প্রযুক্তি

ক্লিনটন-মনিকা কেলেঙ্কারির

উইলিয়াম জেফারসন ক্লিনটন (আগস্ট ১৯, ১৯৪৬-) যিনি বিল ক্লিনটন নামে সমধিক পরিচিত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪২তম রাষ্ট্রপতি।

বিল ক্লিনটন ক্ষমতায় থাকাকালে ১৯৯৮ সালে মনিকা লিউনিস্কি ইস্যু নিয়ে ভীষণ ঝামেলায় পড়েছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। ১৯৯৫ সালে মনিকা লিউনস্কির বয়স যখন ২২ বছর তখন ক্লিনটনের সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি হয়। তাদের প্রেম বিশ্বব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি করে।

৯০-এর দশকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সাথে হোয়াইট হাউজের কর্মচারী মনিকা লিউনস্কিকে জড়িয়ে কেলেংকারির কাহিনী জনসমক্ষে প্রকাশ পায়। ক্ষমতাসীন কোনো প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত যৌন কেলেংকারির ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়া, ইতিহাসে সেই ছিল প্রথম। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে ইমপিচমেন্টের মুখোমুখি হতে হয়েছিলো।

ক্লিনটনের বিষয়টি যতটা না ছিলো স্ক্যান্ডাল, তার চেয়ে অনেক বেশি চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলো রাজনৈতিক অঙ্গনে । ক্লিনটনের প্রতি মার্কিন জনগণ ছিলো সহানুভূতিশীল । কারণ সে সময় মার্কিন অর্থনীতির অবস্থা ছিল খুবই ভাল এবং বেকারত্বের হার ছিলো ন্যুনতম পর্যায়ে।

১৯৯৫ সালের আমেরিকার প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে চাকরি পায় লুইস এবং ক্লার্ক কলেজ গ্র্যাজুয়েট সুন্দরী মনিকা লুইনসকি। এ সময় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম জেফারসন বিল ক্লিনটন সপরিবারে এই রাজকীয় প্রাসাদে বসবাস করতেন। ২২ বছরের এই সুন্দরীর প্রতি নজর পড়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের। কিছু দিন দৃষ্টি বিনিময় এবং অল্পস্বল্প কথোপকথনের পর মনিকার সঙ্গে ক্লিনটনের গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মনিকা এবং ক্লিনটন নিয়মিত অভিসারে মিলিত হতেন। তাঁরা রোমান্স এত উপভোগ করতেন যে হোয়াইট হাউসেই ৯ বার গোপন অভিসারে লিপ্ত হন। এর মধ্যে পাঁচ বার এ রকম অভিসারের সময় ক্লিনটনের স্ত্রী হিলারি রডহাম ক্লিনটন হোয়াইট হাউসে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তাঁদের এই অভিসারের খবর হিলারি কেন, কাকপক্ষীও টের পায়নি।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে চাকরির সুবাদে মনিকার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে তাঁর সহকর্মী লিন্ডা ট্রিপের। আলাপচারিতার একপর্যায়ে মনিকা তাঁর বিশ্বস্ত বন্ধু ও সহকর্মী লিন্ডাকে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর গোপন অভিসারের কথা জানান। ট্রিপ মনিকাকে পরামর্শ দেন, প্রেসিডেন্ট যে উপহার প্রদান করেন তা যেন সংরক্ষণ করা হয়। এ ছাড়া তিনি আরো অনুরোধ করেন যে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে গোপন অভিসারের সময় যে বস্ত্র পরিধান করা হয় তা যেন পরিষ্কার না করা হয়। এই বস্ত্র পরে ‘নীল বস্ত্র’ নামে খ্যাতি লাভ করে।

মনিকা ও ক্লিনটনের গোপন রোমান্সের কথা লিন্ডা সাহিত্যিক লুসিয়ানা গোল্ডবার্গকে জানান। গোল্ডবার্গ লিন্ডাকে পরামর্শ দেন যে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মনিকার কথোপকথন যেন গোপনে রেকর্ড করা হয়। বহুবার চেষ্টার পর ট্রিপ ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁদের মধ্যকার প্রেমালাপ রেকর্ড করতে সক্ষম হন। এবার গোল্ডবার্গ ট্রিপকে পীড়াপীড়ি করে যে এই রেকর্ড করা টেপটি স্বাধীন তদন্ত কর্মকর্তা কেনথ স্টারকে প্রদান করতে। কিন্তু তাঁর এই আবেদনে ট্রিপ সাড়া দেননি। গোল্ডবার্গ বহুবার চেষ্টা করে ট্রিপকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়ে শেষের দিকে নিউজউইকের প্রতিবেদক মাইকেল ইসিকফের কাছে এ ঘটনা ফাঁস করে দেন।

