জীবনী

ওয়ার্নার কার্ল হাইজেনবার্গঃ কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর জনক

বিখ‍্যাত টিভি সিরিজ “ব্রেকিং ব‍্যাড” এর সাথে পরিচিত কিন্তু ”হাইজেনবার্গ এর নাম শোনেনি এমন মানুষ পাওয়া অসম্ভব। ক‍্যান্সার আক্রান্ত সেই হাইস্কুল কেমিস্ট্রি টিচার এর বিখ্যাত ডায়লগ, ‘আমার নাম হাইজেনবার্গ’ হয়তো অনেকেই শুনেছি। কিন্তু এই হাইজেনবার্গ এর পরিচয় ক’জনেই বা জানি! 

আজ তাহলে সত্যিকারের হাইজেনবার্গ কে জানা যাক।

১৯০১ সালের ৫ ডিসেম্বর,জার্মানির ‘ওয়ার্জবার্গ’ এ জন্ম নেয় ‘ওয়ার্নার কার্ল হাইজেনবার্গ’ নামের প্রখর মেধাবী এই বিজ্ঞানী। তার পিতার নাম, ‘ক্যাস্পার আর্নস্ট অগস্ট হাইজেনবার্গ’ এবং মা ‘অ্যানি ওয়েকলিন’। ব্যক্তিগত জীবনে হাইজেনবার্গ একজন পদার্থবিদ। পদার্থবিজ্ঞানে তার অবদানের কথা বলে শেষ করা যাবে না।

পড়াশোনা এবং ক্যারিয়ার

হাইজেনবার্গ ই সেই ব্যক্তি যিনি ম্যাট্রিকের ক্ষেত্রে ‘কোয়ান্টাম মেকানিক্স’ তৈরি করতে পেরেছিলেন। ১৯২৫ সালে, জার্মান পদার্থবিদ ‘ম্যাক্স বার্ন’ এবং ‘প্যাসকুল জর্দান’ এর সাথে কোয়ান্টাম মেকানিকসের সূত্রপাত করেন। যার জন্যে তাদের সময় লেগেছিলো ছয় মাসের ও বেশি। এছাড়াও, তিনি অন্যান্য গবেষণার মধ্যে উত্তাল তরল, পারমাণবিক নিউক্লিয়াস, ফেরোম্যাগনেটিজম, মহাজাগতিক রশ্মি এবং সাবোটমিক কণার জলবিদ্যুৎবিদ্যার তত্ত্ব সহ আরো অসংখ্য ক্ষেত্রে ব্যাপক অবদান রেখেছেন।

হাইজেনবার্গ ই প্রথম গাণিতিক যুক্তি দিয়ে দেখান যে, “ইলেকট্রন কণা এবং তরঙ্গ- দুটো অবস্থাতেই থাকতে পারবে; কিন্তু একই সাথে ইলেকট্রনকে কণা ও তরঙ্গ উভয়ই বিবেচনা করা যাবে না।” এই বিখ‍্যাত নীতিকে সবাই হাইজেনবার্গের “অনিশ্চয়তা নীতি” বলে থাকে।

১৯২০-১৯২৩ এ মিউনিখের ‘লুডভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়’ এবং গ্যাটিনজেনের ‘জর্জি-আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়’ থেকে পদার্থবিদ্যা এবং গণিতে অধ্যয়ন শুরু করেছিলেন হাইজেনবার্গ।

১৯২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১ মে পর্যন্ত ‘রকফেলার ফাউন্ডেশন বোর্ড অফ ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন’ কর্তৃক অনুদানের জন্য ড্যানিশ পদার্থবিজ্ঞানী ‘নীল বোহর’ এর সাথে একত্রে গবেষণা চালিয়েছিলেন।

১৯২৪-১৯২৭ এর মধ্যে হাইজেনবার্গ গ্যাটিনজেনে প্রাইভেটডজেন্ট (শিরোনামের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক) হিসাবে খ্যাতি পেয়েছিলেন। হাইজেনবার্গের এর সাহায্যেই পদার্থগুলির বিভিন্ন পারমাণবিক কাঠামো হাইড্রোজেনের এলোট্রপিক ফর্মগুলি আবিষ্কার করা হয়েছে।

১৯২৮ সালে, অ্যালবার্ট আইনস্টাইন পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কারের জন্য ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ, ম্যাক্স বার্ন এবং প্যাসকুল জর্ডানকে মনোনীত করেছিলেন।

১৯৩০ সালে, ‘দ্য ফিজিকাল প্রিন্সিপলস অব কোয়ান্টাম থিউরি’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন হাইজেনবার্গ। 

