ইতিহাসজানা-অজানা

খুলনা জেলার ইতিহাস

খুলনা বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে রূপসা এবং ভৈরব নদীর তীরে অবস্থিত একটি প্রশাসনিক এলাকা। এই জেলার মোট আয়তন ৪৩৯৪.৪৫ বর্গ কিলোমিটার। খুলনা জেলার উত্তরে যশোর ও নড়াইল জেলা; দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর; পূর্বে বাগেরহাট জেলা এবং পশ্চিমে সাতক্ষীরা জেলা অবস্থিত। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, এই জেলার মোট জনসংখ্যা ২৩,১৮,৫২৭ জন। 

Khulna District - Wikipedia

চিত্র: বাংলাদেশ এর মানচিত্রে খুলনা জেলা

প্রশাসনিক পটভূমি

১৮৩৬ সালে,  খুলনা পৌর এলাকা  যশোর জেলার মুরলী থানার অন্তর্গত ছিল। পরবর্তীতে, রূপসা নদীর পূর্ব পাড়ে তালিমপুর, শ্রীরামপুর (রহিমনগর) এর নিকটে সুন্দরবনের জঙ্গল কেটে নতুন থানা স্থাপন করা হয়। যার নাম দেয়া হয় নয়াবাদ। ১৮৪২ সালে, খুলনা মহকুমার জন্ম হয়। ১৮৬১ সালে, ২৪ পরগনা জেলার অধীন সাতক্ষীরা মহকুমা এবং ১৮৬৩ সালে যশাের জেলার অধীন বাগেরহাট মহকুমা সৃষ্টি করা হয়। পরবর্তীতে ১৮৮২ সালে, খুলনাকে একটা পৃথক জেলা হিসেবে ঘােষণা করা হয়। সেই সাথে নতুন জেলায় প্রাক্তন যশাের জেলার খুলনা ও বাগেরহাট মহকুমা এবং ২৪ পরগনা জেলার সাতক্ষীরা মহকুমা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

খুলনা জেলা ৯ টি উপজেলা, ১৪ টি থানা, ৬৮ টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত।   

নামকরণের ইতিহাস

কথিত আছে, খুলনার প্রাচীন জনপদের নাম ছিলো সপ্তগাঁও। খুলনা নামের উৎপত্তি সম্পর্কে অনেক ধরনের মতভেদ রয়েছে। ।তবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত মতগুলোর একটি হচ্ছে, প্রাচীন বাংলার এক ধনপতি সওদাগর তার স্ত্রী খুল্লনা’র নামে ভৈরব নদ এর পূর্বতীর ঘেসে ‘খুল্লনেশ্বরী’ নামে একটি মন্দির তৈরি করেন। যা কালের বিবর্তনে পরিবর্তিত হয়ে ‘খুলনা’ নাম ধারন করে।

 অনেকের মতে, ১৭৬৬ সালে ‘ফলমাউথ’ জাহাজের নাবিকদের উদ্ধারকৃত রেকর্ডে লিখিত Culnea শব্দ থেকে খুলনা নামের উৎপত্তি। 

এছাড়াও বৃটিশ আমলের মানচিত্রে লিখিত Jessore-Culna শব্দ থেকে খুলনা এসেছে বলেও অনেকের ধারণা।

আবার খুলনা নামের উৎপত্তি সম্পর্কে লোকমুখে একটি কাহিনি প্রচলিত আছে। খুলনা অঞ্চলের পাশ দিয়ে বয়ে যেত বিশাল ভৈরব নদ যেখানে ঝড় উঠলে ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করত। তখন মাঝিদের জীবন বাঁচাতে ‘খুলোনা, খুলোনা’ বলে সতর্ক করে দিতেন। এ ‘খুলোনা’ শব্দ থেকেই খুলনা নামের উৎপত্তি।

তবে আসলেই কিভাবে খুলনা নাম টি এসেছে সে সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি এখনো। 

১৯৭১ এ খুলনা জেলা 

১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে খুলনা জেলার রয়েছে ব্যাপক অবদান। মুক্তিযুদ্ধে খুলনা জেলার বড় অংশ ছিল নবম সেক্টরভুক্ত। গেরিলা যুদ্ধ এবং সম্মুখ যুদ্ধের মাধ্যমে যুদ্ধের ৯ মাস ই খুলনায় যুদ্ধ চলে। 

