ইতিহাস

ময়মনসিংহ জেলার ইতিহাস

ময়মনসিংহ জেলা বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলের ময়মনসিংহ বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। হাওর জঙ্গল মইষের শিং, এই তিনে ময়মনসিং’ প্রবাদ-প্রবচনে এভাবেই পরিচয় করানো হতো এক সময় ভারতবর্ষের বৃহত্তম জেলা ময়মনসিংহকে।

বর্তমানে এই জেলার মোট আয়তন ৪,৩৬৩.৪৮ বর্গ কিলোমিটার। ভূ-তত্ত্ববিদদের মতে, বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা আদি ব্রহ্মপুত্রের পলিজ অবক্ষয়ের দ্বারা গঠিত।

ময়মনসিংহ জেলার উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য, দক্ষিণে গাজীপুর জেলা, পূর্বে নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলা এবং পশ্চিমে শেরপুর, জামালপুর ও টাঙ্গাইল জেলা অবস্থিত। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, এই জেলার মোট জনসংখ্যা ৫৩,৩০,২৭২ জন। 

                   চিত্রঃ বাংলাদেশ এর মানচিত্রে ময়মনসিংহ জেলা            

প্রশাসনিক পটভূমি

ময়মনসিংহ বাংলাদেশের একটি পুরোনো জেলা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে রাজস্ব আদায়, প্রশাসনিক সুবিধা বৃদ্ধি এবং বিশেষ করে স্থানীয় বিদ্রোহ দমনের উদ্দ্যেশ্যে এই জেলা গঠন করা হয়। ১৭৮৭ সালের ১ মে, এই জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে এখনকার বেগুনবাড়ির কোম্পানিকুঠিতে জেলার কাজ শুরু হয় তবে। পরবর্তী সময়ে সেহড়া মৌজায় ১৭৯১ সালে তা স্থানান্তরিত হয়।

ময়মনসিংহ জেলা তৎকালীন ভারত উপ-মহাদেশের বৃহত্তম জেলা ছিলো। সময়ের সাথে সাথে এই জেলার আয়তনের পরিবর্তন হয়েছে।

১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে, ময়মনসিংহ জেলা থেকে টাঙ্গাইল মহুকুমাকে পৃথক করে একটি জেলা উন্নীত করা হয়। ১৯৮০-এর দশকে, আদি ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন মহকুমা যথাঃ ১৮৪৫ সালে জামালপুর, ১৮৬০ সালে কিশোরগঞ্জ, ১৮৬৯ সালে টাঙ্গাইল ও ১৮৮২ সালে নেত্রকোনা মহকুমা গঠন করা হয়। পরে সবকটি মহকুমা জেলায় উন্নীত হয়। এর আগে ব্রিটিশ আমলে ময়মনসিংহ জেলার কিছু কিছু অংশ সিলেট, ঢাকা, রংপুর ও পাবনা জেলার অঙ্গীভূত করা হয়েছিল। এই ভাবে ময়মনসিংহ জেলা যা কিনা ব্রিটিশ আমলে অবিভক্ত ভারতবর্ষের সর্ববৃহৎ জেলা ছিল তার আকার ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে আসে।

ময়মনসিংহ জেলা ১২টি উপজেলা, ১৩টি থানা, ১০টি পৌরসভা, ১৪৬টি ইউনিয়ন, ২২০১টি মৌজা ও ২৭০৯টি গ্রাম নিয়ে গঠিত।

নামকরণের ইতিহাস

ময়মনসিংহ জেলার নাম নিয়ে ইতিহাসবিদদের মাঝে ভিন্ন মত প্রচলিত আছে। 

ময়মনসিংহ শহরের পূর্ব নাম ছিল নাসিরাবাদ। ষোড়শ শতাব্দীতে, বাংলার স্বতন্ত্র সুলতান সৈয়দ আলাউদ্দিন হুসেন শাহ তার পুত্র সৈয়দ নাসির উদ্দিন নসরত শাহের জন্য এই অঞ্চলে একটি নতুন রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাই নুসরাতশাহী বা নাসিরাবাদ নামকরণ করেছিলেন। মুসলিম যুগের উৎস হিসাবে নাসিরাবাদ নামটি আজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাদে কোথাও উল্লেখ করা যায় না।

