ইতিহাস

অটোমান-সাফাভিদ যুদ্ধ: ১৬৩৮ এর বাগদাদ অবরোধ

অটোমান আর সাফাভিদ সাম্রাজ্যের মধ্যে যুদ্ধের প্রধাণ কারণ ছিল মধ্যপ্রাচ্য নিয়ন্ত্রণ এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই নিজ নিজ সাম্রাজ্যের সীমানার বিস্তৃতি ঘটানো। দুই পক্ষের রেষারেষিতে মূল রসদ হিসেবে কাজ করেছিল ধর্মীয় মতভেদ। ধর্মীয় বিশ্বাসে দুই সাম্রাজ্যই ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসি থাকলেও অটোমানরা ছিলেন সুন্নি মুসলিম। অন্যদিকে সাফাভিরা ছিলেন শিয়া। এই সাফাভিদদের হাত ধরেই ইরানে শিয়া মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়।  

অটোমান-সাফাভিদ যুদ্ধের ১৬২৩ থেকে ১৬৩৯ সালের পর্যায়কালের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে ১৬৩৮ এর বাগদাদের যুদ্ধ বা বাগদাদ অবরোধ। এ যুদ্ধে সাফাভিদদের পক্ষে ছিলো বেকতাশ খান গর্জি আর অটোমানদের নেতৃত্ব ছিলো সুলতান চতুর্থ মুরাদের হাতে। তৎকালীন প্রতক্ষদর্শীদের বরাতে, যুদ্ধে অটোমানদের ছিলো এক লক্ষেরও বেশি সৈন্য। যাদের মধ্যে ৩৫ হাজার ছিলো অটোমান সুলতানদের রক্ষায় নিয়োজিত বিশেষ পদাতিক বাহিনী জ্যানিসারি আর প্রায় ৭৫ হাজার ছিলো অশ্বারোহী বাহিনী। এছাড়া অটোমানদের ছিলো ২০০ কামান যেখানে সাফাভিদদের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা ১০০। তৎকালীন বাগদাদ ছিলো সাফাভিদদের দখলে। তাই যুদ্ধের জন্য অশ্বারোহী বাহিনীর খুব একটা প্রয়োজন পরে নি তাদের। তাদের সম্বল ছিলো ৪০ হাজার পদাতিক সৈন্য আর বাগদাদের চতুর্দিক ঘিরে ২১১ সুরক্ষিত ও অস্রসজ্জিত টাওয়ার। 

ইস্তানবুল থেকে বাগদাদের দূরত্ব ১৬০০ কিলোমিটার। অটোমান আর্মি এই দূরত্ব ১৯৭ দিনে পাড়ি দেয়। এরপরই তারা চারিদিক থেকে বাগদাদ ঘিরে ফেলে। আনুষ্ঠানিক ভাবে অবরোধের শুরু ১৫ই নভেম্বর। বাগদাদ শহরটি চারিদিক থেকে উঁচু উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছিলো। অটোমানদের আক্রমন ঠেকাতে সাফাভিদরা তাদের সেনাসংখ্যা বাড়িয়ে শহরের প্রধাণ ৪ টি গেটে মোতায়ন করে। অটোমানদের গ্র‍্যান্ড ভাইজার তৈয়ার মেহমেত পাশার বিচক্ষণতায় সবচেয়ে দূর্বল গেটে আঘাত হানে অটোমানরা। এতেকরে অটোমানদের পক্ষে শহরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করা সম্ভব হয় এবং সাফাভিদ সৈন্যদের সাথে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়। এতে সামরিক বেসামরিক অনেক মানুষের মৃতুয হয়। শহরে প্রবেশের পূর্বে এই অবরোধ ৪০ দিন স্থায়ী হয়। যুদ্ধের শেষ দিকে সুলতান মুরাদ তার গ্র‍্যান্ড ভাইজারকে সর্বাত্মক আক্রমনের নির্দেশ দিলে সর্বশেষ ২৫শে ডিসেম্বর, ১৬৩৮ এ বাগদাদ পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হয়। তবে শেষ পর্যায়ের এই আক্রমনে গ্র‍্যান্ড ভাইজার মেহমেত পাশা মৃত্যুবরণ করেন। 

