ইতিহাস

ভুলে যাওয়া ঢাবির কারিগরঃ নবাব সলিমুল্লাহ

সাধারণত দেখা যায় কোন দেশ সে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়কে জন্ম দিয়ে থাকে কিন্তু কখনো কি শুনেছেন কোন বিশ্ববিদ্যালয় তার দেশকে জন্ম দিয়েছে? এ অদ্ভুতূরে কান্ডটিই ঘটেছে আপনার দেশে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; বাংলাদেশ তৈরির অন্যতম রূপকার হিসেবে পরিচিত এ বিশ্ববিদ্যালয় । বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, শেখ মুজিবর রহমান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সহ দেশ গঠন ও তৎপরবর্তী সকল কাজে নেতৃত্ব দেয়া এ বিশ্ববিদ্যালটির আসল রূপকারকেই কেন যেন এ জাতি ভুলে গিয়েছে।

যে বিশ্ববিদ্যালয় এনে দিল অধিকার সচেতনতার শিক্ষা, মায়ের ভাষা, সোনার একটি দেশ সে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেপথ্যের কারিগর ছিলেন নবাব স্যার সলিমুল্লাহ। মহিয়সী এ মানুষটির জন্ম ১৮৭১ সালের ৭’ই জুন আহসান মঞ্জিলে। বাঙালির ভাগ্য পরিবর্তনের অন্যতম এই কান্ডারি আজ চরমভাবে উপেক্ষিত। এ কথা বলতে দ্বিধা নেই ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ, ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠন এবং ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা না হলে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ বলতে কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকত কিনা সন্দেহ বিদ্যমান। নবাবদের তুমুল আবেদন এবং ইংরেজদের প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনীয়তার দরুন ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিত জনগণের স্বার্থে আঘাত লাগার দরুন তারা তুমুল আন্দোলন শুরু করলে মাত্র ছয় বছর পর ১৯১১ সালেই বঙ্গভঙ্গ রদ হয়। আধুনিক বা পাশ্চাত্যের শিক্ষা থেকে বিভিন্ন কারণে বঞ্চিত থাকা মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষাবিস্তারে নবাব ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। যুগোপযোগী শিক্ষার অভাবকেই মুসলমানদের পশ্চাৎপদতার কারণ বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। সে কারণেই মনে প্রাণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা বহু আগেই তাকে ভাবিয়ে তুলেছিল।

বঙ্গভঙ্গ রহিত হবার পর পূর্ব বাংলার মুসলমানদের এবং নবাব সলিমুল্লাহর মনে সৃষ্ট ব্রিটিশদের প্রতি প্রকাশ্য ক্ষোভ এবং হিন্দুদের সম্পর্কে অবিশ্বাস প্রশমিত করতে ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকায় আসেন নবাব সলিমুল্লাহর সাথে সাক্ষাত করতে। ঐ দিনই ১৯ সদস্যের একটি মুসলিম প্রতিনিধি দল নিয়ে নবাব সলিমুল্লাহ ভাইসরয়ের সাথে সাক্ষাত করে মুসলমানদের বিভিন্ন দাবীর সাথে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবীটি জোড়ালো ভাবে উত্থাপন করেন। ক্ষুব্ধ নবাবকে শান্ত করতেই দুদিন পর ১৯১২ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা করেন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ।

এই ঘোষণার পরপরই বঙ্গভঙ্গ রহিত করার সদ্য সাফল্যে উজ্জীবিত হিন্দু নেতারা অনুরূপ আন্দোলন ও প্রতিবাদ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সরকারী ঘোষণাকে বাতিল করতে তৎপর হয়ে ওঠেন। এই তৎপরতায় নেতৃত্ব দেন কবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর, কংগ্রেস নেতা সুরেন্দ্র নাথ ব্যানার্জী ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর স্যার আশুতোষ মুখার্জী। কলিকাতা, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও বরিশালের হিন্দু নেতারা একাধিক প্রতিবাদ সভা করেন। কলিকাতার গড়ের মাঠে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

১৯১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ড. রাসবিহারী ঘোষ কয়েকজন হিন্দু নেতাসহ ভাইস রয়ের সঙ্গে সাক্ষাত করে যে স্মারক লিপি প্রদান করেন তাতে বলা হয়;

“ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হবে আভ্যন্তরীনভাবে বঙ্গভঙ্গের সমতুল্য”

