ইতিহাসজানা-অজানাপ্রযুক্তি

বিশ্বখ্যাত মোটরসাইকেল ব্র‍্যান্ড দ্য “রয়েল এনফিল্ড” এর গল্প

ষাট বছরের বৃদ্ধ হোক চাই বিশ বছরের তরুণ হোক সকলেরই বাহন হিসেবে পছন্দের তালিকায় প্রথম দিকেই থাকে দু’চাকা চালিত মোটরযান । সকল ধরণের পরিবেশের সাথে মানানসই নিম্ন-মধ্য-উচ্চ বিত্ত সকল মানুষেরই ক্রয়সাধ্যের মধ্যেই থাকায় গ্রামে-গঞ্জে বা শহরে সবখানেই সমান জনপ্রিয় মোটরসাইকেল। আর এই মোটরযান দুনিয়াতে অপরাজেয় তারার মতো জ্বলজ্বল করে “রয়েল এনফিল্ড” নামটি।

ইউরোপ,আমেরিকা সহ বিশ্বের ৫০ টিরো অধিক দেশে রপ্তানি করা এ বাইক কোম্পানিটি গ্লোবাল সেলে ২০১৫ সালেই বিশ্বখ্যাত ‘হার্লে ডেভিডসন’ কেও টপকে যায়। সারা বিশ্বে হার্লে ডেভিডসন যত বাইক বিক্রি করে এ কোম্পানিটি শুধু ভারতেই এর চেয়ে অধিক বাইক বিক্রি করে। বিশ্বজুড়ে এতটা জনপ্রিয়তা পাওয়া এ বাইক কোম্পানিটি ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে এতটাই আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে গেছে যে অনেকেই জানে না এটা ভারতীয় নয় ব্রিটিশ এক কোম্পানি। অদ্ভূতভাবে ভারতীয়রা একে স্বদেশী পণ্য হিসেবেই মনে করে থাকে।

রয়েল এনফিল্ডের মূল শিকড় যুক্তরাজ্যে। কোম্পানিটি সাফল্যের মুখ দেখে ভারতে আসার পর। ঐতিহ্যবাহী এ মোটর সাইকেল ব্র‍্যান্ডটির বয়স ১২০ বছরেরও বেশি। গল্পটি শুরু হয় ১৮৫১ সালে জর্জ টাউনসেন্ড নামে এক ব্যবসায়ী যখন সেলাই মেশিনে ব্যবহৃত সূচের কারখানা দেন। ১৮৮২ সালে টাউনসেন্ডের ছেলে এই কারখানার অব্যবহৃত যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সাইকেলের স্যাডেল ও ফর্ক তৈরি শুরু করেন। এ ব্যবসায় তিনি সাফল্যের মুখ দেখলে ১৮৮৬ সালে “টাউনসেন্ড এন্ড একোসাইস” কোম্পানি নাম দিয়ে বাইসাইকেল উৎপাদন শুরু করেন। দূর্ভাগ্যবশত তৎকালীন বাইসাইকেলের বাজারে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বীতা থাকায় কোম্পানিটি লসের সম্মুক্ষীন হয়। তখন টাউনসেন্ডের পরামর্শকদের পরামর্শ অনুযায়ী টাউনসেন্ড আলবার্ট এডি নামে একজন সেলস ম্যানেজার এবং রবার্ট ওয়াকার স্মিথ নামে একজন ইঞ্জিনিয়ারের কাছে কোম্পানিটি ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব তুলে দেন।

যোগদানের পর ১৮৯২ সালে আলবার্ট এডি কোম্পানিটির নাম বদলে রাখেন ‘এডি ম্যানুফাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড’। কারখানাটিতে তিনি নানা সুক্ষ যন্ত্রপাতি তৈরির মেশিন স্থাপন করেন। ১৮৯৬ সালে এডি মিডলসেক্সের এনফিল্ড শহরে অবস্থিত “রয়্যাল স্মল আর্মস ফ্যাক্টরির” জন্য যন্ত্রপাতি তৈরির কাজ পান। এখান থেকেই “রয়্যাল এনফিল্ড” নামটির জন্ম হয়। সে বছরই তারা ‘নিউ এনফিল্ড সাইকেল কোম্পানি লিমিটেড ‘ নামে একটি সাইকেল কোম্পানি কিনে নেয় এবং ১৮৯৭ সাল থেকেই সাইকেলে ব্যবহৃত সকল ধরণের যন্ত্রপাতি উৎপাদন শুরু করে।

ধীরে ধীরে যখন মোটর দ্বারা চালিত সাইকেল ইংল্যান্ডে জনপ্রিয়তা পেতে থাকে তখন তারাও এ ধরণের মোটর সাইকেল উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেয়।  এবং ১৯০১ সালে তাদের প্রথম মোটর সাইকেল বাজার আনে। এরপর তারা কোম্পানিটিকে নিয়ে ভিন্ন এক পথে আগানোর চেষ্টা করে। তারা পরিকল্পনা করে তারা চার চাকার বাজার দখল করবে । এরই ফলশ্রুতিতে তারা ১৯০২ সালে একটি মোটরগাড়ি বানায় এবং ১৯০৬ সালে একটি অটোকার কোম্পানি স্থাপন করে। কিন্তু মাত্র ১৯ মাস পরই অতি-লোকসানের কারণে মোটরগাড়ির পথ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয় কোম্পানিটি এবং নিজেদের সমস্ত সম্পদ, মেধা, শ্রম লাগিয়ে দেয় দু’চাকার মোটর যানের পিছনে। 

