সংবাদসাম্প্রতিক

আবদুল কাদের মির্জাঃ রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় যে কারণে

আবদুল কাদের মির্জা, সাম্প্রতিক সময়ে অত্যন্ত আলোচিত এই ব্যক্তি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছোটভাই। 

গত ১৬ জানুয়ারি, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট পৌরসভার মেয়র নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চেয়ে ছয়গুণ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। বসুরহাট পৌরসভার ৯টি কেন্দ্রে আবদুল কাদের মির্জা পেয়েছেন ১০ হাজার ৭৩৮ ভোট। আর তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির কামাল উদ্দিন চৌধুরী পেয়েছেন ১ হাজার ৭৭৮ ভোট। অন্যদিকে মেয়র পদের অপর প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর মুহাম্মদ মোশারফ হোসেন পেয়েছেন ১ হাজার ৪৫১ ভোট।

এ নিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো পৌর মেয়র হলেন আবদুল কাদের মির্জা।

সম্প্রতি বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ধরনের বক্তৃতা দিয়ে আলোচনায় এসেছেন এই ব্যক্তি।তার সাম্প্রতিক জ্বালাময়ী বক্তব্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

আবদুল কাদের মির্জা নির্বাচনী ব্যবস্থা, দুর্নীতি এবং নোয়াখালী অঞ্চলের আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব-অসংগতি নিয়ে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন গত ডিসেম্বর থেকেই।

কিন্তু আওয়ামী লীগের একটি উপজেলার একজন নেতা হয়ে তার বক্তব্য নিয়ে দেশজুড়ে কেনো এত তোলপাড় হচ্ছে – এই প্রশ্ন টি জাগছে সবার মনে।

গত ২১ জানুয়ারি, নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরীর একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়। যেখানে তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও তার পরিবার কে রাজাকার বলে আখ্যায়িত করতে দেখা যায়। এ ঘটনার প্রতিবাদে গত ২২ জানুয়ারি দুপুর থেকে বসুরহাট বাজারের বঙ্গবন্ধু চত্বরে কর্মসূচি করেছেন আবদুল কাদের মির্জা। এলাকাবাসী ও সেখানে বিক্ষোভ করছেন।

পরবর্তীতে মির্জা কাদের জানান, নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি ভেঙে না দেওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

যদিও পরবর্তীতে, একরামুল করিম চৌধুরী ওবায়দুল কাদেরের ব্যাপারে বক্তব্য নিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু সেইসাথে তিনি কাদের মির্জার বক্তব্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

কিন্তু একটি জেলার অভ্যন্তরীণ ঝামেলা কে কেন্দ্র করে উপজেলার একজন নেতার বক্তব্য নিয়ে দেশজুড়ে কেন আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে – আওয়ামী লীগের ভেতরেও এই প্রশ্নে নানা আলোচনা রয়েছে।

অনেকের মতে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ভাই হওয়ার কারণেই আলোচনায় এসেছেন আবদুল কাদের মির্জা। 

আবার অনেকেই ভিন্নধর্মী বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। আবদুল কাদের মির্জা, তার বক্তব্যের বিষয়বস্তুর কারণে জাতীয় রাজনীতিতে তোলপাড় ফেলেছেন বলে তারা মনে করেন।

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাট পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে নির্বাচনী পথসভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় বড়ভাই ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওবায়দুল কাদের তাকে বড় নেতা হতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেন, ‘ছাত্র জীবনে আমি ঢাকায় ভর্তি হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু, তিনি আমাকে চট্টগ্রামে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।… ওবায়দুল কাদেরের ধারণা ছিল আমি ঢাকায় পড়াশোনা করে রাজনীতি করলে হয়তা তার চেয়ে বড় নেতা হয়ে যাব। তাই তিনি চাননি আমি ঢাকায় পড়াশোনা করি’।

তিনি আরো বলেন, ‘এ লোক আমাকে পাগল-উন্মাদ বলে। আমি কি পাগল-উন্মাদ? আমি যখন অন্যায়ের প্রতিবাদ করি, নোয়াখালী, ফেনীর অপরাজনীতির কথা প্রতিবাদ করি, ভোট কারচুপির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করি, আমি আমার এলাকার মানুষের ন্যায্য অধিকার, গ্যাসের অধিকারের জন্য আমি কথা বলি, আমার এলাকার যেখানে গ্যাস পাওয়া গিয়েছে সেটার নাম শাহজাদপুর, হাবিবপুর। আজ সেখানে সুন্দলপুর গ্যাসক্ষেত্র লেখা হয়। আমি এর প্রতিবাদ করি।’