যুদ্ধের পর সুলতানের নতুন গ্র‍্যান্ড ভাইজার কেমানকেশ মুস্তফা পাশা এবং পারস্যের প্রতিনিধি সারুহান এক শান্তিচুক্তি আলোচনা শুরু করে। ১৭ই মে, ১৬৩৮ এ সাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক যুহাবের চুক্তি বা Treaty of Zuhab. আজকের দিনের আধুনিক ইরান-তুরস্ক ও ইরাক-ইরান এর মধ্যকার সীমানা নির্ধারণ অনেকটা এই চুক্তির মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়েছিলো বলা যায়।

বাগদান অভিযানের সময় সুলতান মুরাদ তার দুই গ্র‍্যান্ড ভাইজারকে হারায়। প্রথমজন বৈরাম পাশা, তিনি বাগদাদ অভিমুখ গমনকালে স্বাভাবিকভাবে মৃতুবরণ করেন। আর দ্বিতীয় জন মেহমেত তৈয়ার, যিনি যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে মৃত্যমুখে পতিত হন। অটোমানদের ইতিহাসে মেহমেত তৈয়ার হন ৩য় ভাইজার যিনি সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হন।

এই বিজয়ের পরে সুলতান মুরাদ তার বিজয়ের জয়গাঁথা লিখে রাখার জন্য দুটি কেবিন বা স্মৃতিস্তম্ভ(কিয়স্ক হিসেবে পরিচিত) নির্মান করেন তোপকাপি গার্ডেনে। একটি তার ইয়েরাভেন বিজয়ের জন্য এবং অন্যটি তার বাগদাদে বিজয়ের জন্য।

শুরুতেই জানা গেলো যে ধর্মীয় মতবিরোধই ছিলো অটোমান ও সাফাভি সাম্রাজ্যের যুদ্ধের পেছেন মূল রসদ। দুই প্রতাপশালী সামাজ্যের মধ্যে ধারাবাহিকভাবে অনেক বছর যুদ্ধ হলেও সেসব যুদ্ধের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জয় পেয়েছে অটোমানরা। প্রকৃতপক্ষেই অটোমানদের সামনে সাফাভিদরা অনেকটা আনকোরা নতুন কিন্তু তীব্র প্রতিপক্ষ হিসেবে হাজির হয়। তবে অভিজ্ঞতা, শক্তিমত্তা সর্বোপরি জিগীষার অভাবে অটোমানদের সামনে সাফাভিদরা খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারে নি। সাফাভিদরা যেখানে আঞ্চলিক শক্তি, অটোমানরা তখন ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকা পর্যন্ত নিজেদের সাম্রাজ্যকে বিস্তৃত করেছিল।

অটোমানরা ছিল বৈশ্বিক পরাশক্তি। তাদের অনেক শত্রুর মাঝে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে সাফাভিদরা ছিলেন অন্যতম। সুলতান সুলেমানের শাসনামনে অনেক বহিরাগত এলাকা দখল করতে সক্ষম হয় অটোমানরা। সে সময়ে অটোমান সাম্রাজ্য স্প্যানিশ, ভেনেশিয়ান, হাঙ্গেরিয়ান এবং রোমানদের সাথে সমানে সমান ভাবে লড়ে গেছে। হাঙ্গেরি দখল করার পরও অটোমানরা দীর্ঘদিন ইউরোপের নানা সাম্রাজ্যের সাথে যুদ্ধ করেছে।

অটোমানরা তাদের সুদীর্ঘ শাসনকালে অসংখ্য যুদ্ধ করেছে, যার মধ্যে মাত্র ৫টি ছিল সাফাভিদ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। এসব যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যকে নিয়ন্ত্রণ করা আর কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের সাম্রাজ্যের সীমানা বাড়ানো। শুধুমাত্র মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যেই এসব যুদ্ধ সীমাবদ্ধ ছিলো বিধায় সাফাভিদরা অটোমানদের অন্যতম প্রতিপক্ষ থাকলেও প্রধান প্রতিপক্ষ ছিলো না কখনোই। এরপরও তাদের সাথে ১৫১৪ সাল থেকে ১৭৪৭ সাল পর্যন্ত লড়াই চলেছে। শেষের দিকে ধীরে ধীরে অটোমান সাম্রাজ্যের সূর্য ঢলে পড়তে শুরু করে। এরপরও ইরান বা সাফাভিদ সাম্রাজ্য তাদের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারেনি। তবে সাফাভিদরা আঞ্চলিক শক্তি হয়েও দীর্ঘসময় পরাক্রমশালী অটোমানদের বিরুদ্ধে লড়ে গেছে, এটাই সাফাভিদদের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Check Also
Close
Back to top button