১৯১০ থেকে ১৩ সালে তাদের উৎপাদিত বেশ কয়েকটি মডেল বাজারে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে তারা টেকসই এবং যুদ্ধকালীন সময়ে সাবমেশিনগান ব্যবহারের কথা মাথায় রেখে যানটির পাশে একটি সাইড কার সংযোজন করে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী এবং ইম্পেরিয়াল রুশ সরকারের কাছে মোটর সাইকেল সরবরাহ করতে থাকে।

১৯২১ থেকে ৩০ এর দশকে তারা কয়েকটি ইঞ্জিনের ডেভেলপিং ছাড়াও তাদের ডিজাইনিংকে আরো চমপ্রদ করতে থাকে এবং আজকালকার সময়ে বাইকে যে ধরণের ফুয়েল ট্যাংক ডিজাইন করা হয় তারও সূচনা হয় সে সময়টাতেই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে ব্রিটিশ সরকার আবারো রয়েল এনফিল্ড এর সাথে চুক্তি করে। এবার তারা মিলিটারি গ্রেড মোটর বাইক উৎপাদন শুরু করে। এর মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয়তা লাভ করে wd/re মডেল, যাকে প্লেন থেকে প্যারাসুটের মাধ্যমে নিচে ফেলার জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছিল। যুদ্ধ পরবর্তী সময় ১৯৪৬-৫৪ এ সময়টাতে তারা বেশকিছু যুগান্তকারী মডেলের জন্ম দেয় যার মধ্যে ‘বুলেট’ অন্যতম। বুলেটের ৩৫০ ও ৫০০ সিসির বাইক দুটি খুব শিঘ্রই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা স্পর্শ করে৷

রয়েল এনফিল্ডের সাফল্যের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয় ব্রিটিশ সরকারের সে সময়কার বাইক লাইসেন্স আইনকে। যা ১৬ বছরের অধিক বয়সী যেকাওকে ২৫০ সিসি বাইক চালানোর অনুমতি দেয় শুধুমাত্র একটি লার্নার লাইসেন্স থাকার মাধ্যমে! এই বাইকগুলো আকারে ছিলো ছোট এবং দামেও সহজলভ্য। 

শুরুর দিকে লসের মুখ দেখা রয়েল এনফিল্ড আকাশ চুম্বী জনপ্রিয়তা পায় মূলত ভারত আসার পর৷ ভারত স্বাধীন হওয়ার পর মাদ্রাজ এনফিল্ড তাদের যাত্রা শুরু করে। ভারতের এ সময়কালে প্রয়োজন ছিলো বিশাল সীমানা পাহাড়া দেয়ার জন্য সকল পরিবেশে টেকসই এবং দ্রুতগতি সম্পন্ন মোটর বাইক। যারই ফলশ্রুতিতে ভারত সরকার কোম্পানিটি থেকে ৩৫০ সিসির বুলেট প্রায় ৮০০ ইউনিট অর্ডার করে।

শুরুরদিকে ভারতে শুধুমাত্র বাইক এসেম্বল হলেও ৬২’র পরে পুরো ম্যানুফাকচারিং এর কাজই হতে থাকে দেশটিতে। এরপর কোম্পানিটিকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ৯০ এর দশক থেকে কোম্পানিটি আইসার মোটরসের সাথে একত্রে উৎপাদন শুরু করে।

রয়েল এনফিল্ড বাইকের সবচেয় বড় বাজার ভারত। উচ্চগতি এবং মাইলেজ সম্পন্ন এ গাড়িটি এখন পর্যন্ত ২৫০ থেকে ৭০০ সিসি পর্যন্ত মডেল বের করেছে। ফুয়েল এফিসিয়েন্সি, সকল পরিবেশে ব্যবহারযোগ্য এ বাইকটি বাইকারদের অন্যতম পছন্দ।

বিশ্বজোড়া বহু সেলিব্রেটি সহ ভারতীয় চলচিত্র-বিজ্ঞাপনে বাইকটিকে অতিমাত্রায় ব্যবহার বাইকটিকে এনে দিয়েছে এক আভিজাত্যের প্রতীক। রয়েল এনফিল্ড এমনই একটি ব্র‍্যান্ড যেটি পেয়েছে বিশ্বজোড়া খ্যাতি। বাংলাদেশে ১৭৫ সিসির অধিক গাড়ি নিষিদ্ধ হওয়ায় বৈধভাবে এতদিন যাবৎ বাংলাদেশীরা এ গাড়ির স্বাদ খুব একটা নিতে পারে নি। তবে শোনা যাচ্ছে খুব শীঘ্রই বাংলাদেশ সরকার সিসি ‘র উপর থেকে এ নিষেধাজ্ঞা তুলে দিতে যাচ্ছে যার ফলে হয়ত ইফাদ মটোরস এর হাত ধরে মে মাস থেকেই বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করবে দ্য “রয়েল এনফিল্ড”।

মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ খাঁন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

আরো পড়ুন;

ভুলে যাওয়া ঢাবির কারিগরঃ নবাব সলিমুল্লাহ – https://cutt.ly/GjXsbaa

১৫৪ বার ‘ধুম থ্রি’ দেখে ব্যাংক ডাকাতি করতে যাওয়া বাংলার বিস্ময় বালক – https://cutt.ly/ajM9

Show More

MK Muhib

A researcher,An analyst,A writer,A social media activist,student at University of dhaka.

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button