১৯৩২ সালে, ‘কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জনক’ হিসেবে হাইজেনবার্গ পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন।

অবশেষে, ১৯৩৩ সালে তিনি অধ্যাপক এবং পদার্থবিজ্ঞানী, ‘আর্নল্ড সোমারফিল্ড’ এর অধীনে মিউনিখে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। সমারফিল্ড হাইজেনবার্গকে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সমস‍্যা “টারবিউলেন্স” নিয়ে গবেষণা করার জন‍্য উপদেশ দেন।

নাজি’র আক্রমন

পদার্থবিজ্ঞানে অবদান ছাড়াও হাইজেনবার্গ  ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী। কিন্তু ১৯৩৩ সালে,জার্মানী যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে অবস্থান করছে। চারদিকে এডলফ হিটলারের স্লোগানে মুখরিত। নাজ্জি জার্মানী তখন জাত‍্যাভিমানের আশ্রয়ে ইয়াহুদী নিধনে ব্যস্ত। নাৎসি পার্টি কর্তৃক আইনস্টাইন এবং হাইজেনবার্গের অন্যান্য সহকর্মী সহ অনেক অধ্যাপককে বরখাস্ত করার পর হাইজেনবার্গ কে ও অনেকেই ক্ষমতাচ্যুত করতে চেয়েছিলো। কারণ, পরিস্থিতি না বুঝেই হাইজেনবার্গ বলেছিলেন, “একজন বিজ্ঞানী ইয়াহুদী হলেও তাকে অবশ‍্যই বিশ্ববিদ‍্যালয়ে শিক্ষকতা করতে দেয়া উচিত।” ব্যস, এই কথা বলার সাথে সাথে হাইজেনবার্গ পড়লেন নাজ্জিদের রোষানলে। ‘ডয়েচ ফিজিকস’ এর অন্যতম ব্যক্তি ‘হেনরিক হিমলার’ তার পত্রিকায় হাইজেনবার্গকে একজন “শ্বেতাঙ্গ ইয়াহুদি” বলে আখ্যা দেন।

এই ঘটনার কারণে ১৯৩৫ সালে হাইজেনবার্গ এর উপর বড়সড় বিপর্যয় নেমে আসে। চাকরিতে তার পদোন্নতি আটকে যায়। এমন কি হিটলারের রাজনৈতিক দল ‘এসএস’ তখন হাইজেনবার্গের উপর গুপ্তচর নিয়োগ করে। যদিও পরবর্তীতে, পারিবারিক সম্পর্কের জের ধরে তাদের মধ্যে সখ্য তৈরি হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হাইজেনবার্গ

১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের পারমানবিক বোমা তৈরির গবেষণা শুরু হওয়ার খবরে নড়চড়ে বসলেন হিটলার। তৈরি করলেন ‘জার্মান পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি’। বেশ কয়েকটি বৈঠকের পর ঠিক করলেন হাইজেনবার্গ ই এই কাজের জন্যে সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। তাই হাইজেনবার্গকে অন্তর্ভুক্ত করে ‘ম্যানেজিং ডিরেক্টর’ পদে স্থান দিলেন হিটলার।

কিন্তু নিউক্লিয়ার ফিশনের উপর তার গবেষণা বোমা বানানোর বেশ কাছাকাছি চলে আসলেও হাইজেনবার্গের গবেষণা গ্রুপটি ‘চুল্লি বা পারমাণবিক বোমা’ তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছিল। যার ফলে অনেকেই হাইজেনবার্গ কে অযোগ্য হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। আবার অনেকেই মনে করে, এই প্রকল্প টি উদ্দেশ্যমূলক ছিলো বা প্রচেষ্টাটিকে নাশকতা দেওয়া হয়েছিল। আবার বিভিন্ন রেফারেন্স অনুসারে, জার্মান থেকে ইংরেজিতে অনুলিপিগুলিতে প্রকাশিত হয় যে হাইজেনবার্গ এবং অন্যান্য সহকর্মী উভয়েই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্ররা বিজয়ী হওয়ায় আনন্দিত হয়েছিল।

