ইতিহাসজীবনী

কোসেম সুলতানঃওসমানী সাম্রাজ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী নারী

২রা সেপ্টম্বর,১৬৫১,তোপকাপি প্রাসাদের বারান্দা দিয়ে হেঁটে চলেছেন ওসমানী সাম্রাজ্যের সুলতান ৪র্থ মেহমেদের মাতা কোসেম সুলতান। সাথে রয়েছে ৪ জন ভৃত্য। প্রভাবশালী এই নারীর চলন-বলনে ছিল আভিজাত্য আর ক্ষমতার দাপট। কিন্তু ২রা সেপ্টেম্বরের সেই রাতে,তার ক্ষমতার অবসান ঘটে। বারান্দায় হাঁটা অবস্থায়,’লম্বু সুলেমান’নামে এক গুপ্তঘাতক এসে তার গলায় ফাঁস আটকে ধরে। তার ভৃত্যদের অস্ত্রের  মুখে জিম্মি করা হয়। তাদের অসহায় চোখের সামনে হত্যা করা হয় কোসেম সুলতানকে। কি কারণে এই হত্যাকান্ড? এর জন্য আমাদের অনেক পেছনে চলে যেতে হবে।    

কোসেম সুলতান

গ্রীসের তিনোস দ্বীপে এক খ্রিষ্টান যাজকের এক অপরুপ সুন্দরী কন্যা ছিল। তার নাম ছিল আনাস্তাসিয়া। কিন্তু তার সৌন্দর্য তার কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বসনিয়ান দাস ব্যবসায়ীদের হাতে অল্প বয়সে অপহরণের শিকার হতে হয় আনাসতাসিয়াকে।১৫ বছর বয়সে তার ঠাই হয়,ওসমানী সুলতান আহমেদের হেরেমে। সেখানে  ধর্মান্তিরত হবার পর,তার নাম রাখা হয়, মেহফিকির বা চাঁদের মত মুখ। শীঘ্রিই নিজের বুদ্ধি,তেজ আর সাহসের জন্য হেরেমে পরিচিতি লাভ করেন মেহফিকির। সুলতান আহমেদও তাকে দেখে প্রেমে পড়ে যান। কোসেমের ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণের শুরু সেখান থেকেই। ১৬০৪ সালে সুলতান আহমেদের প্রতাপশালী দাদী সাফিয়ে সুলতানের অবসর আর সুলতানের মাতা হানদান সুলতানের মৃত্যুর কারণে হেরেমে কোসেমের প্রভাব বেড়ে যায়। তার নাম মেহফিকির থেকে কোসেম,সুলতান নিজেই রাখেন। কোসেম মানে ‘পালের রাজা’।যা হেরেমে তার প্রভাবের কথা মনে করিয়ে দেয়। শীঘ্রই কোসেম তার হাসেকি সুলতান বা প্রধান সুলতানা হিসেবে গ্রহণ করেন সুলতান আহমেদ। হেরেমে থাকা অবস্থায় তার প্রভাব বজায় রাখতে শুরু করেন কোসেম। সুলতান আর তার ঘরে ৪ জন শাহজাদা আর ৪ জন শাহজাদীর জন্ম হয়। যাদের মধ্যে দু’জন পরবর্তীতে সুলতান হন। তিনি নিজের সন্তান ছাড়াও হেরেমের অন্য সুলতানাদের সন্তানদেরও তিনি বড় করেছেন বলে জানা যায়। যার মধ্যে শাহজাদা ২য় ওসমান উল্লেখযোগ্য।যিনি পরবর্তীতে সুলতান হয়েছিলেন।