এই স্ক্যান্ডালের খবর প্রথম প্রকাশ্যে আসে ১৭ জানুয়ারি ১৯৯৮ সালে ড্রাজ রিপোর্ট ওয়েবসাইটে। এই বছরেরই ২১ জানুয়ারি দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট তাদের প্রধান প্রতিবেদন হিসেবে এই স্ক্যান্ডালের খবর প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদন জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। উপায়ন্তর না দেখে ক্লিনটন স্ত্রী হিলারিকে সঙ্গে নিয়ে হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। এই সংবাদ সম্মেলনে ক্লিনটন বলেন, ‘মনিকা নামে যে মহিলার কথা বলা হচ্ছে তাঁর সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি কখনো কোনো ব্যক্তির সঙ্গে কোনো সময় একটিও মিথ্যা কথা বলিনি। এই অভিযোগ মিথ্যা।’ অতঃপর মনিকাও দাবি করেন যে ঘটনা মিথ্যা এবং ট্রিপ ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের জন্য এই অভিযোগ উপস্থাপন করেছেন। এমতাবস্থায় ট্রিপ তাঁর কাছে সংরক্ষিত মনিকা এবং ক্লিনটনের প্রেমালাপের টেপ তদন্ত কর্মকর্তা কেনথ স্টারকে প্রদান করেন। কেনথ এই টেপের কথোপকথন পরীক্ষা করে বলেন, এ ঘটনা সত্য।

উপায়ন্তর না দেখে মনিকা গ্র্যান্ড জুরির কাছে তাঁর সঙ্গে ক্লিনটনের শারীরিক সম্পর্ক থাকার কথা স্বীকার করেন এবং তাঁর কাছে সংরক্ষিত নীল বস্ত্র তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রদান করেন। তদন্ত কর্মকর্তা এই নীল বস্ত্র পরীক্ষা করে বলেন, এই অভিযোগ সম্পূর্ণ সত্য এবং ক্লিনটনের দাবি মিথ্যা।

অতঃপর বিচারক সুসান ডি ওয়েবার মিথ্যা কথা বলার জন্য প্রেসিডেন্টকে ৯০ হাজার ডলার জরিমানা করেন। অন্যদিকে ইয়েল আইন স্কুলের ছাত্র ক্লিনটনকে সুপ্রিম কোর্ট বার থেকে এক মাসের জন্য এবং আরকানসাস অঙ্গরাজ্যের বার থেকে পাঁচ বছরের জন্য বরখাস্ত করা হয়।

এ ঘটনা সত্য প্রমাণিত হওয়ার পর সিনেট সদস্যরা প্রেসিডেন্টের নৈতিক মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁকে ইমপিচমেন্টের দাবি করেন। ক্লিনটনের ডেমোক্রেটিক পার্টির অনেক সদস্য ও বিরোধী রিপাবলিকানদের এই দাবি সমর্থন করেন। ফলে সিনেটে এ বিষয়ে ২১ দিন ধরে তুমুল বিতর্ক হয়। অবশেষে ভোটাভুটিতে ক্লিনটন জয়লাভ করেন। অর্থাৎ এ যাত্রায় প্রেসিডেন্ট ইমপিচমেন্টের হাত থেকে রক্ষা পান। হিলারি ক্লিনটন পুরো ঘটনায় স্বামীর পাশে থেকে স্বামীর মনোবল জোগান।

বিল ক্লিনটনের সঙ্গে মনিকা লিউনস্কির গোপন সম্পর্ক সামনে আনেন যিনি সেই লিন্ডা ট্রিপ আর নেই। গত ৮ এপ্রিল অগ্নাশয়ের ক্যান্সারে ভোগা ৭০ বছর বয়সী এ নারীর মৃত্যু হয়।

সেই থেকে এ নারী অনেকের কাছে ‘হুইসেলব্লোয়ার’, আবার কারও কারও কাছে পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে নিন্দিত হয়ে আসছেন বলে বিবিসি জানিয়েছে।

ক্লিনটন-মনিকার সম্পর্ক বিষয়ক তথ্য স্টার নেতৃত্বাধীন তদন্ত দলকে দেয়ায় ট্রিপের সমালোচকরা তার বিরুদ্ধে বন্ধুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রেসিডেন্টের সম্মানহানির অভিযোগ করেছিলেন। ২০০১ সালে ক্লিনটনের মেয়াদের একেবারে শেষদিন ট্রিপ পেন্টাগন থেকে চাকরিচ্যুত হন; পরে ভার্জিনিয়ায় স্বামীর সঙ্গে একটি দোকান খোলেন তিনি।

ট্রিপের অসুস্থতার খবরে লিউনস্কি টুইটারে সহমর্মিতাও জানিয়েছিলেন।

“অতীত কোনো ব্যাপার নয়। লিন্ডা ট্রিপ খুব অসুস্থ এ সংবাদ শুনে আমি তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি। কল্পনাও করতে পারছি না, তার পরিবার এখন কী কঠিন সময় পার করছে,” বলেছিলেন তিনি।

১৯৯৮ সালে ক্লিনটনের বিচারে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে ট্রিপের বিরুদ্ধে তীর্যক মন্তব্য করেছিলেন লিউনস্কি। বলেছিলেন, “যা ঘটেছে তার জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত আর লিন্ডা ট্রিপকে ঘৃণা করি আমি।”

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button