, ১৭টি থানা, ৫টি পৌরসভা, ১০৬টি ইউনিয়ন, ১৬৯৩টি মৌজা, ৩৪৯৭টি গ্রাম নিয়ে গঠিত। 

নামকরণের ইতিহাস 

প্রাচীন গ্রন্থাদিতে সিলেট জেলার বিভিন্ন নামের উল্লেখ আছে। পুরাণে বলা হচ্ছে, বিষ্ণু চক্রে খণ্ডিত সতীর শবদেহের যে ৫১টি খণ্ড উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে পতিত হয় তার মধ্যে দেবীর কাটা হস্ত (হাত) এই অঞ্চলে পড়েছিল। যেহেতু সতীর অপর নাম শ্রী। সেহেতু ‘শ্রী হস্ত’ হতে শ্রীহট্ট নামের উৎপত্তি বলে হিন্দু সম্প্রদায় বিশ্বাস করেন।  বিষয়টাকে এভাবেও বলা যায়, শ্রী অর্থ প্রাচুর্য বা সৌন্দর্য, হস্ত অর্থ হাত। যেখানে শ্রী এর হস্ত পাওয়া গিয়েছিল তাই শ্রীহস্ত- যা কালের বিবর্তনে শ্রীহট্ট নাম ধারণ করে। 

শ্রীহট্ট শব্দের আর এক নাম সমৃদ্ধ হাট। ঐতিহাসিকদের ধারণা, সিলেট বা শ্রীহট্ট বহু আগে উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রাচীন যুগে শ্রীহট্ট নামে প্রতিষ্ঠিত পৃথক রাষ্ট্র কিছুকালের জন্য ‘হরিকেল’ নামেও পরিচিত ছিলো।

খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের ঐতিহাসিক ‘এরিয়ান’ লিখিত বিবরণীতে এই অঞ্চলের নাম “সিরিওট” বলে উল্লেখ আছে। এছাড়া, খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে ‘এলিয়েন’ এর বিবরণে “সিরটে”, এবং ‘পেরিপ্লাস অব দ্যা এরিথ্রিয়ান সী’ নামক গ্রন্থে এ অঞ্চলের নাম “সিরটে” এবং “সিসটে” এই দুইভাবে লিখিত হয়েছে।

৬৪০ খ্রিস্টাব্দে, চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং এই অঞ্চল ভ্রমণ করেন। তিনি তাঁর ভ্রমণ কাহিনীতে এ অঞ্চলের নাম “‘শিলিচট্রল” উল্লেখ করেছেন।

বিখ্যাত মুসলিম পরিব্রাজক আল-বিরুনী তার ‘কিতাবুল হিন্দ’ গ্রন্থে সিলেটকে ‘সিলাহট’ নামে উল্লেখ করেন। 

তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি বঙ্গবিজয়ের মধ্য দিয়ে এদেশে মুসলিম সমাজব্যবস্থার সূত্রপাত ঘটলে মুসলিম শাসকরা তাদের দলিলপত্রে ‘সিলাহেট, ‘সিলহেট’ ইত্যাদি নাম লিখেছেন বলে ইতিহাসে প্রমাণ মেলে। এভাবেই রূপান্তর হতে হতে একসময় ‘সিলেট’ নামটি প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছে বলে ঐতিহাসিকরা ধারণা করেন।

হিন্দু মিথ বলছে, কন্যা শীলাদেবীর স্মৃতি রক্ষার্থে একটি হাট অর্থাৎ বাজার গড়ে তোলেন প্রাচীন গৌড়ের রাজা গুহক। তখন শিলার নামের সঙ্গে হাট জুড়ে নাম হয় শীলাহাট। কালক্রমে এই বাজারের নাম পরিবর্তিত হয়ে শিলাহাট থেকে সিলট, সবশেষে সিলেট নামের উৎপত্তি হয়।

হজরত শাহজালালের (র.) ‘সিল হট যাহ্’ আদেশ থেকে সিলেট নামের উৎপত্তি বলেও ধারণা প্রচলিত আছে। সিলেটে আসার সময় পথে অনেক বড় বড় পাথর পড়ায় শাহজালাল আদেশ করেন-সিল হট যাহ (পাথর সরে যা)। ওই আদেশে পাথর খণ্ড সরে গেলে সিলহট নামটির জন্ম হয়, যা পরে সিলেট নামে পরিচিতি পায়।  

তবে সবচেয়ে প্রচলিত ধারণাটি হলো, পাথরকে বলা হয় শীলা। আর পাথরের প্রাচুর্যের কারণেই এই এলাকাকে সিলেট বলা হয়। সিলেট শব্দের অনুসর্গ ‘সিল’ মানে ‘শীল’ আর উপসর্গ ‘হেট’ মানে হাট অর্থাৎ বাজার। প্রাচীনকাল থেকে এই জেলায় পাথর (শীল) ও হাটের (ব্যবসা ও বাণিজ্যের) প্রাধান্য ছিল বলে ‘শীল’ ও ‘হাট’ শব্দদ্বয় মিলে ‘সিলেট’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।

চিত্তাকর্ষক স্থান ও পর্যটন আকর্ষণ

সিলেট জেলার চিত্তাকর্ষক স্থান ও স্থাপনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হযরত শাহজালালের (রহ) মাযার; গৌর গোবিন্দের টিলা; মালনী ছড়া চা বাগান; জাফলং; রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট ; টাংগুয়ার হাওর; হাম হাম জলপ্রপাত; সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান; বিছনাকান্দি; লোভাছড়া; হাকালুকি হাওর; ওসমানী যাদুঘর; ক্বীন ব্রীজ; ড্রিমল্যান্ড পার্ক; মিউজিয়াম অব রজার্স; পর্যটন মোটেল; শাহী ঈদগাহ; কৈলাশটিলা; লালাখাল; পাংতুমাই; মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত; তামাবিল; মহাপ্রভু শ্রী চৈত্যনো দেবের বাড়ী ইত্যাদি। 

                                     চিত্রঃ বিছানাকান্দি, সিলেট

                           চিত্রঃ রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট

চিত্রঃ মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত

বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ

সিলেট জেলা অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের জন্মস্থান হিসেবে সকলের নিকট অত্যাধিক পরিচিত। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেনঃ জেনারেল মুহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী; মেজর জেনারেল এম এ রব; রাজা গিরিশচন্দ্র রায়; শাহ আবদুল করিম; আবুল মাল আব্দুল মুহিত; নুরুল ইসলাম নাহিদ; হেমাঙ্গ বিশ্বাস; গোবিন্দ চন্দ্র দেব; হেনা দাস; শ্রীচৈতন্যদেব; সুরেন্দ্র কুমার সিনহা; চিত্রনায়ক সালমান শাহ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। 

তথ্যসূত্রঃ

১. বাংলাপিডিয়া 

২. ঢাকা ট্রিবিউন 

৩. বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন 

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button