খুলনার সাতক্ষীরা থেকে ব্যাংক অপারেশনের মাধ্যমে উদ্ধারকৃত এক কোটি পচাত্তর লক্ষ টাকা নিয়েই নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারের যাত্রা শুরু হয়। যুদ্ধচলাকালীন খুলনার শিরোমণি নামক স্থানে ঐতিহাসিক ট্যাংক যুদ্ধ হয়। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় ভুল বোঝা-বুঝির কারণে খুলনা তেই ভারতীয় বিমানের আঘাতে ধ্বংস হয়  স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের যুদ্ধ জাহাজ পদ্মা ও পলাশ।

খুলনা জেলা স্বাধীন হয় ১৯৭১ এর ১৭ ই ডিসেম্বর। 

খুলনা জেলার নদনদী 

খুলনা জেলার প্রধান নদী রূপসা ও ভৈরব। এছাড়া ও শিবসা, পশুর, কপোতাক্ষ, আড়পাঙ্গাশিয়া, কুঙ্গা, মারজাত, আঠারবাকি, ভদ্রা, বুড়িভদ্রা, শাকবাড়িয়া, শেলমারী, অর্পণগাছিয়া, কাজিবাছা, চিত্রা, ডাকাতিয়া, নবগঙ্গা, তেলিগঙ্গা-ঘেংরাইল, ঘনরাজ, মারজাত, নলুয়া, কাঁকরী, ঝপঝপিয়া নামে আরো বেশ কিছু নদী রয়েছে।

                             চিত্রঃ রূপসা নদীর উপরে খান জাহান আলী ব্রিজ, খুলনা

দর্শনীয় স্থান

সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার খুলনা জেলায় বাংলাদেশের দ্বিতীয় সমুদ্র বন্দর মংলা সমুদ্র বন্দর অবস্থিত এবং খুলনা শিল্প ও বাণিজ্যিক এলাকা হওয়ায় খুলনাকে বাংলাদেশ এর শিল্প নগরী হিসেবে ডাকা হয়। এই জেলার দর্শনীয় জায়গা ও ঐতিহাসিক স্থানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো; সুন্দরবন, সুন্দরবনের বিভিন্ন পর্যটন স্পট (করমজল, দুবলার চর, কটকা, হিরণ পয়েন্ট), কুঠিবাড়ি, দক্ষিণডিহি, পিঠাভোগ, বঙ্গবন্ধু আইল্যান্ড, রাড়ুলী, সেনহাটি, বকুলতলা, মান্দারবাড়ি সমুদ্র সৈকত, কচিখালী সমুদ্র সৈকত, বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের সমাধি সৌধ, চুকনগর, গল্লামারী, খানজাহান আলীর বড় দীঘি, মহিম দাশের বাড়ি,কটকা সমুদ্র সৈকত, খলিশপুর সত্য আশ্রম, শিরোমণি স্মৃতিসৌধ ইত্যাদি।

                                                     চিত্রঃ হিরণ পয়েন্ট 

                                           চিত্রঃ দুবলার চর

                                         চিত্রঃ কটকা বীচ

কৃতি ব্যক্তিবর্গ

খুলনা জেলা অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের জন্মস্থান হিসেবে সকলের নিকট অত্যাধিক পরিচিত।  তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ হচ্ছেন, খান জাহান আলী, কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, মৃণালিনী দেবী (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহধর্মিনী),  ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের তিনজন অন্যতম ব্যক্তিত্ব এবং অগ্নিযুগের বিপ্লবী;রসিকলাল দাস, অতুল সেন, অনুজাচরণ সেন। এছাড়াও অভিনেতা ওমর সানী ও অভিনেত্রী মৌসুমি এবং বাংলাদেশী  ক্রিকেটার আব্দুর রাজ্জাক,শেখ সালাহউদ্দিন আহমেদ, এনামুল হক, মেহেদী হাসান, সালমা খাতুন, রুমানা আহমেদ, জাহানারা আলম এর মতো উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের জন্মস্থান এই খুলনা জেলাতেই।

তথ্যসূত্রঃ 

১. বাংলাদেশ টাইমস

২. উইকিপিডিয়া 

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also
Close
Back to top button