সুলতান আহমেদ

১৬১৭ সালে মাত্র বাইশ বছরে বয়সে সুলতান আহমেদের মৃত্যুর পর,ক্ষমতায় আসেন আহমেদের ভাই প্রথম মুস্তাফা। কিন্তু সুলতান হিসেবে তিনি ছিলেন চরম অযোগ্য।ফলে এক বছরের মাথায় ক্ষমতায় আনা হয় শাহজাদা ২য় ওসমানকে। ২য় ওসমান ছিলেন অল্পবয়সী। শাসক হিসেবে যোগ্য কিন্তু তার সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিলো,হেরেমে তার কোনো প্রতিনিধি ছিল না। সুলতান আহমেদের মৃত্যুর পর,কোসেমকে পুরানো প্রাসাদে নির্বাসন দেয়া হয়। সুলতান ওসমান চেয়েছিলেন,কোসেম যেন তার প্রতিনিধি হন। কিন্তু কোসেম তাকে ফিরিয়ে দেন। এর পেছনে কোসেমের দূরদর্শীতা ছিল। মূলত ওসমানী সাম্রাজ্যের প্রভাবশালী জেনিসারি বাহিনীর সাথে দ্বন্দে জড়িয়ে পড়েছিলেন সুলতান ২য় ওসমান। তিনি জেনিসারি ভেঙ্গে আলাদা সেনাবাহিনী গঠন করতে চেয়েছিলেন। শীঘ্রই জেনিসারিরা অভ্যূত্থান ঘটিয়ে ২য় ওসমানকে হত্যা করে।আর আবার সুলতান মুস্তাফাকে ক্ষমতায় বসায়।ইতিহাসে এই প্রথম এলিট জেনিসারিদের হাতে খুন হলেন কোনো ওসমানী সম্রাট। বলা হয়,এই অভ্যূত্থানে কোসেমের হাত ছিল।ফলে জেনিসারিদের মাঝে কোসেমের জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। কিন্তু দুঃসময় যেন পিছু ছাড় ছিল না, অটোমানদের।সুলতান হিসেবে চরম অযোগ্যতার পরিচয় দেয়া মুস্তাফা,ধীরে ধীরে তার মানসিক ভারসাম্য হারাতে শুরু করেন তিনি। তার কাজকর্মে প্রাসাদে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এবারও কোসেম তার কূটচাল প্রয়োগ করেন। তার প্ররোচনা আর কয়েকজন পাশার ষড়যন্ত্রে হত্যা করা হয় সুলতান মুস্তাফাকে। কোসেম এবার ক্ষমতায় আনেন তার পুত্র ৪র্থ মুরাদকে।

সুলতান ৪র্থ মুরাদ

৪র্থ মুরাদ যখন ক্ষমতায় আসেন।তিনি ছিলে অপ্রাপ্তবয়স্ক। ফলে পর্দার আড়ালে ক্ষমতার আসল চালক হয়ে যান কোসেম। তবে শুরুতে ঘরে বাইরে,দু’দিক থেকে শত্রুদের দ্বারা আক্রান্ত হন তিনি। একদিক ইউরোপ আরেকদিকে পারস্য।দুই ফ্রন্টে শত্রুরা তাকে আক্রমণ করে বসে। তবে ধৈর্য হারাননি কোসেম। সুকৌশলে তিনি তাদের সাথে শান্তি স্থাপন করেন। তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা পাশাদের খুঁজে বের করে,একে একে হত্যা করেন।এরই মাঝে পুত্র মুরাদ বড় হয়ে যায়। তবে সাম্রাজ্যে নতুন করে অশান্তি দেখা দেয়। অনেক সামন্ত রাজা বিদ্রোহ করে বসে। সুলতান ৪র্থ মুরাদ নৃশংস কায়দায় এসব বিদ্রোহ দমন করেন। ওসমানী পতাকার লাল রঙের মত সাম্রাজ্যের মাটিও লাল হয়ে যায়।

