জীবনী

কাজি ঈসমাইল হোসেন সিরাজীঃউপমহাদেশের মুসলিম জাগরণের পথিকৃত

নানা সমস্যায় জর্জরিত ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষকে মুক্তি দেওয়ার জন্য যারা কলম হাতে নিয়ে ছিলেন। জানিয়ে ছিলেন মুক্তির উপায় । যাদের জবানিতে ছিল  আত্নত্যাগের গান।  ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি।  তাদের মধ্যে সর্বাধিক অগ্রগণ্য এবং বতমান প্রজন্মের কাছে অপরিচিত সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী।  তিনি ছিলেন স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরী । শৈশবকালেই কলম হাতে নিয়ে ছিলেন  স্বাধীনতার   জন্য । বড় হয়ে  লেখনী আর ভাষণ দুটো চালিয়েছেন সমানভাবে তার বাগ্মীতায় কেঁপে উঠত ব্রিটিশ সিংহাসন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে লিখেছিলেন অনল প্রবাহ।

১৮৮০ সালের ১৩ জুলাই ব্রিটিশ ভারতের পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। জন্মস্থানের সম্মানে নামের শেষে সিরাজী পদবী যুক্ত করেন । তার পিতা সৈয়দ আব্দুল করিম ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা।আর মাতা সে সময়কার অন্যতম বিদুষী মহিলা নূরজাহান বেগম।শৈশবে তিনি স্থানীয় পাঠশালায় এবং জ্ঞানদায়িনী মাইনর ইংরেজী স্কুলে পড়েন। তারপর সিরাজগঞ্জ বনোয়ারী লাল হাই স্কুলে নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা  করেন। সংস্কৃত ভাষা বাড়িতে শিখে ছিলেন  ।ফার্সি শিখেছিলেন পাঠশালায়। এছাড়া সংস্কৃত ব্যকরণ ও সাহিত্য, হিন্দুশাস্ত্র যেমন বেদ, মনুস্মৃতি ও উপনিষদ প্রভৃতি অধ্যায়ন করে ছিলেন। মুসলিম গণজাগরণ , হিন্দু মুসলমান ভাতৃত্ববোধ স্থাপন, নারী শিক্ষা আন্দোলন , মাদ্রাসা শিক্ষায় ইতিহাস, ভূগোল্‌ , বিজ্ঞান অন্তর্ভুক্তকরণ ,মুসলমানদের বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ, কৃষক প্রজার দুর্দশা মোচন এসবের জন্য সংগ্রাম করে গেছেন আমৃত্যু । কলকাতার আলবার্ট  হলে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বলেছিলেন,’’হিন্দু মুসলমানের অন্তরে সমভাবে দেশপ্রেম সৃষ্টির কাজে যাহারা আমাদের পথ প্রদশন করিয়াছেন নিঃসন্দেহে সিরাজী সাহেব তাদের অগ্রণী।“ 

ঈসমাইল হোসেন সিরাজীর স্মরণে বিশেষ স্মারক ডাক টিকেট

স্বাধীনতার প্রত্যাশায় নির্যাতন, নিপীড়োন, কারাবাস, অত্যাচারে কিছুই তাকে বেঁধে রাখতে পারেনি। ব্রিটিশ সরকারের হুমকী কিংবা পুলিশের হাতকড়া কিছুই দমাতে পারেনি তাকে। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা মানবতার মুক্তির জন্য ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত। তিনিই উপমহাদেশের প্রথম কবি যিনি স্বাধীনতার জন্য জাতীয় জাগরনের জন্য কবিতা লিখে কারাবাস করেন। শুধু কি তাই? তার প্রতিবাদি কন্ঠ রোধ করার জন্য তার সভাস্থলে  ব্রিটিশ সরকার ৮২ বার ১৪৪ ধারা জারি করেছিল। তার লেখনীতে ফুটে উঠেছে ইসলামের ইতিহাস ঐতিহ্য।  তিনি বলেছেন,” মুসলমানদের বিশ্ব সভ্যতায় স্থান নিতে হলে তাদের ডান হাতে কোরান আর বাম হাতে বিজ্ঞান নিতে হবে। নারী শিক্ষাকে উৎসাহিত করে তিনি ১৯০৪ সালে তিনি বলেছিলেন,”পুরুষ সমাজের দেহ আর মাতৃজাতি সেই সমাজের আত্মা।“ তিনি নির্ভীক কন্ঠে বলেছেন,” যাহারা নারীকে পেছনে রাখিয়া অন্ধ অন্তঃপুরের বেষ্টনে বেষ্টিত রাখিয়া জাতীয় জাগরণের কল্যাণ কামনা করে, আমার বলিতে কুন্ঠা নাই, তাহারা মহামুর্খ।“  

