ইতিহাসজীবনী

জাপানের দীর্ঘতম সময়ের শাসক ‘সম্রাট হিরোহিতো ‘

মিচিনোমিয়া হিরোহিতো’র জন্ম ১৯০১ সালের ২৯ এপ্রিল টোকিওর ‘আওয়ামা’ রাজপ্রাসাদে। তিনি ছিলেন জাপানের ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সম্রাট। ২৫ ডিসেম্বর, ১৯২৫ সালে ক্ষমতায় এসে ১৯৮৯ সালে মৃত্যু পূর্ব পর্যন্ত টানা ৬৩ বছর জাপানের ১২৪ তম সম্রাট হিসেবে সাম্রাজ্য বিস্তার করেন তিনি।

ইতিহাস পর্যালোচনা করেলেই দেখতে পাই, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে আলোচিত এবং বিতর্কিত হয়েছেন এই দীর্ঘস্থায়ী সম্রাট। একই সাথে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়।

ব্জন্মের পর হিরোহিতো’র নাম দেওয়া হয় ‘মিচি’। তিনি ক্রাউন প্রিন্স ইউশিহিটো, পরে সম্রাট তিশো, এবং ক্রাউন প্রিন্সেস সাদাকো (এম্প্রেস টিমেই) এর প্রথম পুত্র ছিলেন। হিরোহিতোর দাদা ‘সম্রাট মেইজি’ তখন জাপানের সাম্রাজ্য পরিচালনা করত। পরবর্তীতে ১৯১২ সালে, সম্রাট মেইজির মৃত্যুর পর সম্রাট ইউশিহিটো ‘সম্রাট তাইশো’ হিসেবে রাজসিংহাসন গ্রহণ করেন।

হিরোহিতো ১৯০৮ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত অভিজাত দের জন্যে পরিচালিত এমন একটি ভিন্ন স্কুলে দীক্ষা লাভ করেন। ১৯১৪ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত মুকুট রাজকুমার হিসেবে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় তাকে। এরই মধ্যে তিনি জাপানের সামরিক বাহিনী ও নৌবাহিনীতে সহকারী লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশনপ্রাপ্ত হন এবং ‘গ্র্যান্ড কর্ডন অফ দ্য অর্ডার অফ ক্রাইস্যান্থেমাম’ হিসেবে সম্মানীত হন।  ১৯১৪ সালে, পদোন্নতি পেয়ে সামরিক বাহিনীতে লেফটেন্যান্ট ও নৌবাহিনীতে উপ-লেফটেন্যান্ট পদ পান তিনি এবং ১৯১৬ সালে, তিনি সামরিক বাহিনীর ক্যাপ্টেন ও নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট এ পদোন্নতি লাভ করেন। 

১৯১৬ সালে, হিরোহিতোকে জাপান সাম্রাজ্যের যুবরাজ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

                          চিত্রঃ রাজা পঞ্চম জর্জের সাথে যুবরাজ হিরোহিতো (১৯২১)

১৯২১ সালের ২১ নভেম্বর, হিরোহিতো যখন বাড়ি ফিরে আসেন, তখন জাপানের রিজেন্ট এর নামে তার নামকরণ করা হয়। তার পিতা স্নায়বিক সমস্যা দ্বারা আক্রান্ত হওয়ায় রাজ্য শাসন করতে অক্ষম হয়ে পড়লে সম্রাটের দায়িত্ব গুলো পরিচালনার দায়িত্ব নেন হিরোহিতো। 

১৯২৩ সালের সেপ্টেম্বরে, টোকিওতে ‘দ্য গ্রেট কান্তো আর্থকোয়েক’ হওয়ার ফলে প্রায় ১ লাখ মানুষ মারা যায় এবং ৬৩ শতাংশ ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। তখন বিভিন্ন জায়গায় লুটতরাজ ও আগুন লাগানো শুরু হলে জাপানিরা এর জন্যে কোরীয় ও বামপন্থীদের দায়ী করে হাজার হাজার কোরীয় ও বামপন্থীদের মেরে ফেলে। এর রেষ ধরে ডিসেম্বরেই হিরোহিতোর উপর গুপ্তহত্যার চেষ্টা করা হয়।।

১৯২৫  সালের ২৫ শে ডিসেম্বর, বাবার মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেন হিরোহিতো। তখন জাপান পৃথিবীর অন্যতম ক্ষমতাধর দেশগুলোর একটি। যদিও হিরোহিতোর প্রাথমিক শাসন ছিল অত্যন্ত অবাধ্য।

তার শাসনামলে তিনি চীন ও পার্ল হারবারে আক্রমণ করেন  এবং অবশেষে মিত্রশক্তির কাছে জাপানি জোটের আত্মসমর্পণের সভাপতিত্ব করেন।  

                                  চিত্রঃ সম্রাট হিরোহিতোর রাজ্যাভিষেক

অনেক ইতিহাসবিদ ই মনে করেন, হিরোহিতো প্রকৃত অর্থে ক্ষমতাহীন সম্রাট ছিলেন। তাদের মতে, সম্রাট সামরিক সিদ্ধান্তদাতাদের অনুমতিতে সিদ্ধান্ত দেন। 

