ইতিহাসজানা-অজানা

ak-47 কেন এত জনপ্রিয়?

আশির দশকের ক্লাসিক্যাল হোক বা বিশ শতকের আধুনিকা হোক, একজন মানুষ চেতনে-অবচেতনে সর্বপ্রথম যে অস্ত্রের নামের সাথে পরিচিত হয় তা ak-47! আবাল, বৃদ্ধ,বনিতা সমাজের প্রায় সর্বোস্তরের মানুষেরই কেন এ শব্দযুগলের সাথে এতটা পরিচিতি? অস্ত্র সম্পর্কে কোনরূপ জ্ঞান না থাকা ব্যাক্তিও কেন এর নাম জানে? এর নাম ak-47’ই বা কেন হল? কিভাবেই বা তৈরি হলো এ লিজেন্ডারি অস্ত্রটি?

এ সকল প্রশ্নেরই উত্তর খোজার চেষ্টা করব আজ আমরা।

জানলে অবাক হবেন, বিশ্বের এ যাবৎকালের সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ হওয়া এ অস্ত্রটির আবিস্কারক আদতে ছিলেন একজন শৌখিন কবি! বারুদের তপ্ত গন্ধ আর কবিতার সুবাতাসো যে কোনকালে মস্তিস্কে একইসাথে অবস্থান নিতে পারে সেটাই বোধহয় প্রমাণ করে গিয়েছিলেন মিখাইল তিমোফিয়েচিভ কালাশনিকভ।

মিখাইল তিমোফিয়েচিভ কালাশনিকভ

তৎকালীন সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের বছর দুয়েক পর ১৯১৯ সালে বর্তমান রাশিয়ার কুরিয়ার নামক গ্রামে এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া মিখাইল কে দেখে কিশোরকালে মানুষ ভাবত ছেলে বোধহয় কবি হবে। জীবদ্দশয়ায় তার ছ’টি কবিতা গ্রন্থ রচিত হলেও বিশ্ব কিন্তু তাকে মোটেই একজন কবিরূপে চিনে না। কবি হওয়ার পথে তৎকালীন সোভিয়েত সরকারের সামরিক নীতিই বোধহয় তার পথে বাধ সেধেছিল। বাধ্যতামূলক রেড আর্মিতে যোগদানের বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ আমাদের কবি মিখাইল সাল ১৯৩৮’এ একজন ট্যাংক ড্রাইভার হিসেবে যোগদেন করেন রেড আর্মিতে৷ অধ্যবসায়ী মিখাইল ধীরে ধীরে ২৪তম ট্যাংক রেজিমেন্টের সিনিয়র কমান্ডার হিসেবে পদোন্নতিও পান।

রেড আর্মি

১৯৪১ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন চরমে। ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে হিটলারের বাহিনীর কাছে রিতীমত নাকানি চুবানি খাচ্ছে সোভিয়েত শক্তি। এমনই এক কঠিন সময়ে ব্রায়ানস্কের যুদ্ধে জার্মান বাহিনীর গুলিতে মারাত্বক ভাবে আহত হন মিখাইল। ছয় মাস ছুটি পেলেন মিখাইল। এ ছুটিই যেন তার জীবনে সাপে বর হয়ে দেখা দিল। আধুনিক অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত হিটলার বাহিনীর নিকট নাস্তানাবুদ সোভিয়েত ইউনিয়নের চিন্তা তাকে কোনভাবেই হাসপাতালের বেডে স্থির থাকতে দিচ্ছিল না। হাসপাতালের বেডেই স্কেচ রেডি করেন। যদিও সেটি গৃহীত হয় নি কিন্তু তার দক্ষতা প্রকাশিত হয়। ১৯৪২ সালে সোভিয়েত দের ফায়ার আর্ম গবেষণা কেন্দ্রে নিয়োগ দেয়া হয় তাকে।

১৯৪৪ সালে তিনি মিখটিম নামের একটি রাইফেল নকশা করেন যা তিনি ১৯৪৬ সালে অনুষ্ঠিত রাইফেল প্রতিযোগীতায় জমা দেন। এই নমুনাটিই পরবর্তীতে পাল্টে দিতে থাকে অটোমেটিক রাইফেলের ইতিহাস৷ কালাশনিকভের সে মিখটিম রাইফেল প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়। এরপর ১৯৪৭ সালে বিভিন্ন গবেষণা, পর্যালোচনা, বিচার, বিশ্লেষণের পর মিখাইল কালাশনিকভ তৈরি করেন এক গ্যাস চালিত অটোমেটিক মেশিনগান। automatic এবং kalashnikov এ দু’শব্দের আদ্যাক্ষর a,k এবং নির্মান সালের দু’সংখ্যা 47 কে নিয়ে এ বিখ্যাত অস্ত্রের নামকরণ করা হয় ak-47। শুরুতে রেড আর্মির কিছু নির্দিষ্ট ইউনিটে প্রচলন করানো হয় ak-47। ১৯৪৯ সাল নাগাদ পুরো সোভিয়েত সেনাবাহিনীতে পূর্ণমাত্রায় চালু হয় এ অস্ত্র। মিনিটে ৬০০ গুলি ছুড়তে সক্ষম এ অস্ত্র মাত্র দু’বছরে সোভিয়েত বাহিনীতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। সে সময় থেকে এ রাইফেল সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যতম রপ্তানী পণ্য হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে।

