জানা-অজানাজীবনী

তারারেঃ অদ্ভুতুড়ে খাদ্যাভ্যাসের অধিকারী পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুধার্ত মানুষ

আঠারো শতকের শেষ দিকের ঘটনা। ফ্রান্সের ‘লিঁও’ তে জন্ম নেয় এক সুস্থ ও স্বাভাবিক শিশু। বাবা মা তার নাম রাখেন ‘তারারে’। যদিও এটি তার সত্যিকারের নাম কিনা তা জানা সম্ভব হয়নি। যাইহোক, কয়েক বছর পর ই সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেন সুস্থ, স্বাভাবিক ভাবে জন্ম নেওয়া এই শিশুটি।

কিন্ত কেন? 

আজকে জানবো তারারে নামের এই অদ্ভুত শিশুটির রহস্য নিয়ে।

১৭৭২ সালে, ফ্রান্সের লিঁও’র একটি মফস্বল শহরে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয় তারারে। একটি সুস্থ স্বাভাবিক ছেলে হিসেবে জন্মগ্রহণ করলেও, তার মাত্রাতিরিক্ত খাদ্যাভ্যাস বিস্মিত করে মানুষ কে। তারারে নামের এই ছেলেটি কুকুর, বিড়াল সহ যেকোনো জীবন্ত প্রানী গিলে ফেলতে পারতো। অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্যি, কিশোর বয়সেই প্রতিদিন একটি ষাঁড়ের এক চতুর্থাংশ খেয়ে ফেলতে পারতো এই ছেলেটি। যা ছিলো তার নিজের ওজনের সমান। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া তারারের এমন খাদ্যাভাসের সাথে কুলিয়ে উঠতে হিমশিম খাচ্ছিলো তার পরিবার। তাই বাধ্য হয়েই ঘর ছাড়েন তিনি।

কয়েক বছর যাযাবরের মতো ঘুরে তারারে যুক্ত হন একটি সার্কাস পার্টির সাথে। কিন্তু তার এই অদ্ভুত খাদ্যাভ্যাস এর কারণেই সেই দলের মুল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেন তারারে। সার্কাসের অংশ হিসেবে যেকোনো কিছু খেয়ে দর্শকদের অবাক করে দিতো সে। খাবার জিনিস তো ছিলো ই, অনেক অখাদ্য জিনিস ও অনায়াসে গলাঃধকরন করতো এই ছেলেটি। প্রত্যক্ষদর্শীর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, তারারে দাঁত দিয়ে জীবিত বিড়াল ছিড়ে তার রক্ত পান করতো। এভাবে কঙ্কাল বাদে কুকুর, বিড়াল ও অন্যান্য অনেক প্রানী খেয়ে ফেলতো। পাথর, কক থেকে শুরু করে জীবন্ত ইল, কিছুই বাদ যেতো না তার খাদ্য তালিকা থেকে। এমনকি এক সাথে ১ ডজন আপেল খেয়ে ফেলার সামর্থ্য ছিলো তারারে’র।

এই অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসের কারণে স্বভাবতই পরিপাকতন্ত্রে ঝামেলা দেখা দেয় তারারে’র। যার কারণে সার্কাসের কাজ ছেড়ে দিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাকে।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এমন অদ্ভুত খাদ্যাভ্যাস থাকা স্বত্তেও তারারের ওজন ছিলো সাধারণ মানুষের মতোই। ১৭ বছর বয়সে তার ওজন ছিলো মাত্র ৪৬ কেজি। যদিও তার মুখ ছিলো অস্বাভাবিক রকমের বড়। একই সাথে ১ ডজন আপেল কিংবা ডিম মুখে নিয়ে রাখতে পারতো এই ছেলেটি। তারারের শরীর থেকে অদ্ভুত দুর্গন্ধ বের হতো বলে পারতপক্ষে কেউ তার কাছে ঘেষতো না। খাবারের পর এই দুর্গন্ধ আরো বেড়ে যেতো, শরীর অতিরিক্ত ঘামাতো, চোখ গুলো রক্তলাল হয়ে যেতো। তার শরীরের চামড়া অদ্ভুত রকম ভাবে ঝুলে থাকতো। যখন সে খাবার গ্রহণ করতো, তখন সেই চামড়া বেলুনের মতো টানটান হয়ে যেত।