কিন্তু অনেক বিদ্বান ব্যক্তিই এই ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। হার্বার্ট পি. বিক্স (পুলিৎজার পুরষ্কারপ্রাপ্ত) উল্লেখ করেছেন, হিরোহিতোকে যতটা কম ক্ষমতাসম্পন্ন হিসেবে দেখানো হয়, আসলে তিনি তার থেকে অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন ছিলেন। তার বেশ কিছু কাজের মধ্যে দিয়েই এই বক্তব্যে সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো ১৯২৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনা টি।

১৯৩১ সালে, জাপানী সামরিক অফিসাররা রেললাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে চীনা দস্যুদের দায়ী করে এবং টোকিও থেকে আদেশ গ্রহণ ছাড়াই জাপানী সেনাবাহিনী উত্তর-দক্ষিণ চীনের মাঞ্চুরিয়া প্রদেশ দখল করে নেয়। 

১৯৩২ সালের জানুয়ারি তে, কোরীয় স্বাধীনতাকামী কর্মী লি বং-চাং একটি হাতবোমা ছুড়ে মেরে হিরোহিতো কে হত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ১৯৩৭ সালের শীতকালে জাপানি সেনাবাহিনী নানকিং এবং তার আশেপাশে প্রায় ২ লক্ষ সাধারণ মানুষ এবং যুদ্ধবন্দীকে হত্যা এবং ধর্ষণ করে। কিন্তু সেনাবাহিনী কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ভয়ে এসব ঘটনায় হিরোহিতো কাউকে শাস্তি প্রদানের পরিবর্তে নিশ্চুপ ছিলেন।।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাথমিক অবস্থায় সামরিক বাহিনীর নির্দেশনা মোতাবেক হিরোহিতো বিজয় লাভের ঘোষণা প্রচার করলেও নাগাসাকি তে পারমাণবিক বোমা হামলা যুদ্ধের মোড় পাল্টে দিয়েছিল।

                   চিত্রঃ হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা হামলার পরবর্তী অবস্থা

নিশ্চিত হার জানা সত্ত্বেও, এর আগে হিরোহিতো আত্মসমর্পণ করেনি। এমনকি ৬ আগস্ট হিরোশিমা তে পারমাণবিক বোমা হামলার পরও হিরোহিতো নিজে বা সংসদ সদস্যরা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে রাজি হননি। শেষপর্যন্ত ৯ আগস্ট নাগাসাকি তে বোমা হামলার পরে ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট সম্রাট হিরোহিতো একটি রেডিও সম্প্রচারের মাধ্যমে জাপানের আত্মসমর্পণ ঘোষণা করেন। এছাড়াও  যাদের তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য আগে অনুমতি দিয়েছিলেন, পরবর্তীতে তাদেরকে কঠিনভাবে প্রতিরোধ করে যুদ্ধ থেকে দূরে সরে আসার চেষ্টা করেছিলেন।

                              চিত্রঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিরোহিতো’র আত্মসমর্পণ 

১৯৪৭ সালে, হিরোহিতো হিরোশিমা পরিদর্শনকালে এর ভয়াবহ রূপ দেখে যুদ্ধে নিজের ভূমিকা সম্পর্কে অনুতাপবোধ করেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শোক প্রকাশ করেন। এই অনুতাপ বোধ থেকেই পরবর্তীতে তিনি জাপানের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করে গেছেন।

১৯৭১ সালে,  হিরোহিতো প্রথম বারের মতো ইউরোপ ভ্রমন করে।

                                  চিত্রঃ হিরোহিতো’র ইউরোপ ভ্রমন

১৯৭৫ সালে, তিনি যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমনকালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ফোর্ডের সাথে দেখা করেন। এছাড়াও তিনি ডিজনিল্যান্ড এ ও ভ্রমণ করেন।

                    চিত্রঃ প্রেসিডেন্ট ফোর্ডের সাথে বৈঠককালে হিরোহিতো 

তার সারাজীবনের ইচ্ছে অনুযায়ী ‘মেরিন বায়োলজি’ নিয়ে গবেষণা করেন এবং বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণাপথ প্রকাশ করেন।

১৯২৪ সালে, যুবরাজ ও রিজেন্ট হিরোহিতো বিয়ে করেন রাজকুমারী ‘নাগাকো কুনি’ কে।ব্যাক্তিগত জীবনে তিনি ৭ সন্তানের জনক ছিলেন। তার পুত্র ‘আকিহতো’ পরবর্তীতে সম্রাট হিসেবে অভিহিত হন।

   চিত্রঃ সম্রাট হিরোহিতো এবং তার স্ত্রী নাগাকো কুনি

১৯৮৯ সালের ৭ জানুয়ারি, জাপানের রাজপ্রাসাদে দুরারোগ্য ব্যাধি কান্সারে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্য বিস্তারের অবসান ঘটে এই বিখ্যাত সম্রাটের।

মৃত্যু-পরবর্তীকালে জাপানে আনুষ্ঠানিকভাবে তার নতুন নামকরণ করা হয় ‘সম্রাট শোয়া’ বা ‘শোয়া সম্রাট’।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

৩ Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button