ইতিহাসসাম্প্রতিক

মসলিনঃ ঔপনিবেশিকদের হাতে মৃত্যু থেকে পুনর্জন্মের আদ্যপান্ত

মসলিনঃ ঔপনিবেশিকদের হাতে মৃত্যু থেকে পুনর্জন্মের আদ্যপান্ত

১৮৫০ সাল,লন্ডনের সর্বশেষবারের মত প্রদর্শিত হলো,হাতেবোনা মসলিন। এরই মাঝে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসকেরা বাংলার সম্পদ লুন্ঠন আর এদেশকে হাজার বছর পিছিয়ে দেয়ার সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করে ফেলেছে। তাদের খড়গ এরপর পড়তে যাচ্ছে,ঢাকার মসলিনের উপর। কারণ,অপার সুন্দর্য আর কারুকার্যে ভরা মসলিনের সামনে তাদের তৈরি পোশাক মার খাচ্ছিল। মার খাবেও না কেন?ঢাকার মসলিন যে বাঙ্গালির হাজার বছর ধরে চর্চা করে আসা এক আদিম শিল্প।  

ঢাকা মসলিনের ইতিহাস সুপ্রাচীন। সেই প্রথম খ্রিস্টাব্দে রোমান শাসনের স্বর্ণযুগে লেখা ইতিহাসেও মসলিনের কথা পাওয়া যায়। শতকে রচিত ‘পেরিপ্লাস অব দ্য এরিথ্রিয়ান সি’ শীর্ষক গ্রন্থে মসলিন সম্পর্কে বিশেষ ধরনের তথ্য পাওয়া যায়।”এতে মোটা ধরনের মসলিনকে মলোচিনা, প্রশস্ত ও মসৃণ মসলিনকে মোনাচি এবং সর্বোৎকৃষ্ট মসলিনকে গেনজেটিক বা গঙ্গাজলী বলে উল্লেখ করা হয়েছে।” নবম শতকে রচিত আরব ভৌগোলিক সোলাইমানের ‘সিলসিলাত উত তাওয়ারীখে ‘রুমি’ নামক একটি রাজ্যের বিবরণ পাওয়া যায়। সেখানে এমন সুক্ষ্ম ও মিহি সুতি বস্ত্র পাওয়া যেত যে, ৪০ হাত লম্বা ও ২ হাত চাওড়া।যা আংটির ভিতর দিয়ে অনায়াসে নাড়াচড়া করা যেতো। তৎকালীন এই বস্ত্র তিনি সেখানে ব্যতীত আর কোথাও দেখেন নি। আর এই রুমি রাজ্যকে বাংলাদেশের সাথে অভিন্ন ধরা হয়। চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলায় পা রাখা মরক্কোর বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা  তার কিতাবুর রেহালায়সোনারগাঁওয়ে তৈরি সুতি বস্ত্রের বিশেষ প্রশংসা করেন। পঞ্চদশ শতকে বাংলাদেশে আসা চীনা লেখকরা ও এখানকার সুতি বস্ত্রের ভুয়সী প্রশংসা করেন। মোগল সম্রাট আকবরের  সভাসদ আবুল ফজল সোনারগাঁওয়ে প্রস্তুতকৃত এই সুক্ষ্ম সুতি বস্ত্রের প্রশংসা করতে ভুলেন নি।কথিত আছে যে মসলিনে তৈরি করা পোশাকসমূহ এতই সুক্ষ্ম ছিল যে ৫০ মিটার দীর্ঘ মসলিনের কাপড়কে একটি ম্যাচ বাক্সে ভরে রাখা যেত।

ঢাকার মসলিন

মসলিন তৈরি করা হয় ফুটি কার্পাস তুলার সুতা  চড়কা দিয়ে কাটা, হাতে বোনা মসলিনের জন্য সর্বনিম্ন ৩০০ কাউন্টের সুতা ব্যবহার করা হত যার ফলে মসলিন হত কাচের মত স্বচ্ছ।এর অনেক কাপড়ে,২৪২৫টি বুননের রেকর্ড পর্যন্ত পাওয়া যায়।যা বর্তমান কালের উন্নত প্রযুক্তি দিয়েও বানাতে বেগ পেতে হয়। তুলা থেকে তন্তু বের করে,তা থেকে সুতা প্রস্তুতের প্রক্রিয়াটা ছিল খুব দীর্ঘ। বোয়াল অথবা বড় মাগুর মাছের মাথা থেকে বানানো ‘বোয়ালি’ নামের এক ধরনের বস্তু দিয়ে টেনে টেনে,তুলা থেকে সুতা বের করা হত।তারপর হাতে বোনার জন্য চরকায় নেয়া হত। এই বিপুল কর্মযজ্ঞের জন্য চড়া পারিশ্রমিক পেতেন কারিগররা। কারণ, সেসময় এটা ছিল রাজ রাজাদের পোশাক। এটি মূলত তৈরি করা হত,বর্তমানের সোনারগাঁ অঞ্চলে। বিভিন্ন সূত্র থেকে বেশ কয়েক রকমের মসলিনের কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। এদের মধ্যে সবচেয়ে উন্নতটির নাম ছিল,মলবুল খাস। একে মুলমুলও বলা হত। সাধারণত সুলতান,নবাব কিংবা মুঘলদের মত রাজ পরিবারের সদস্যরাই এ ধরনের মসলিন গায়ে দেয়ার সুযোগ পেতেন। তারপরই ছিল,সরকার-ই-আলা। সাধারণত,রাজ পরিবারের পর,রাজ সভাসদরা এই মসলিন পরার অনুমতি পেতেন। সরকার-ই-আলা নামের জায়গা থেকে পাওয়া খাজনা দিয়ে এর দাম শোধ করা হত বলে এর এরকম নামকরণ। লম্বায় হত ১০ গজ, চওড়ায় ১ গজ আর ওজন হত প্রায় ১০ তোলা।এর বাইরে ঝুনা,খাসসা,শবনম,নয়ন সুখ নামের বিভিন্ন ধরনের মসলিনের কথা জানা যায়।  