আদিতে ময়মনসিংহের নাম ছিল ‘মােমনশাহী’।  কথিত আছে, মােগল সম্রাট আকবরের সময় ‘মমিনশাহ’ নামে কোনাে ব্যক্তি মােগল সাম্রাজ্যের অধীনস্থ বাজুহার এলাকার অধীশ্বর ছিলেন। সেই মমিনশাহ থেকে তার অধীনস্ত মহালের নাম মমিনশাহী হয়েছিল। 

মােমনশাহীর ‘শাহী’ শব্দই লিপি বিড়ম্বনায় অষ্টাদশ শতাব্দীতে সিংহ রূপ ধারণ করে ক্রমে বর্তমানে একেবারে ময়মনসিংহে পরিণত হয়েছে।

আবার অনেকে মনে করেন যে, ময়মনসিংহের নাম সম্রাট আকবরের প্রধান সেনাপতি মান সিংহ-এর নামে রাখা হয়েছিল। সম্রাট আকবর বারো ভূঁইয়ার প্রধান ইশা খানকে পরাস্ত করতে জেনারেল মান সিংহ কে এই অঞ্চলে প্রেরণ করেছিলেন।

তবে এই জায়গার ইংরেজি নাম Mymensingh; এই অঞ্চলের নামকরণ সম্পর্কে কিছু ধারণা দেয়। My অর্থ আমি, Men অর্থ মানুষেরা, Singh অর্থ গান গায়। এই অঞ্চলের লোকেরা সাংস্কৃতিক অঙ্গনে খুব ভাল ছিল। ইংরেজরা তাদের শাসনামলে এই এলাকার নাম  দিয়েছে এভাবে।

কিন্তু ৭৭৯-তে প্রকাশিত রেনেল এর ম্যাপে ‘মোমেসিং’ নামটি বর্তমান ’ময়মনসিংহ’ অঞ্চলকেই নির্দেশ করে। তার আগে আইন-ই-আকবরীতে ‘মিহমানশাহী’ এবং ‘মনমনিসিংহ’ সরকার বাজুহার পরগনা হিসাবে লিখিত আছে; যা বর্তমান ময়মনসিংহকেই ধরা যায়।

এসব বিবেচনায় বলা যায়, সম্রাট আকবরের রাজত্ব কালের পূর্ব থেকেই ময়মনসিংহ নামটি প্রচলিত ছিলো।

মুক্তিযুদ্ধে ময়মনসিংহ জেলা

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের বহু ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে এই ময়মনসিংহ জেলা।

