ইতিহাসজীবনী

ফাতিমা আল-ফিহরিঃ বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা মুসলিম নারী

মরক্কোর ফেজ নগরী তে অবস্থিত বিশ্বের সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয়, কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় টি ই হচ্ছে পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়, যা গিনেজ বুক অফ ওয়ার্ল্ড এবং ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত। আজ থেকে প্রায় ১১৬২ বছর আগে ৮৫৯ সালে, এই বিশ্ববিদ্যালয় টি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ঐতিহাসিক এই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন ফাতিমা আল ফিহরি নামক এক মুসলিম নারী।

ফাতিমা আল-ফিহরি আনুমানিক ৮০০ খ্রিস্টাব্দে, বর্তমান তিউনিসিয়ার কাইরাওয়ান শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ আল-ফিহরিয়া আল-কুরাইশিয়া। তিনি উম্মুল বানীন বা ‘শিশুদের মা’ হিসবে অধিক পরিচিত ছিলেন। তার বাবার নাম মুহাম্মদ আল-ফিহরি। নবম শতাব্দীর প্রথম দিকে, তার পুরো পরিবার ‘ফেজ’ নগরীতে গিয়ে বসবাস শুরু করে। ফেজ নগরী তে গিয়ে মুহাম্মদ আল-ফিহরি ব্যবসায়ে অসামান্য সাফল্য অর্জন করেন। যার ফলে ফেজ নগরীর একজন বিত্তশালী ব্যবসায়ীতে পরিণত হন। 

ফাতিমা আল-ফিহরি এবং তার বোন মারিয়াম আল-ফিহরি ক্লাসিকাল আরবি ভাষা, ইসলামিক ফিক্‌হ এবং হাদিস শাস্ত্রের উপর পড়াশোনা করেন।

তার বাবার মৃত্যুর পর  বাবার রেখে যাওয়া বিশাল সম্পত্তির মালিক হন তিনি ও তার বোন মরিয়ম আল ফিহরি। তারা দুইজনেই ঠিক করেন, তারা তাদের প্রাপ্ত অর্থ জনকল্যাণমূলক কাজে খরচ করবেন। কিন্তু কি করা যায়, সেই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে তারা দেখলেন, ফেজ শহরে দেশ বিদেশ থেকে অনেক মুসলমান আসছে, কিন্তু ফেজ এর কেন্দ্রীয় মসজিদে তাদের জায়গা সংকুলান হচ্ছে না। তাই তারা দুই বোন সিদ্ধান্ত নেন, বাবার রেখে যাওয়া এই সম্পদ দিয়ে তারা মসজিদ নির্মাণ করবেন। 

প্রায় কাছাকাছি সময়ে দুই বোন কাছাকাছি এলাকায় দুটি পৃথক মসজিদ নির্মাণ করেন। মারিয়াম নির্মাণ করেন আন্দালুস মসজিদ, আর ফাতিমা নির্মাণ করেন কারাউইন মসজিদ। 

                                        চিত্রঃ মসজিদ আল- কারাউইন

৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে, এই ফেজ নগরী তেই ফাতিমা তার ভাগের সমস্ত অর্থ দিয়ে একটি মসজিদ নির্মাণ এর কাজ শুরু করেন। অর্থ দানের পাশাপাশি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সার্বক্ষণিক তদারকির ভিত্তিতে এই মসজিদ টি নির্মাণ করেন ফাতিমা।

অনেকের বর্ণনা অনুযায়ী, মসজিদটির নির্মাণ সম্পন্ন হতে সময় লেগেছিল ১৮ বছর, যদিও কিছু কিছু বর্ণনায় ১১ বছর এবং ২ বছরের উল্লেখ আছে। যেদিন নির্মাণ শেষ হয়, সেদিন তিনি নিজের নির্মিত মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে নামাজ আদায় করেন এবং আল্লাহ্‌র প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। জন্মভূমি কাইরাওয়ানের নামানুসারে তিনি মসজিদটির নাম রাখেন ‘কারাউইন মসজিদ’।  তৎকালীন সময়ে ‘মসজিদ আল- কারাউইন’ দীর্ঘদিন পর্যন্ত সমগ্র উত্তর আফ্রিকার বৃহত্তম মসজিদ ছিল। এখানে একসাথে প্রায়  ২২ হাজার মানুষ নামাজ পড়তে পারত। কেবল ইবাদতের স্থান না হয়ে এই মসজিদ শিগগিরই হয়ে ওঠে ধর্মীয় নির্দেশনা ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্র। 