সম্প্রতি ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য নিক্সন চৌধুরীর বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগ এনেছেন আবদুল কাদের মির্জা। এ বক্তব্যের বিপরীতে আবদুল কাদের মির্জার বক্তব্য কে ‘পাগলের প্রলাপ’ এবং আবদুল কাদের মির্জা কে ‘টোকাই মেয়র’ বলে আখ্যায়িত করেন নিক্সন চৌধুরী। 

মির্জা কাদেরের অব্যাহত বক্তব্য নিয়ে নোয়াখালীতে আওয়ামী লীগ এর ২ টি পক্ষ অবস্থান নেয়। যেখানে একটি  দল তার সমর্থক এবং একটি দল কে তার বিরোধিতা করতে দেখা যায়।

বিশ্লেষকদের মধ্যে অনেকে মনে করেন, কাদের মির্জার বক্তব্যে নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং দুর্নীতির চিত্র যেমন এসেছে, তেমনি আওয়ামী লীগের এমপিদের অনেকের কর্মকাণ্ড ও দলটির সাংগঠনিক চেহারা ফুটে উঠেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জিনাত হুদা তার এক বক্তব্যে বলেছেন, ”তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের ভাই, সেটা একটা বিষয় অবশ্যই। এছাড়া তিনি যে বক্তব্যগুলো দিচ্ছেন, সেগুলোর সত্য-মিথ্যা বিচারের ভার হয়তো জনগণ এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের ওপর পড়বে। কিন্তু বিষয়বস্তুটাও একটা বিষয়। কারণ তিনি খোলামেলাভাবে নানা কথা বলছেন।” 

পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ফজলুল হক প্রাইমারি স্কুল প্রাঙ্গনে বক্তৃতা প্রদানকালে কাদের মির্জা বলেন, ‘আমি নির্বাচন কমিশনার শাহদাত হোসেন চৌধুরী সাহেবকে বলেছি, নিরপেক্ষ ভোট করে দেওয়ার জন্য। প্রশাসন আমার বিরুদ্ধে। আমি তাদের গোমর ফাঁস করে দিয়েছি। কিছু লোকের থেকে তারা মাসোয়ারা খায়, তবে সবাই খারাপ এটাও ঠিক নয়। প্রশাসন আজ মনে করে, শেখ হাসিনাকে আমরা বানাইছি, যা ইচ্ছা তাই করবো। রাজনৈতিক নেতাদের দুর্নীতির বিচার হয়, এতে মানুষ খুশি। কিন্তু প্রশাসনের লোক যে এটার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিচার হয় না।’

মেয়র প্রার্থী আবদুল কাদের মির্জা আরও বলেন, ‘গরিব মানুষ সরকারি অফিসে গেলে ২/৩ হাজার টাকা দিতে হয়। আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলায় কেউ কেউ আমাকে বলে ঢাকায় গিয়ে চিকিৎসা নিয়ে আসতে। আমি কি পাগল হয়ে গেছি? একজন পুলিশ কত টাকা বেতন পায়? চাকরি নিতে তাকে ৫ লাখ টাকা দিতে হয়। একজন স্কুলের পিয়নকে চাকরি নিতে ৫ লাখ টাকা দিতে হয়। সর্বত্র অনিয়ম। কবিরহাটে আমাদের কর্মীদের দিকে তাকানো যায় না। ৪/৫ জন সব লুট করে খাচ্ছে। এই কথাগুলো আমি বললে অপরাধ।’

প্রস্তাবিত জেলা কমিটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমরা যদি সত্যিকারের কাজের লোকের মূল্যায়ন না করি তাহলে, বাজে লোকের সৃষ্টি হবে। ত্যাগী লোকের স্বীকৃতি না দিলে ত্যাগী লোকের সৃষ্টি হবে না।’

তিনি  সাহস করে সত্য কথা বলছেন এবং মৃত্যুর আগে পর্যন্ত বলবেন, বলে জানান তিনি।

যদিও আওয়ামী লীগ এর কতিপয় নেতারা আবদুল কাদের মির্জার বক্তব্যে অসন্তোষ প্রকাশ করে তাকে থামানো এবং বিষয়টি  সমাধানের চেষ্টার কথা বলছেন।

কিন্তু আব্দুল কাদের মির্জা তার বক্তব্য অব্যাহত রাখবেন এবং নোয়াখালী জেলায় আওয়ামী লীগের অনেকের অপরাজনীতির বিরুদ্ধে তিনি তার বক্তব্য দিয়ে যাবেন, বলে জানিয়েছেন তিনি।

তথ্যসূত্রঃ 

১. যুগান্তর 

২. বাংলা ট্রিবিউন 

৩. বিবিসি বাংলা, ঢাকা

৪. দ্য ডেইলি স্টার

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button