গ্যাসচালিত স্বয়ংক্রিয় এ অস্ত্রটি রাতারাতি প্রচলিত আগ্নেয়াস্ত্রের ইতিহাসই বদলে দেয়। জনপ্রিয়তায় এটি যেকোন ধরণের অস্ত্রকে ছাড়িয়ে যেতে থাকে এমনকি সম্প্রতি এক বিয়েতে শ্বাশুড়ি জামাইকে এ অস্ত্র উপহার হিসেবে দেয়ার ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে। পাকিস্তানের “দারা আদম খেল” নামক স্থানে আপনি চাইলে এ অস্ত্রটিকে একটি সাধারণ স্মার্ট ফোনের চাইতেও সহজলভ্য ভাবে কিনতে পারবেন।

এ অস্ত্রটি এতটা জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতন কারণ হিসেবে দেখা যায় এটি চালাতে তেমন কোন প্রশিক্ষণেরই প্রয়োজন পড়ে না। আপনি অস্ত্র চালাতে জানেন না,অস্ত্র সম্পর্কে কোন জ্ঞান নেই এগুলো কোন সমস্যাই না। ঘন্টাখানেক প্রশিক্ষণেও ak-47 চালানো শিখে ফেলার রেকর্ড রয়েছে,এমনকি একজন শিশুও খুব সহজেই এটি চালাতে পারে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার হাটু পানিতে নাকানি চুবানি খাওয়ার এটাও অন্যতম কারণ। প্রায় বিনা প্রশিক্ষণেই ভিয়েতনামিরা অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করতে নেমে পড়তে পারছিল এই ak-47 এর বদৌলতে।

এটির জনপ্রিয়তার অন্যতম আরেকটি কারণ হলো আপনি বাংলার শস্য শ্যামল প্রান্তরে হন চাই আপনি মধ্য প্রাচ্যের তপ্ত বালুমাঝারে হন চাইবা আপনি সাইবেরিয়ার বরফ খন্ডে আড়ষ্ট হন,অথবা আপনি চাইলে অস্ত্রটির উপর দিয়ে রোলারো চালিয়ে দেননা কেন, সকল আবহাওয়াতে, সকল পরিস্থিতিতে সমান ভাবে কার্যকর এ অস্ত্র যে যেকোন সেনাবাহিনীর জন্যই উপযুক্ত হবে সেটাই স্বাভাবিক।

রাইফেলটির মজার আরেকটি দিক হচ্ছে আপনি চাইলে মাত্র ৩০ সেকেন্ডেই এর অংশগুলো খুলে আবার জোড়া দেয়া সম্ভব। আবিস্কারের পর থেকে ak-47 পার করেছে সাত দশকেরো অধিক সময়। এই সময়ের মধ্যে এ আগ্নেয়াস্ত্রটি ১১০ মিলিয়নেরো বেশি বার উৎপাদিত হয়েছে। দ্যা গার্ডিয়ানের তথ্য মতে, বর্তমান বিশ্বে বিশ কোটিরো অধিক কালাশনিকভ আছে যার মানে পৃথিবীর প্রতি ৩৫ জন মানুষের কাছে একটি!

কখনো ব্যাকফায়ার না করা,জ্যাম না হওয়া এ অস্ত্রটি বর্তমান বিশ্বের ১০৬ টি দেশের সেনাবাহিনী ব্যাবহার করে থাকে। কতক দেশের পতাকাতেও দেখা যায় এ অস্ত্রের প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও এ অস্ত্রের চাইনিজ ভার্শন type-56 ব্যাবহার করে।যার পেটেন্ট ক্রয় করে বাংলাদেশ আর্মি এর নাম দিয়েছে bd-08।

এত প্রাপ্তির মাঝেও তৎকালীন সোভিয়েত সরকার করেছিলেন এক অক্ষমনীয় ভুল।করে রাখে নি এ কিংবদন্তি অস্ত্রের পেটেন্ট। যার কারণে তৎকালীন ওয়ারশ ভুক্ত দেশের মধ্যে অবাধে প্রচলিত হয় এ অস্ত্র এবং ভয়ানক আর্থিক ক্ষতিরো মোকাবিলাও করতে হয় সে দেশটিকে। যে ভুলটির আরেকটি ফলাফল হলো বর্তমান বিশ্বে বৈধ-অবৈধ উভয় পন্থায় অস্ত্রটি সমান সহজলভ্য।

ওসামা বিন লাদেন

এমনকি প্রখ্যাত জঙ্গী “ওসামা বিন লাদেনের” সকল ভিডিও তে তার পাশে সর্বদা এই ak-47 কেই দেখা যায়। মিখাইল কালাশনিকভের অবশ্য এ নিয়ে আক্ষেপেরও অন্ত ছিলো না তার মতে তিনি যখন দেখেন তার এ অস্ত্র সন্ত্রাসীর হাতে এবং তা দ্বারা নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয় তখন সেটি তার হৃদয়ে কষ্ট দেয়।

প্লে বয় ম্যাগাজিনে বিশ্বকে বদলে দেয়া ৫০ টি পণ্যের মধ্যে স্থান করে নেয়া এ কিংবদন্তি অস্ত্রের জনক লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিখাইল কালাশনিকভ ২০১৩ সালে ৯৪ বছর বয়সে শেষ নিঃশাস ত্যাগ করেন।

তিনি শেষ নিঃশাস ত্যাগ করলেও তার কীর্তি আজও মুছে যায় নি। আজো পৃথিবীর বহু মানুষের শেষ নিঃশাস টুকু কেড়ে নেয়ার উপলব্ধ হচ্ছে এই কিংবদন্তি ak-47।

মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ খাঁন (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

আরো পড়ুন;

মোঙ্গলদের পতনের ইতিহাসhttps://cutt.ly/fjT1ync

Show More

MK Muhib

A researcher,An analyst,A writer,A social media activist,student at University of dhaka.

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also
Close
Back to top button