ইসমাইল হোসেন সিরাজী শুধু মুখে এসব বলেছেন তা নয়, তিনি পথ প্রদর্শনের জন্য নিজের ৬ বছরের শিশুকন্যাকে ঢাকার ইডেন ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করে হোস্টেলে রেখে যান। তিনি পুরুষ সমাজের কাছে আবেদন করেছেন,” এ বঙ্গে যদি কেহ জাতীয় উত্থানকারী তেজোদীপ্ত মহাপ্রাণ পুরুষ থাকে তবে সর্বাগ্রে মাতৃজাতিকে সুশিক্ষার বন্দোবাস্তকরত অধঃপতনের খরস্রোত রুদ্ধ করিতে বদ্ধ পরিকর হও। নারী শক্তিকে জাগাইতে না পারিলে সন্তানের শক্তি, সন্তানের প্রাণ আশিবে কোথা হইতে? তাই বলতে হয় বর্তমানে যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে নারিকে ঘরে বন্দি করে রাখতে চায় কিংবা নারীর শিক্ষা গ্রহণের পরিমান তথা কোন শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাগ্রহন করবে তা নির্ধারণ করে তাদের জানাই ধিক্কার।“ রোকেয়া  সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন তার সমবয়সী , কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন তার অনুজ, নারী জাগরণ অথবা বিদ্রোহ প্রসঙ্গে তাদের নাম আগে এলেও প্রকৃতপক্ষে তারা ছিলেন সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর উত্তরসূরি।  

তার পুর্ণাঙ্গ গ্রন্থের সংখ্যা ৩২টি। তিনি কাব্য, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি ও সঙ্গীত রচনা করেছেন। কাব্যগ্রন্থ অনলপ্রবাহ(১৯০০), নবউদ্বীপন(১৯০৭), স্পেন বিজয় কাব্য (১৯১৪)। উপন্যাস রায়নন্দিনী (১৯১৫), তারবাঈ(১৯১৬), নূরুউদ্দীন(১৯১৯), বঙ্গ ও বিহার বিজয়( ১৮৯৯ অসমাপ্ত)। সঙ্গীত সঞ্জিবনী(১৯১৬) প্রবন্ধ স্ত্রী শিক্ষা, স্বজাতি প্রেম(১৯০৯), স্পেনীয় সভ্যতা(১৯১৬)। ভমণ কাহিনী তুরস্ক ভ্রমণ(১৯১৬)। এছাড়া আবে হায়াত, কুসুমাঞ্জলী, গৌরব কাহিনী, সুধাঞ্জলী তার অপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ।  

১৯৩১ সালের ১৭ জুলাই মাত্র ৫১ বছর বয়সে এ মহামানব পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে ওপারের বাসিন্দা হন। তার জীবনাবসানে মুসলিম বাঙ্গালিরা হারায় তাদের শ্রেষ্ঠ এক বীরযোদ্ধাকে। তার অকাল প্রয়াণে শোক জানিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট কামাল আতাতুর্ক বার্তা দেন।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button