ইতিহাসজাতীয়

বাকশালঃ বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বাধিক বিতর্কিত রাজনৈতিক মতবাদ

বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বাধিক বিতর্কিত রাজনৈতিক মতবাদের অন্যতম “বাকশাল” মতবাদ। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগ দলের অন্যতম কালো অধ্যায় হিসেবেও ভাবা হয়ে থাকে এ ‘বাকশাল’ বিতর্ককে । বিরোধী মতবাদে বিশ্বাসীরা এ শব্দকে ব্যবহার করে থাকেন তাদের অন্যতম শব্দবান হিসেবে। বলে থাকেন শেখ মুজিব স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও শাসনকাল কে চিরস্থায়ী করতেই প্রণয়ন করেছিলেন এ প্রথা।

এ বিষয়কে ইতিহাসের কালো অধ্যায়রূপে বিবেচনা করা হলেও অধিকাংশ বাঙালিই এ সম্পর্কে অজ্ঞ। আসলেই কি ‘বাকশাল’ স্বৈরতন্ত্র ছিল?বাকশাল আদতে কি?

 বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি,  জাতীয় আওয়ামী পার্টি (মোজাফফর) এবং জাতীয় লীগ নিয়ে গঠিত একটি রাজনৈতিক ফ্রন্ট ছিল এ বাকশাল। যার পুরো নাম হলো “বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ”। আওয়ামী মানে এখানে জনতা বুঝানো হয়েছে।

১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীবলে বহুদলীয় সংসদীয় সরকার পদ্ধতি পরিবর্তন করে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয় এবং দেশের সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে বাকশাল নামক এই একক রাজনৈতিক দল গঠন করা হয়। যেখানে আওয়ামী লীগ সহ সকল ধরণের রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হয়।

বহুদলীয় সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে একদলীয় সরকার ব্যবস্থা প্রণয়ণই বাকশাল বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়ে উঠার অন্যতম কারণ।

গণতন্ত্রের মানসপুত্র খ্যাত ‘হোসেন শহীদ সোহরওয়ার্দী’ র রাজনৈতিক শিষ্য হিসেবে পরিচিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান কেন হাটলেন এ ধরণের স্বৈরতান্ত্রিক মতাদর্শের দিকে?

এর জন্য আমাদের চিন্তাভাবনার কাঁটাটাকে খানিক ঘুরাতে হবে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের দিকে।

৭১ পরবর্তী সে সময় পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সাথে দীর্ঘ ‘ন’ মাসের রক্তক্ষয়ী সে যুদ্ধের পর বাঙালি সমাজ নিজ দেশকে আবিস্কার করে এক যুদ্ধ বিদ্ধস্ত ভঙ্গুর দেশ হিসেবে। পাকিস্তান হানাদার বাহিণিরা ভেঙ্গে দিয়ে গিয়েছিল মিলস, ফ্যাক্টরিস, অফিস-আদালত, কল-কারখানা সব কিছু, ছিলো না কিছুই। বাঙালি সমাজও ভেবে বসেছিল বঙ্গবন্ধু এসেই সব কিছু ম্যাজিকের ন্যায় ঠিক করে দিবেন। কিন্তু আদতে এর কিছুই হলো না। উল্টো চারদিক থেকে সদ্য স্বাধীন হওয়া শিশু রাষ্ট্রটির উপর নানাদিক হতে একের পর এক আঘাত ধেয়ে আসতে লাগল।

বাংলার মানুষের খাদ্য প্রয়োজন, টাকা প্রয়োজন কিন্তু যে পরাশক্তির কাছেই বঙ্গবন্ধু হাত পাততে বাধ্য হচ্ছিলেন তারাই জুড়ে দিচ্ছিল অশোভন সব শর্ত। অপরদিকে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়কালে অস্ত্রের সহজলভ্যতার দরুন লুটতরাজ-হানাহানি হয়ে গিয়েছিল নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। খাদ্যের চরম সংকটে দেখা দিয়েছিল ভয়াবহ দূর্ভিক্ষ। এতসব বিপদসংকুল পরিস্থিতের মাঝেই জাসদ আওয়ামী লীগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ র নামে শুরু করল ভয়াবহ সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। স্বাধীন বাংলায় জ্বালাও পোড়াও রাজনীতির শুরু হলো এ জাসদের হাত ধরেই।

পুঁজিবাদী শাসন ব্যাবস্থার দরুন অর্থ জমা হতে লাগল দেশের মাত্র পাঁচ শতাংশ মানুষের হাতে।

বঙ্গবন্ধুর ভাষায় ;

“আমার দেশের মাত্র ৫ পার্সেন্ট লোক ৯৫ পার্সেন্ট লোককে দাবিয়ে রাখছে, শাসন-শোষণ করছে।”

বঙ্গবন্ধু আর সহ্য করতে পারলেন না, তিনি ভাবলেন তিনি এই পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার মূলে আঘাত করবেন। ডাক দিলেন বাকশাল নামক ‘দ্বিতীয় বিপ্লবের’।

আজ বাঙালি জাতি প্রচলিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যে ভয়ানক ভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে বঙ্গবন্ধু তা আরো বহু আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বাঙালি জাতি তার চোখের সামনে হয়ে যাচ্ছিল শতধা বিভক্ত। বাঙালি জাতিকে এক দেশ, এক দল, এক চিন্তা, এক স্বপ্ন ‘র আওতায় নিয়ে আসার ভাবনাতেই বঙ্গবন্ধু পুরো বাঙালি জাতিকে ‘বাকশাল’ নামক একক প্লাটফর্মের অধীনে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন যা সফল হলে হয়ত বাঙালি জাতি আজ ঐক্যের মুখ দেখতে পেত এবং চেয়েছিলেন পুঁজিবাদী অর্থনীতির দরুন সমাজের সমগ্র অর্থ যে শুধুমাত্র ওই পাঁচ ভাগ মানুষের কাছেই পুঞ্জিভূত হচ্ছে তা থেকে এ জাতিকে উদ্ধার করতে। যার জন্য তিনি বাকশালকে অর্থনৈতিক দিক থেকে সমাজতান্ত্রিকতার আদলে তৈরি করেছিলেন।