যুদ্ধোত্তর সময়

১৯৪৫ সালে, যুদ্ধ শেষ হবার পর ইংল‍্যান্ডে গ্রেফতার করা হলো হাইজেনবার্গ, অটো হ‍্যানের মতো বিখ‍্যাত ৯ বিজ্ঞানীকে। তাদের উপর ভিন্নধর্মী এক পরীক্ষা চালানোর জন্যে ‘মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স-সিক্স’ তাদেরকে নিয়ে গেলো ‘ফার্ম হল’ নামের একটা গোপন জায়গায়। বিজ্ঞানীদের নিত‍্যদিনের কথোপকথন গোপনে রেকর্ড করতে গিয়ে তারা বুঝতে পারেন হাইজেনবার্গ ‘ইউরেনিয়াম-২৩৫’ এর ভারী আইসোটোপ পর্যন্ত চলে গিয়েছিলেন! এতো কাছে থেকেও কেন তিনি সফল হতে পারলেন না তা অনেকেরই বিস্ময়ের কারণ।

১৯৪৬ সালের ৩ জানুয়ারি, এই সব বিজ্ঞানীদের জার্মানিতে ফেরত পাঠানো হলে মু্ক্তি পায় হাইজেনবার্গ। সেই বছরেই হাইজেনবার্গ পুনরায় ‘কায়ার উইলহেলম ইনস্টিটিউট’ এ পদ গ্রহণ করেন, যা শীঘ্রই পদার্থবিজ্ঞানের জন্য ‘ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট’ নামকরণ করা হয়েছিল।

১৯৪৯ সালে, হাইজেনবার্গ আন্তর্জাতিকভাবে তার দেশের বিজ্ঞানের প্রচারের উদ্দেশ্যে ‘জার্মান গবেষণা কাউন্সিল’ এর প্রথম রাষ্ট্রপতি হন। পরবর্তীতে তিনি সরকারি অনুদান প্রাপ্ত সংস্থা ‘হাম্বল্ট ফাউন্ডেশন’ এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন। 

১৯৫১ সালে, জার্মানির হয়ে ইউনেস্কোর বিজ্ঞান সম্মেলনে তিনি যোগ দেন এবং একটি সম্মিলিত ইউরোপীয় নিউক্লীয় পদার্থবিদ্যার গবেষণাগার গড়ে তোলার দাবি রাখেন। এভাবেই গড়ে ওঠে আজকের দিনের বিখ্যাত গবেষণাগার, ‘সার্ন (CERN)’। সার্নের প্রথম ডিরেক্টর হওয়ার জন্য হাইজেনবার্গকে বলা হলে তিনি তা প্রত্যাখান করেন। তাই তাঁকে সার্নের নির্দেশিকা কমিটির প্রধান করা হয়। এই কমিটির কাজ হলো, গবেষণা কোন দিকে এগোবে তা নির্ধারণ করা।

১৯৬০ সালে, বিখ্যাত এই পদার্থবিদ ‘জার্মান’ ভাষায় তার আত্মজীবনী লিখেন। যা পরবর্তীতে ইংরেজি সহ অন্যান্য ভাষায় অনূদিত হয়।

১৯৭৪ সালে, তাকে ধর্ম এবং বিজ্ঞানের সত‍্যতা নিয়ে চিন্তার জন‍্য ‘রোমানো গার্ডিনি’ পুরস্কার দেয়া হয়। আপাতদৃষ্টিতে হাইজেনবার্গ বামপন্থী এবং নাস্তিক বলে প্রচলিত থাকলেও নিকটজনদের কাছে তিনি ছিলেন ঈশ্বরের একনিষ্ঠ বিশ্বাসী।

মৃত্যু

১ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৬ সালে, কিডনি ও পিত্তথলি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন এই বিখ‍্যাত পদার্থবিজ্ঞানী। এর পর দিন, তাঁর সহকর্মীরা কিংবদন্তি বিজ্ঞানীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সামনের দরজায় মোমবাতি স্থাপন করে পদার্থবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট থেকে তাঁর বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন।

শেষকথা

হাইজেনবার্গ এর মৃত্যুর পর ১৯৮০ সালে তার স্ত্রী  তাকে নিয়ে, ‘দ্য পলিটিকাল লাইফ অব এন এ্যপলিটিকাল পারসন’ শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি হাইজেনবার্গকে নিয়ে লিখছেন, “first and foremost, a spontaneous person, thereafter a brilliant scientist, next a highly talented artist, and only in the fourth place, from a sense of duty, homo politicus.”

আলোচিত হোক আর সমালোচিত হোক, ‘ওয়ার্নার কার্ল হাইজেনবার্গ’ একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে এই পৃথিবীর ইতিহাসের পাতা দখল করে থাকবে আজীবন।

তথ্যসূত্রঃ

১. ওয়ার ব্লেটন কাউন্সিল 

২. টেন মিনিট’স স্কুল

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button