মসলিন কাপড়পরা মুঘল নারী

সেসময় প্রতিযোগিতায় না পেরে,মসলিন ধ্বংস করে দেয় ব্রিটিশরা।ঊনবিংশ শতাব্দীতে স্থানীয়ভাবে প্রস্তুত করা বস্ত্রের উপরে ৭০ হতে ৮০ শতাংশ কর আরোপ করা হয়, যেখানে ইংল্যান্ডে  প্রস্তুত-করা আমদানী করা কাপড়ের উপরে মাত্র ২ থেকে ৪ শতাংশ কর ছিল। এর ফলে বাংলার তাঁত শিল্পে ধস নামে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা মসলিন উৎপাদন বন্ধ করার জন্য মসলিন বয়নকারী তাঁতিদের হাতের বুড়ো আঙুল কেটে দেয়।

কার্পাস গাছ

 এতবে এত কিছুর পরও মসলিনের একটি শাখা টিকে গিয়েছিল। যাকে আমরা এখন জামদানী নামে চিনি।প্রাচীনকালের মিহি মসলিন কাপড়ের উত্তরাধিকারী হিসেবে জামদানি শাড়ি বাঙ্গালি নারীদের খুব প্রিয় ছিল। বলা হয়, মসলিনের উপর নকশা করে জামদানি কাপড় তৈরি করা হত। বর্তমানে জামদানি বলতে সাধারণত‍ শাড়িকেই বোঝান হয়। তবে জামদানি দিয়ে নকশি ওড়না, কুর্তা, পাগড়ি, রুমাল, পর্দা প্রভৃতিও তৈরি করা হত। ১৭০০ শতাব্দীতে জামদানি দিয়ে নকশাওয়ালা জামদানি শেরওয়ানির প্রচলন ছিল। এছাড়া, মুঘল নেপালের আঞ্চলিক পোশাক রাঙ্গার জন্যও জামদানি কাপড় ব্যবহৃত হত।

তবে ২০২০ সালের শেষে এসে,মসলিনের পুনর্জন্মের কথা ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ সরকার। এর শুরুটা হয়েছিল ২০১৪ সালে। সে বছর অক্টোবর মাসে প্রধানমন্ত্রী মসলিন ফিরিয়ে আনতে নির্দেশ দেন। শুরু একদল গবেষকদের মহাযাত্রা।তারা প্রথমে ফুটি কার্পাসের খোঁজে নামেন। প্রকল্পের প্রধান বৈজ্ঞানিক মো. মনজুর হোসেন জানান, মসলিন কাপড়ের নমুনা পেলে তার সুতার ডিএনএ সিকুয়েন্স বের করে ফুটি কার্পাস গাছের ডিএনএর সঙ্গে মিলিয়ে দেখাই ছিল তাঁর দলটির প্রধান কাজ। কিন্তু হাতে কোনো মসলিন কাপড়ের নমুনা নেই, নেই ফুটি কার্পাসের কোনো চিহ্নও। ছিল শুধু সুইডিস গবেষক ক্যারোলাস লিনিয়াসের লেখা ‘স্পেসিস প্লান্টেরাম’, আবদুল করিমের ‘ঢাকাই মসলিন’–এর মতো কিছু বই। এর মধ্যে ক্যারোলাস লিনিয়াসের বইতে মসলিন কাপড় বোনার জন্য ‘ফুটি কার্পাস’ উপযুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়।তারপর ঢাকা থেকে কলকাতা,মুর্শিদাবাদ,রাঙ্গামাটি ঘুরে অবশেষে ফুটি কার্পাস গাছের খোঁজ মেলে। এরপর শুরু হয়,সেই কার্পাস গাছ থেকে তুলা আর তা থেকে সঠিক সুতা খুঁজে বের করা। কয়েক বছরের চেষ্টায় গবেষকরা সুতা খুঁজে বের করতে সক্ষম হন। তারপর সেই সুতা থেকে,আদিম পদ্ধতিতে হাতে বুনে বানানো হয় মসলিনের স্যাম্পল।

প্রধানমন্ত্রীকে ১৭০ গ্রাম ওজনের মসলিন শাড়ি উপহার

সেই স্যাম্পল লন্ডনের ভিক্টোরিয়া আলবার্ট জাদুঘরে রাখা মসলিন শাড়ির সাথে মিলিয়ে গবেষকরা নিশ্চিত হন,মসলিনের পুনর্জন্মে তারা সফল হয়েছেন। সেই শাড়ি তৈরিতে প্রায় ৩ লক্ষ ৬০০০০ টাকা খরচ হয়েছে। এ খরচ আরো কমে আসবে বলা ধারণা গবেষকদের।বর্তমানে তারা ৬টি শাড়ি তৈরি করেছেন।যার মধ্যে একটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উপহার হিসেবে দেয়া হয়েছে। মসলিনকে গতবছরের শেষ নাগাদ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।  

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button