ইতিহাস

ইম্পেরিয়াল জাপান: ১৮৬৮ থেকে ১৯৪৫ এর বিশ্বযুদ্ধ

জাপান সাম্রাজ্য বা এম্পায়ার অব জাপান অথবা ইম্পেরিয়াল জাপান শব্দগুলো শুনলেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার জাপানের ছবি। যেখানে সম্রাট হিরোহিতোর নেতৃত্ব জাপানী সৈন্যরা মুখে কালো আচড় কেটে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পরে। বিভিন্ন ম্যুভি, টিভি সিরিয়ালের বদৌলতে ইম্পেরিয়াল জাপান বলতে আমরা যুদ্ধবাজ জাপানকেই বুঝি। কিন্তু শুধু যুদ্ধ ছাড়াও জাপানের রয়েছে এক সমৃদ্ধ ইতিহাস। সেই ইতিহাসে যুদ্ধ যেমন রয়েছে তেমন রয়েছে অর্থনৈতিক উন্নতি, সামাজিক দায়বদ্ধতা, রাজনৈতিক টানাপোড়ন।

ইম্পেরিয়াল জাপান বলতে এক কথায় জাপানী সম্রাটগন কর্তৃক শাসনকৃত অঞ্চলকে বোঝায়। এই ইম্পেরিয়াল জাপানের শুরু মূলত ১৮৬৮ থেকে ধরা হয়, কারণ তখন থেকেই আধুনিক জাপানের শুরু। ১৮৬৮ সালের মেইজি শাসনকাল থেকেই ইম্পেরিয়াল জাপানের সূচনা, যা ১৯৪৫ এর ২য় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।

১৮৬৮ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত সময়কালকে ৩টি যুগে ভাগ করা হয়। ১৮৬৮ থেক ১৯১২ পর্যন্ত সময়কালকে বলা হয় “মেইজি” যুগ। এরপর আসে ১৯১২ থেকে ১৯২৬ পর্যন্ত চলা “তাইশো” যুগ। শেষে ১৯২৬ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত চলে “শোয়া” যুগের প্রথম পর্যায় বা ২য় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী শোয়া যুগ। জাপানের প্রথা অনুযায়ী সম্রাটদের শাসনামল শেষে বা মৃত্যুর পর প্রত্যেক সম্রাটের নতুন নামকরণ করা হয় এবং তার শাসনামলকে সেই নামেই ডাকা হয়। এভাবেই আসে এই ৩ টি নাম। মেইজি যুগ, যেখানে সম্রাট ছিলো মুতশুহিতো। তাইশো যুগে ছিলেন সম্রাট ইউশিহিতো আর সবচেয়ে পরিচিত সম্রাট হিরোহিতোর শাসনামলের নাম শোয়া যুগ।

মেইজি যুগঃ

মেইজি যুগ বলতে জাপানের সম্রাট মেইজি বা সম্রাট মুতশুহিতোর ৪৫ বছরের শাসনকালকে নির্দেশ করা হয়। এই সময়কাল ১৮৬৮ থেকে ১৯১২ সাল পর্যন্ত বজায় ছিল। এই সময়কালকে জাপানের আধুনিকায়নের যুগ হিসেবে অভিহিত করা হয়। শুধু তাই নয়, এই সময়ে বিশ্বের ইতিহাসে জাপান নিজেদেরকে একটি প্রথম সারির ক্ষমতাধর রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯১২ সালে সম্রাট মেইজির মৃত্যুর পর সম্রাট তাইশো সিংহাসনে আরোহণ করলে এই যুগের অবসান হয়।

মেইজি যুগেই জাপানে আধুনিকায়নের ছাপ পড়ে জাপানের অর্থনীতি সমাজ ও রাজনীতির ওপর। সামন্তপ্রভুদের দিন শেষ হয়ে যায়। সামুরাইদের এতদিনকার বনেদি আধিপত্যের অবসান ঘটে। সম্রাটের সমর্থনে বেশকিছু জাপানি নেতা তাদের কর্মযজ্ঞে মেতে ওঠেন। তাদের লক্ষ্য ছিল জাপানের অর্থনীতি ও সমাজকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করা। তারা বুঝতে পেরেছিল সমাজ, রাজনীতি, ধর্মনীতি প্রভৃতি সবক্ষেত্রে স্বকীয়তা বজায় রেখে উন্নত ইউরোপীয় সভ্যতার সঙ্গে পাল্লা দেয়ার একমাত্র উপায় হল জাপানের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন। এর অন্যতম ফল ছিল সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধের অবসান ও প্রতিবাদী মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা। এরই প্রতিফলন ঘটেছিল ১৮৮৯ সালে গৃহীত জাপানের সংবিধানে। এই সংবিধানের মাধ্যমে জাপানে চূড়ান্ত রাজতন্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত সামন্ত ব্যবস্থার জায়গায়, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উপযোগী রাষ্ট্রকাঠামো তৈরি হয়।