তবে ৪র্থ মুরাদের এই ত্রাসের রাজত্ব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। একদিন হুট করেই লিভারের জটিল রোগে মারা যান তিনি। ফলে আবার নতুন সংকটের মুখে পড়ে ওসমানী সাম্রাজ্যে। এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে এবার কোসেম তার বেঁচে থাকা সর্বশেষ পুত্র ইব্রাহিমকে সুলতান হিসেবে নিয়ে আসেন। কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন আর উন্মাদ প্রকৃতির ইব্রাহিমের এই ক্ষমতা গ্রহণ আসলে ছিল কোসেমেরই প্রচ্ছন্ন ক্ষমতা গ্রহণ। কিন্তু উন্মাদ একজন ব্যাক্তিকে ক্ষমতায় আনার ফল শীঘ্রই টের পেল ওসমানীরা। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য,ইব্রাহিম মানসিকভাবে অসুস্থ হবার পেছনে তার মায়ের দায় কম ছিল না। ইব্রাহিম সবসময় আশংকা করতেন,তার ভাই মুরাদ তাকে মেরে ফেলবে। এই আতঙ্ক তাকে উন্মাদে পরিণত করেছিল।এমনকি মুরাদের মৃত্যুর সংবাদ তিনি বিশ্বাস করেননি। নিজের হাতে লাশ পরিক্ষা করে তিনি নিশ্চিত হন,মুরাদ মারা গেছেন। তবে ইব্রাহিম আসলে কখনই সুস্থ হননি। তার অসুস্থতার প্রভাবে চারদিকে অরাজকতা বেড়ে গেল। প্রজারা খাবারের অভাবে পথে নামলো। ফলে কোসেম তার পাশাদের সাথে যোগাযোগ করে সিদ্ধান্ত নিলেন,ইব্রাহিমকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে কোসেমের এক নাতিকে ক্ষমতায় আনা হবে। তবে ইব্রাহিমের পক্ষেও লোক ছিল। কিছু পাশা কোসেমের সাথে প্রতিদ্বন্দিতার কারণে ইব্রাহিমের পেছনে দাঁড়ান। আর এই পরিকল্পনার কথা ফাঁস করে দেন। ফলে কোসেমের সাথে থাকা পাশাদের হত্যা করা হয়। আর কোসেমকে করা হয় নির্বাসিত। তবে তা অল্প সময়ের জন্য,তবে শীঘ্রই জেনিসারিদের বিদ্রোহে উসকে দেন কোসেম। ফলে আবারও এক অভ্যুত্থানে সুলতান ইব্রাহিম প্রথমে ধৃত এবং পরবর্তীতে কোসেমের আদেশে নিহত হন। কোসেম এইবার ক্ষমতায় আনেন তার ৭ বছরের নাতি ৪র্থ মেহমেদকে।

তোপকাপি প্রাসাদ

নিয়ম অনুযায়ী,সুলতানের মা তুরহান সুলতানের সাম্রাজ্যের প্রধান হবার কথা। কারণ,তিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক সুলতানের প্রধান অভিভাবক। কিন্তু তাকে এই সুযোগ না দিয়ে কোসেমই হয়ে ওঠেন সরকার প্রধান। তুরহান বুঝতে পারেন,তার শাশুড়ির মৃত্যু না হলে তিনি কখনই ক্ষমতা হাতে পাবেন না। তাছাড়া ভেতরে থাকা গুপ্তচরেরা খবর দিয়েছে,তুরহানের উচ্চভিলাষ নিয়ে কোসেম সুলতান বেশ শঙ্কিত। শীঘ্রই মেহমেদকে সরিয়ে আরেকজন নাতিকে ক্ষমতায় আনবেন তিনি। তাই দ্রুত কোসেমকে হত্যার ছক কষেন তুরহান।

কোসেম সুলতানের সমাধি

২রা সেপ্টেম্বরের সেই রাতের পর,দ্রুত কোসেম সুলতানের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে। জেনিসারিদের কাছে ভীষণ জনপ্রিয় এই সুলতানার মৃত্যুতে যাতে তারা বিদ্রোহ না করে। সেজন্য তাদের মাঝে খবর ছড়িয়ে দেয়া হয়, বারান্দা থেকে পড়ে যান কোসেম।তারপর নিজের চুলের সাথে ফাঁস লেগে মারা যান তিনি।সেনারা এই কথা বিশ্বাস করেনি,তবে কোসেমের মৃত্যুতে তাদের মনোবল ভেঙ্গে যায়।তারা তাকে নাম দেয়, ‘শহীদ সুলতানা’। দু’দিন পর, তোপকাপি প্রাসাদ চত্বরের স্বামীর কবরের পাশে সমাহিত হন কোসেম। আর এভাবেই ওসমানী সাম্রাজ্যের কোসেম অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button