১৭৮৮ সালে, ফ্রেঞ্চ আর্মিতে যোগদান করেন তারারে। সেখানেও তার এই অদ্ভুত অভ্যেস কে কাজে লাগায় ফ্রেঞ্চ আর্মি। তার দায়িত্ব ছিলো, বর্ডারে যাওয়া প্রুসিয়ানদের কাগজপত্র কিংবা দরকারি জিনিসপত্র গিলে ফেলা। যদিও আর্মিতে যোগ দেওয়ার পর খাবার নিয়েই সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয় তাকে। আর্মিদের জন্যে বরাদ্দ রেশনে তার ক্ষুধা মিটতো না বলে অন্য সৈনিকদের কাজ করে দিতেন তিনি। যার ফলে তারারের খাবারের সমস্যা দূর করতে তার রেশনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া হয় ৪ গুন। এতেও হতো না বলে, ঘাস, টিকটিকি, সাপ ও পোকামাকড় খাওয়া শুরু করেন তিনি। 

এরই মাঝে খাবারের অভাবে সমস্যায় ভুগার ফলে মিলিটারি হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি।  সেখানে ‘ব্যারন পার্সি’ নামে এক ডাক্তার তার চিকিৎসার দায়িত্ব পান। তারারে’র এমন অতিমানবীয় খাদ্যাভ্যাসের কথা শুনে যারপরনাই বিস্মিত হন ডাক্তার। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, তারারে কে পরীক্ষা করবেন।  ‘ব্যারন পার্সি’ হাসপাতালে ১৫ জন মানুষের জন্য রান্না করা দুটি ষাঁড়ের মাংস দিয়ে বানানো বড় বড় পাই ও চার গ্যালন দুধ খেতে দেন তারারে কে। তারারে একাই সেসব সাবাড় করে ঘুমিয়ে পড়লে পার্সি তার বেলুনের মতো ফুলে যাওয়া পাকস্থলি পরীক্ষা করতে বসেন। কিন্তু পরীক্ষার পরেও রহস্যের কূলকিনারা করতে পারেননি ডাক্তার পার্সি।

আর্মিতে যোগদানের কিছুদিনের মধ্যেই রাইন নদীর তীরে ফরাসি বিদ্রোহের জন্য গড়ে ওঠা ‘আর্মি অফ রাইন’ থেকে ডাক পড়ে তারারে’র। সেই মিটিংয়ে তিনি আস্ত একটি বাক্স গিলে ফেললে তার এই প্রতিভার জন্য সেনাবাহিনী তাকে সেখানকার গোয়েন্দা হিসেবে নিযুক্ত করেন এবং পুরষ্কার হিসেবে ষাঁড়ের ১৪ কেজি কাঁচা ফুসফুস দিলে সেটাও সবার সামনে খেয়ে সাবাড় করে ফেলেন তিনি। 

কিন্তু ১ বছর সাফল্যের সাথে গোয়েন্দাগিরি করার পর প্রুসিয়ান বর্ডার লাইনে প্রুসিয়ান আর্মিদের হাতে ধরা পড়েন তিনি। তখন তাদের হাতেই মারাত্মক ভাবে নির্যাতিত হন তারারে। এই ঘটনার পর আর্মিতে কাজ করার ইচ্ছা হারান তিনি।