এমন কয়েক ডজন স্মারকলিপি দেয়া হয়।কোন স্মারক লিপিতে বলা হয়েছে;

“পূর্ব বাংলার মুসলমানদের অধিকাংশই কৃষক, এই সকল চাষা-ভূষাদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন নেই”।

অসাম্প্রদায়িক ও মানবদরদী খেতাবে ভূষিত এই সকল বর্ণবাদী হিন্দু নেতাদের প্রবল বিরোধিতার পরও পিছিয়ে পড়া মুসলিম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রাজনীতি ও সামাজিক প্রতিযোগিতার উপযোগী করে গড়ে তোলার মানসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবী তোলেন ব্রিটিশ শাসকদের নিকট। সায়মন কমিশন রিপোর্টে বিশ্ববিদ্যালয় করার মত পর্যাপ্ত জায়গা নেই এ রকম খোঁড়া যুক্তির জবাবে তিনি শাহবাগের গোটা বাগানবাড়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দান করার যুগান্তকারী একটি সিদ্ধান্ত দিয়ে সুগম করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পথ।

১৯১২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি এক ইশতেহারে ভারত সরকার কর্তৃক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ ঘোষণা করা হয়।

‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি কমিটির’ অধীনে ইউনিভার্সিটির পাঠ্যসূচি রচনার উদ্দেশ্যে ২৫টি সাব-কমিটি গঠিত হয়। ‘ইসলামিক স্টাডিজ’ বিষয়ের সাব-কমিটির সঙ্গে নবাব সলিমুল্লাহ ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন।

হঠাৎই ১৯১৫ সালের ১৬ই জানুয়ারি কলিকাতার চৌরঙ্গীতে নিজ বাসভবনে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে তিনি মারা যান। যে ঘটনা আজো রহস্যাবৃত। হিন্দু নেতা ও সমাজ পতিদের তুমুল বিরোধিতার পরও নবাব সলিমুল্লাহর ব্রেন চাইল্ড নামে খ্যাত শের-এ-বাংলা এ.কে ফজলুল হকের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় এবং অবকাঠামো নির্মাণের জন্য জমিদারীর অংশ বিক্রি করে নবাব নওয়াব আলী চৌধুরীর দান করা আটত্রিশ হাজার টাকায় ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত করে পূর্ব পাকিস্তান, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন বাংলাদেশ করতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়ারাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

ইতিহাস গোড়াপত্তনে ও বাঙালি জাতির অধিকার সচেতন করতে যার এতো অনবদ্য অবদান তাঁকেই আমরা বেমালুম ভুলে আছি। অনেকটা বলা যায় আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করেছি। ইতিহাসের সেই প্রাণপুরুষ ও শিকড়কে আমরা নিঃসঙ্কোচে ভুলে আছি। যার রক্ত সিঞ্চনে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয়, তার নামে নেই কোন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, হয় না জন্ম মৃত্যু বার্ষিকি পালন অথচ এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধীদের নিয়ে এ জাতি ঠিকই দহরম মহরম করে।

সম্মান দিলে কখনো সম্মান কমে না বরং বাড়ে। এই সাধারণ কথাটিও আমরা ভুলে গেছি। মাত্র ৪৪ বছরের জীবদ্দশায় পিছিয়ে পড়া মুসলিম বাঙালি জাতির সুদূরপ্রসারী উত্থানের জন্য যে ব্যাক্তি লড়ে গিয়েছিলেন সে মানুষটিকেই আমরা বেমালুম ভুলে গিয়েছি। ভুলে গিয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অবিস্মরণীয় কারিগর কে।

সলিমুল্লাহ মুসলিম হল,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ খাঁন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

আরো পড়ুন;

মোঙ্গলদের পতনের ইতিহাসhttps://cutt.ly/fjT1ync

Via
বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নবাব স্যার সলিমুল্লাহ উপেক্ষিত কেন?ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুবার্ষিকী আজনবাব স্যার সলিমুল্লাহর বাগানবাড়ীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়নবাব স্যার সলিমুল্লাহ : ইতিহাসের দ্যুতিময় ব্যক্তিত্ব
Source
দৈনিক ইনকিলাবদৈনিক সংগ্রামthe daily campusদৈনিক ইনকিলাবসারাবাংলা
Show More

MK Muhib

A researcher,An analyst,A writer,A social media activist,student at University of dhaka.

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button