২৫শে মার্চের পর, ফুলবাড়ীয়া উপজেলায় মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে ওঠে। ১৭ এপ্রিল, পাকবাহিনীর দুটি জঙ্গি বিমান গফরগাঁও উপজেলায় মেশিনগান দিয়ে গুলি করে ১৯ জন নিরীহ লোককে হত্যা করে এবং শতাধিক আহত হয়। ২১শে এপ্রিল, পাকবাহিনী নান্দাইল উপজেলার ১৮ জন গ্রামবাসিকে হত্যা করে কয়েকশ বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়। ২৩শে এপ্রিলের পর, পাকবাহিনী ময়মনসিংহ সদর উপজেলার শহর দখল করে নেয়। একই দিনে মুক্তাগাছা উপজেলায় পাকবাহিনীর প্রবেশপথে মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ৭ জুন, ত্রিশাল উপজেলায় মুক্তিবাহিনীর হাতে প্রায় অর্ধশত পাকসেনা নিহত হয়। ১৯শে জুলাই, ধোবাউড়া উপজেলায় পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধে দুজন মুক্তিযোদ্ধাসহ এগারো জন শহীদ হন। ৬ আগস্ট, হালুয়াঘাট উপজেলার বান্দরকাটা ক্যাম্পে সম্মুখ লড়াইয়ে দুই মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। আগস্ট মাসে ত্রিশাল উপজেলায় লড়াইয়ে দু’জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ভাংনামারি চরে পাকসেনাদের সঙ্গে লড়াই এ একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ৩রা অক্টোবর, পাকবাহিনী ধোবাউড়া উপজেলায়  মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে গভীর রাতে অতর্কিত হামলা চালালে ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। পরদিন পাকবাহিনী গোয়াতলা বাজার ও তারাইকান্দি ফেরিঘাটে গণহত্যা চালালে প্রায় ১২০ জন শহীদ হন। ৩ নভেম্বর, হালুয়াঘাট উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধারা গভীর রাতে পাকসেনাদের সুরক্ষিত তেলীখালির ঘাঁটিতে আক্রমণ করে ১২১ জন পাকসেনাকে হত্যা করে এবং ২৬ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ১৭ নভেম্বর, নান্দাইল উপজেলায় পাকবাহিনীর সঙ্গে এক লড়াইয়ে মুক্তিযোদ্ধাসহ বেশ কয়েকজন স্থানীয় লোক শহীদ হন। উক্ত দিনটি ’নান্দাইল শহীদ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। ভালুকা উপজেলার ১১ নং সেক্টরের সাব সেক্টর কমান্ডার আফসার উদ্দিন আহমদ মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দিয়ে অস্ত্র সংগ্রহ করে পাকবাহিনীর মোকাবিলা করেন। ফুলবাড়ীয়া উপজেলার লক্ষ্মীপুরে পাকবাহিনীর সাথে মুক্তিবাহিনীর লড়াই এ ৭০ জন নিহত হয়। ময়মনসিংহ সদর উপজেলার দিঘারকান্দা গ্রামে পাকবাহিনী রাতে আক্রমণ করলে গ্রামবাসিরা সড়কি, বলম, দা, লাঠি দিয়ে তাদের প্রতিহত করে। এতে একজন পাক মেজর নিহত হয়। পরদিন ওই গ্রামে পাকবাহিনীর আক্রমণে অনেক গ্রামবাসি নিহত হন। এছাড়া ছনধরা ইউনিয়নের পাকবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর মধ্যে সম্মুখ লড়াইয়ে ৩৩ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ত্রিশাল উপজেলার রায়ের গ্রামে পাকবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর লড়াইয়ে ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এছাড়া পাকসেনারা এ জেলার বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্প স্থাপন করে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে নির্যাতন, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায়।

দর্শনীয় স্থান

ময়মনসিংহ জেলার অন্যতম দর্শনীয় স্থান হলো মুক্তাগাছার রাজবাড়ী, ময়মনসিংহ জাদুঘর, আলেকজান্ডার ক্যাসল, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা, রামগোপালপুর জমিদার বাড়ি, কাদিগড় জাতীয় উদ্যান, বোটানিক্যাল গার্ডেন (বাকৃবি), স্বাধীনতা স্তম্ভ বা মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ, শশীলজ, গৌরীপুর লজ, গারো পাহাড়, নজরুল স্মৃতি যাদুঘর, গৌরীপুর জমিদার বাড়ি, শহীদ আব্দুল জব্বার জাদুঘর ইত্যাদি।

                     চিত্রঃ মুক্তগাছা রাজবাড়ী 

                                         চিত্রঃ শশীলজ

উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব

ময়মনসিংহ জেলা টি বাংলাদেশ এর বহু কৃতি সন্তানের জন্মস্থান হিসেবে বহুল আলোচিত।  তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন;উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী; সুকুমার রায়;  আবদুল জব্বার; শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়; জগদীশ চন্দ্র বসু; হুমায়ূন আহমেদ; যতীন সরকার; আবুল মনসুর আহমেদ; জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা; আশীষ কুমার লোহ; কেদারনাথ মজুমদার; হেমেন্দ্রকিশোর আচার্য চৌধুরী; প্রতুল ভট্টাচার্য; তসলিমা নাসরিন; মিতালী মুখার্জী; মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ। 

তথ্যসূত্রঃ

১. বাংলাপিডিয়া 

২. বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন 

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button