নিজের এই অতিপ্রাকৃত খাদ্যাভ্যাসে যারপরনাই বিরক্ত হচ্ছিলেন তারারে নিজেও। তাই তিনি আবারো সেই মিলিটারি হাসপাতালে ফিরে যান। ডাক্তার পার্সিকে অনুরোধ করেন, তাকে সাধারণ মানুষের মতো স্বাভাবিক করে দিতে। ডাক্তারের অভ্যাস অনুযায়ী, পার্সি প্রথম দিকে তাকে ক্ষুধা নিবৃত্তিকারক ‘লুডেনাম’ খেতে দিতেন। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হচ্ছে না দেখে ওয়াইন, ভিনেগার, সিদ্ধ ডিম খেতে দেন। কিন্তু এত কিছুর পরেও, তারারের ক্ষুধার্ত ভাব কমা তো দূরে থাকে বরং হাসপাতালের বাইরে গিয়ে কুকুর আর কসাইয়ের দোকানের পঁচা মাংস খাওয়া শুরু করেন তারারে। বিশ্রী ব্যাপার হচ্ছে, এরপর হাসপাতালের রোগীদের থেকে নেওয়া রক্তও খাওয়া শুরু করেন তিনি। এই ঘটনার পর অন্য ডাক্তাররা তারারে কে মানসিকভাবে অসুস্থ আখ্যা দিয়ে মানসিক হাসপাতালে পাঠানোর বুদ্ধি দিলেও ডাক্তার পার্সি অস্বীকৃতি জানান। বরং তারারের উপর পরীক্ষা চালিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। 

অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, এর কদিন পরেই সেই হাসপাতাল থেকে ১৪ মাস বয়সী একটি শিশু উধাও হয়ে যায়। স্বাভাবিক ভাবেই সন্দেহ পড়ে তারারের উপর। এরপর ই হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ তারারে কে বের করে দেন।

প্রায় ৪ বছর পর ১৭৯৮ সালে, ‘ভার্সাই’ হাসপাতাল থেকে ডাক্তার পার্সি’র সাথে যোগাযোগ করে বলা হয়, তার প্রাক্তন এক রোগী তার সাথে দেখা করতে চায়। ডাক্তার পার্সি ভার্সাই হাসপাতালে গিয়ে দেখেন, এই প্রাক্তন রোগী টি হচ্ছেন ‘তারারে’। তিনি দেখেন, তারারে অনেক বেশি দুর্বল এবং রুগ্ন হয়ে গেছে। এর কারণ হিসেবে তারারে বলেন, প্রায় দুই বছর আগে তিনি একটি সোনালী কাঁটা চামচ গিলে ফেলেন।  যার কারণে তার এই দুর্বল অবস্থা। পার্সি সিদ্ধান্ত নেন, তিনি তারারের চিকিৎসা করবেন। চিকিৎসা করতে গিয়েই তিনি দেখেন, তারারের শরীরে মারাত্মকভাবে যক্ষা বাসা বেঁধেছে।

এর কয়েকদিন পরেই একইসাথে ‘ডায়রিয়া’ ও ‘যক্ষায়’ আক্রান্ত হওয়ার কারণে মৃত্যুবরণ করেন তারারে। মৃত্যুর পর তারারের শরীর অন্য মানুষের তুলনায় দ্রুতই পঁচতে শুরু করে। ‘টেসিয়ার’ নামে এক লোক তার শরীর ব্যবচ্ছেদ করে দেখতে পায়, তারারের পাকস্থলি, খাদ্যনালী, যকৃত ও পিত্তকোষ স্বাভাবিক এর চেয়ে অনেক বেশি বড়। তার পাকস্থলী আলসার এবং পুঁজে ভরপুর। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, তার পেটের ভেতরে থাকা সেই সোনালী কাঁটা চামচটি খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে কি সেটি পরিপাক হয়ে গেছে! সেটা জানা সম্ভব হয়নি যদিও।

অতিমানবীয় খাদ্যভ্যাস রহস্যের কূলকিনারা করার আগেই মাত্র ২৬ বছর বয়সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন এই অদ্ভুত মানুষ টি। যদিও এমন অস্বাভাবিকতার মাঝে এটাই ছিলো একমাত্র স্বাভাবিক ঘটনা।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button