শুরুতে এই মসজিদ টি একটি ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে গড়ে উঠলেও পরে সেখানে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে পারিপার্শ্বিক বিষয়াদি পড়ানো হয়। অল্প সময়ে এর ছাত্রসংখ্যা দাঁড়ায় আট হাজারে। কুরআন, হাদীস ও ইসলামী আইনশাস্ত্রের পাশাপাশি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল, জ্যোর্তিবিজ্ঞান, ব্যাকরণ, রসায়ন, চিকিৎসাশাস্ত্র, গণিত, সংগীতসহ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে পাঠদান করা হত। বিষয়ভিত্তিক অধ্যয়নের প্রসারতার কারণে শীঘ্রই এর খ্যাতি সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পরে। অনায়াসেই এই মসজিদ টি  মসজিদের সাথে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়। 

                            চিত্রঃ কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয় 

মুসলমানদের পাশাপাশি অনেক অমুসলিম জ্ঞানসাধকও এই বিশ্ববিদ্যালয় হতে শিক্ষাগ্রহণ করেন।  এই বিশ্ববিদ্যালয় ভূমধ্যসাগর অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হত।

ইতালির বোলোনায় প্রথম ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়ার ও অনেক বছর আগে কারাউইন হয়ে ওঠে বিশ্ব বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়। 

অনেক বিখ্যাত মুসলমান পণ্ডিত এবং দার্শনিক এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। বিখ্যাত মালিকি বিচারপতি ইবনে আল-আরাবি, অগ্রণায়ন পণ্ডিত ইবনে মাইমুন, ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন, জ্যোতির্বিদ নূরুদ্দীন আল-বিতরুজি (অ্যালপে ট্রেজিয়াম), আল-ইদ্রিসি, ইবনে খতিব, ইবনে হিরজিহিম ও আল ওয়্যাজ্জেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র বা শিক্ষক ছিলেন।

শুধু মুসলমান নয়, মধ্যযুগের অনেক খ্যাতিমান ইহুদি এবং খ্রিস্টান মনীষীও এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করেছেন। এর ছাত্রদের মধ্যে একজন হলেন, পোপ দ্বিতীয় সিলভাস্টার, যিনি এখান থেকে আরবি সংখ্যাপদ্ধতি বিষয়ে ধারণা লাভ করে সেই জ্ঞান ইউরোপে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং ইউরোপীয়দেরকে প্রথম শূন্যের (০) ধারণার সাথে পরিচিত করেছিলেন।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম অমুসলিম অ্যালামনি ছিলেন- ইহুদি দার্শনিক ও ধর্মতত্ত্ববিদ মুসা বিন মাইমুন বা মাইমোনাইডস।

কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি কে বিশ্বের প্রাচীনতম লাইব্রেরি হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৩২৩ সালে, এই লাইব্রেরির অনেক পাণ্ডুলিপি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নষ্ট হয়ে গেছে। এখনও এতে প্রায় ৪,০০০ প্রাচীন এবং দুর্লভ পাণ্ডুলিপি আছে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, নবম শতকে লেখা একটি কুরআন শরিফ, হাদিসের সংকলন, ইমাম মালিকের গ্রন্থ মুয়াত্তা, ইবনে ইসহাকের লেখা রাসুল (সা)-এর জীবনী, ইবনে খালদুনের লেখা কিতাব আল-ইবার এবং আল-মুকাদ্দিমার মূল পাণ্ডুলিপিসহ বিভিন্ন দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ।

৮৮০ খ্রিস্টাব্দে, ফাতিমা আল-ফিহরি ইন্তেকাল করেন। তার ইন্তেকালের ১১৪১ বছর পার হলেও তার প্রতিষ্ঠিত আল কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো শিক্ষাকার্যক্রম চলমান। তার প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিগত বছরগুলোতে লক্ষাধিক শিক্ষার্থী পাশ করে বেরিয়েছে। মরক্কোর প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের মধ্যে আল কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম। মরক্কোর নারীদের কাছে এখনো ফাতেমা একজন অনুসরণীয় অনুপ্রেরণাদানকারী নারীর আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছেন।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button