তাইশো যুগঃ

তাইশো যুগের সময়কাল ১৯১২ সালে থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত। এসময় জাপানের সম্রাট ছিলেন সম্রাট তাইশো বা সম্রাট ইউশিহিতো। সম্রাট তাইশো ছিলেন গনতন্ত্রে বিশ্বাসী। তাই তার সময়ে জাপানের রাজ্যশাসনের ভার গুটিকয়েক ক্ষমতাশালী মানুষের কুক্ষিগত না থেকে রাজ্যের সাধারন মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পরে। সেজন্য, এ যুগটিকে জাপানে “তাইশো গণতন্ত্র” নামে ডাকা হয়। জাপানের ইতিহাসে গনতন্ত্রের বীজ এই তাইশো যুগেই বপন করা হয়।

এ সময়ে জাপান একটি প্রকৃতপক্ষেই একটি প্রথম শ্রেণীর রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তখন জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই চীনের বিশাল বাজার এর সুবিধা নিতে চেয়েছিলো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চীনের বাজারের অংশীদারিত্ব নিয়ে জাপান এক সম্মেলন করে। আপাতদৃষ্টিতে এই সম্মেলন জাপানের বিপক্ষে গেলেও প্রকৃতপক্ষে তা জাপানের জন্য সুফল বয়ে আনে। এই সম্মেলন দূরপ্রাচ্য যে শান্তির পরিমণ্ডল রচনা করে তাকে ব্যবহার করে জাপান অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সংহতি নিয়ে আসে ও আগ্রাসনের জন্য প্রস্তুত হয়। ১৯২৭ সালের পর জাপানের রাজনীতিতে, শাসনব্যবস্থায় সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায়। এই শামরিক শক্তিই জাপানকে মাঞ্চুরিয়া বিজয়ের পথে এগিয়ে দেয়।

শোয়া যুগ-২য় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী

শোয়া যুগের সূচনা ১৯২৬ এ এবং এ যুগ শেষ হয় ১৯৮৯ সালে সম্রাট হিরোহিতোর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।

এ যুগকে দুইটি ভাগে ভাগ করা হয়। ২য় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী এবং ২য় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী। প্রথম ভাগকেই মূলত ইম্পেরিয়াল জাপানের অন্তর্ভূক্ত করা হয়। ২য় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জাপানে সম্রাটের উপস্থিতি থাকলেও জাপান আর সেই অর্থে ইম্পেরিয়াল থাকে নি।

শোয়া যুগের প্রথম পর্যায়ে জাপান পররাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে সম্প্রসারণশীল নীতি গ্রহণ করে। ফলে সংঘটিত হয় চীন-জাপান যুদ্ধ ও রুশ-জাপান যুদ্ধ। দুটি যুদ্ধে জাপানের জয়লাভ দূরপ্রাচ্যে তাকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতাবান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৩১ সালে জাপান প্রথমে মাঞ্চুরিয়া পরে পুরো চীনকে তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। বিনা প্রতিরোধে মাঞ্চুরিয়া কে পদানত করার পর জাপান পূর্ব এশিয়ায় তার বিস্তার নীতি শুরু করে। ১৯৩৭ এর দিকে চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে জাপানের প্রাধান্য বৃদ্ধি পায়। সাংহাই, নানকিং, ক্যান্টন, পিকিং প্রভৃতি অঞ্চল জাপানি শাসনের আওতায় চলে আসে। ১৯৩৯ এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, জাপানি আগ্রাসনে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। কিন্তু তাদের আগ্রাসন বেশিদিন চলে নি। ৪৫ এর শেষের দিকে মিত্র দেশগুলির বিরুদ্ধে যুদ্ধের একপর্যায়ে হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে পারামানবিক বোমা হামলার ঘটনায় ১৯৪৫ সালের ২রা সেপ্টেম্বর জাপান আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এর সাথেই শেষ হয় ইম্পেরিয়াল জাপানের পর্ব।

১৮৬৮ থেকে ১৯৪৫, এই দীর্ঘ সময়ে জাপান নানা পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। এই সময়ের মধ্যেই জাপান বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশ হয়ে ওঠে। তৈরি করে শক্তিশালী সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী। অর্থনৈতিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে সরে এসে শিপ্লভিত্তিক অর্থনীতির দিকে ঝুকে পড়ে। এই সময়েই ইম্পেরিয়ায়ল জাপান পার্শবর্তী কোরিয়া, তাইওয়ান এবং চীনের মাঞ্চুরিয়াসহ নিকটবর্তী সকল দেশে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট হয়। কিন্তু ২য় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের হার, তাদের সম্প্রসারণশীল নীতি পরিত্যাগে বাধ্য করে। এরপর জাপান তাদের প্রযুক্তি খাতে জোর দেয় এবং তারই সুফল হিসেবে জাপান আজ বিশ্বের প্রযুক্তি খাতের নেতৃত্ব দিচ্ছে।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button