কিন্তু বাকশাল সমাজব্যবস্থা পুরোপুরি যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ছিল তাও নয় এর রাজনৈতিক দিক ছিল একনায়ক্তান্ত্রিকতা বা রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা । কিন্তু একে ঠিক স্বৈরাচারও বলা সম্ভব নয়। বঙ্গবন্ধু আদতে চেয়েছিলেন প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ করে জনগণের শাসন জনগণের কাছে পৌছে দিতে।

তিনি বাংলাকে প্রথম প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এর সাথে পরিচিতি করিয়ে দিয়েছিলেন। প্রত্যেকে মহকুমাকে কে তিনি জেলা করতে চেয়েছিলেন সে প্রত্যেক জেলায় প্রত্যেক শ্রেণি-পেশার মানুষের একজন করে নির্বাচিত প্রতিনিধি হবে এবং সে জেলার একেকজন গভর্ণর নিযুক্ত করা হবে, যারা নিজেরাই নিজেদের শাসন করবে।

বঙ্গবন্ধু কে জিজ্ঞেস করা হয় ;

অনেকে বলেন ‘বাকশাল’ হলো একদলীয় বা আপনার স্বৈরতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার একটি অপকৌশল- এ সম্পর্কে আপনি পরিষ্কার মতামত দিন।

বঙ্গবন্ধুর ভাষায় ;

“মূলত বাকশাল হচ্ছে বাঙালীর সর্বশ্রেণী সর্বস্তরের গণমানুষের একক জাতীয় প্লাটফর্ম, রাজনৈতিক সংস্থা, একদল নয়। এখানে স্বৈরশাসনেরও কোনো সুযোগ নেই। কারণ বাঙালী জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত বা সমষ্ঠিগত শাসন ব্যবস্থায় কে কার উপর স্বৈরশাসন চালাবে? প্রত্যেক পেশার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে শাসন পরিষদ গঠন করা হবে। কোনো পেশা বা শ্রেণী অন্য পেশার লোকদের ওপর খবরদারী করতে পারবে না।”

বাকশালকে একদলীয় সরকার ব্যবস্থা বলে হেয় করা বর্তমান ইসলামী দলগুলো এটা ভুলে যায় ইসলামী শাসনব্যবস্থাও এক দলীয় শাসনব্যবস্থারই প্রতিরূপ।যেখানে একটিই দল থাকে, একটিই বিশ্বাস থাকে। বস্তুত হানাহানির রাজনীতিকে পরিহার করে বঙ্গবন্ধু এমন একটি সরকার ব্যবস্থা দাড় করাতে চেয়েছিলেন যা সাম্যাবস্থার সাথে জাতীয় ঐক্যের অন্যতম প্রতীক হবে।

ভাষানী দলীয় অবস্থান থেকে এর বিরোধীতা করলেও বলেছিলেন আমি যেমন বঙ্গবন্ধুর প্রথম বিপ্লবের সাথে ছিলাম দ্বিতীয় বিপ্লবের সাথেও আছি।

বাকশাল বিতর্কে অন্যতম খোঁচা দেয়া হয় বঙ্গবন্ধু ‘রাজা’ হতে চেয়েছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বিপুল ভোটে নির্বাচিত এ রাষ্ট্রপ্রধান ও সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী ব্যাক্তি আরও কি ক্ষমতার জন্য তার বাকশাল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন পড়ল তা আসলেই প্রশ্নের দাবি রাখে।

বঙ্গবন্ধু বাকশাল সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন;

আমি কারো সামন মাথা নত হয়ে এ সিদ্ধান্ত নেই নি। অপপ্রচার চলছে, চলুক। আমি জাতির বৃহত্তর কল্যাণে এ পথে নেমেছি। হয়তো শেষ পর্যন্ত ওরা আমাকে মেরে ফেলতে পারে। পরোয়া করি না। ও মৃত্যু আমার জীবনে অনেকবার এসেছে। একসিডেন্টলি আজো আমি বেঁচে আছি। অবশ্যই আমাকে মরতে হবে। তাই মৃত্যু ভয় আমার নেই। 

‘বাকশাল’ কি ছিল, কি হতে পারত এর ফলাফল , ভাল না খারাপ কখনই জানতে পারবে না এ জাতি।

পূর্ণাঙ্গ ভাবে পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া এ ‘বাকশাল’ প্রথা শুরু হওয়ার আগেই সপরিবারে খুন হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান।

বাকশাল বিতর্ক বোধহয় কোনকালেই শেষ হবে না কিন্তু এ জাতিকে স্বাধীনতা এনে দেওয়া এক মহান নেতা যে শুধুমাত্র শাসনে টিকে থাকার জন্য ‘বাকশাল’ প্রণয়ন করেছিলেন এ ধরণের মতবাদ ধোপে ঠিক কতটুকু টিকে তা নিয়ে আসলে প্রশ্ন থেকেই যায়।

মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ খাঁন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

আরো পড়ুন ;

ak-47 কেন এত জনপ্রিয়? –https://cutt.ly/

ভুলে যাওয়া ঢাবির কারিগরঃনবাব সলিমুল্লাহ –https://cutt.ly/GjXsbaa

Show More

MK Muhib

A researcher,An analyst,A writer,A social media activist,student at University of dhaka.

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button