ইতিহাস

ইতিহাসের পাতায় নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ‘বান্দরবান’ পার্বত্য জেলা’

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত চট্টগ্রাম বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল বান্দরবান পার্বত্য জেলা। এই জেলার মোট আয়তন ৪৪৭৯.০২ বর্গ কিলোমিটার।বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশে ২১°১১´ থেকে ২২°২২´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯২°০৪´ থেকে ৯২°৪১´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ জুড়ে বান্দরবান জেলার অবস্থান। বান্দরবান জেলার পশ্চিমে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলা, উত্তরে রাঙ্গামাটি জেলা, পূর্বে রাঙ্গামাটি জেলা ও মায়ানমারের চিন প্রদেশ এবং দক্ষিণে ও পশ্চিমে মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশ অবস্থিত।

মানচিত্রে ‘বান্দরবান’ জেলা

বান্দরবান জেলার পাহাড় শ্রেণী সমূহ সমুদ্র পৃষ্ঠ হতে ৩০০-১১০০ মিটার উচ্চে অবস্থিত। এই পাহাড়গুলো মূলত টারসিয়ারী যুগের। ভূ-প্রকৃতিবিদ দের মতে, ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটনিক পাত-এর সংঘর্ষের ফলে বান্দরবানের নৈসর্গিক পাহাড়ের সৃষ্টি হয়। এখানকার জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ হওয়ার পিছনে মূল কারণ হচ্ছে, এই জেলাটি কর্কট ক্রান্তি ও বিষুবরেখার মধ্যবর্তী একটি  অঞ্চল।

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, এ জেলার মোট জনসংখ্যা ৩,৮৮,৩৩৫ জন। তার মধ্যে মুসলিম, হিন্দু খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ছাড়াও মারমা, চাকমা, বম, মুরং, ত্রিপুরা, খেয়াং, খুমি, লুসাই প্রভৃতি ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। বান্দরবান বাংলাদেশ এর সবচেয়ে কম জনবসতিপূর্ণ জেলা।

এই জেলার অন্যতম নদী সাঙ্গু নদী যা সাংপো বা শঙ্খ নামেও পরিচিত। এটি বাংলাদেশের একমাত্র নদী যা দক্ষিণ থেকে উত্তরে প্রবাহিত হয়। অন্যান্য নদীর মধ্যে রয়েছে মাতামুহুরী এবং বাঁকখালী নদী।

জেলা প্রশাসনের পটভূমি 

বান্দরবান জেলা টি  পার্বত্য চট্টগ্রামের অংশ হিসেবে ১৫৫০ সালের দিকে প্রণীত বাংলার প্রথম মানচিত্রে বিদ্যমান ছিল। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলের রাজা এই অঞ্চল টি দখল করে ছিলেন। ৯৫৩ সালে আরাকানের রাজা, ১২৪০ সালের দিকে ত্রিপুরার রাজা এবং ১৫৭৫ সালে আরাকানের রাজা আবার এই এলাকা পুণর্দখল করেন। এই অঞ্চলে তার রাজত্ব ১৬৬৬ সাল পর্যন্ত বিদ্যমান ছিলো। ১৬৬৬-১৭৬০ সাল পর্যন্ত মুঘল সাম্রাজ্য এই অঞ্চল টি সুবা বাংলার অধীনে শাসন করে। কিন্তু ১৭৬০ সালে,  ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই এলাকা দখল করে নেয় এবং ১৮৬০ সালে, এই অঞ্চল টি কে ব্রিটিশ ভারতের অংশ হিসাবে যুক্ত করে দেয়। বর্তমান বান্দরবান পার্বত্য জেলা বৃটিশ আমলে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার বান্দরবান, নাইক্ষ্যংছড়ি, রুমা ও লামা থানায় অন্তর্ভূক্ত ছিল।

১৯০০ সালে, পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনটি সার্কেলে বিভক্ত করা হয়-চাকমা সার্কেল, মং সার্কেল, এবং বোমাং সার্কেল। তৎকালীন সময়ে বান্দরবান বোমাং সার্কেলের অর্ন্তভুক্ত ছিলো। 

১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এই জেলাটি চট্টগ্রাম জেলার অংশ হিসাবে বাংলা প্রদেশের অন্তর্গত ছিলো। 

১৯৫১ সালে, বান্দরবান জেলা এবং ১৯৭১ সালে, লামা থানা পর্যায়ক্রমে মহকুমা হিসেবে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু করে। 

পরবর্তীতে স্বাধীনতা যুদ্ধের ও অনেক পরে ১৯৮১ সালের ১৮ই এপ্রিল, চট্টগ্রাম জেলাকে ৩ টি আলাদা জেলায় বিভক্ত করা হয়। যারা একটি হচ্ছে ‘বান্দরবান’ জেলা।

‘৭১ এ ‘বান্দরবান’ জেলা

১৯৭১ সালে, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বান্দরবানে ঘটেছে কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা। যুদ্ধ ক্ষেত্র হিসেবে এ জেলার কালাঘাটা নামক স্থানটি বিশেষভাবে পরিচিত।  এ উপজেলার ডলুপাড়া ও কেনাইজুপাড়ায় মুক্তিয়োদ্ধাদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ উপজেলায় পাকবাহিনী ব্যাপক গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও নির্যাতন চালায়। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমুক্রু পাড়া ও সোনাইছড়ি জুমখোলা পাড়াতে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্থায়ী ক্যাম্প ছিল। বীর বিক্রম খেতাব প্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ‘ইউ কে চিং’ এই জেলার ই বাসিন্দা ছিলেন।

বান্দরবান জেলা’র নামকরণের ইতিহাস

বান্দরবান জেলার নামকরণ নিয়ে অদ্ভুত এবং মজার একটি ইতিহাস আছে। এই জেলার আদিবাসিন্দা দের মুখে মুখে প্রচলিত রূপকথা অনুযায়ী, পূর্বে এই এলাকায় অসংখ্য বানর বাস করতো। আর এই বানরগুলো শহরের প্রবেশ মুখে ছড়ার পাড়ে প্রতিনিয়ত লবণ খেতে আসত। এক সময় অতি বৃষ্টির কারণে ছড়ার পানি বৃদ্ধি পেলে বানরের দল ছড়া পাড় থেকে পাহাড়ে যেতে না পারায় একে অপরকে ধরে সারিবদ্ধভাবে ছড়া পার হয়। বানরের ছড়া পারাপারের এই দৃশ্য দেখতে পায় এই জনপদের মানুষ। এই সময় থেকে জায়গাটি “ম্যাঅকছি ছড়া” হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। মার্মা ভাষায় ‘ম্যাঅক’ শব্দটির অর্থ হল বানর আর ‘ছি’ শব্দটির অর্থ হল বাধঁ। কালের প্রবাহে বাংলা ভাষাভাষির সাধারণ উচ্চারণে এই এলাকার নাম বান্দরবন হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তবে মার্মা ভাষায় বান্দরবনের প্রকৃত নাম “রদ ক্যওচি চিম্রো’। (২)

তাছাড়া ব্রিটিশ শাসনের সময় বান্দরবান জেলা বোমাং সার্কেলের অন্তর্ভূক্ত হওয়ার কারণে এই জেলার আদি নাম বোমাং থং বলেও জানা যায়।

দর্শনীয় স্থানসমূহঃ

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অধিকারী বান্দরবান পার্বত্য জেলার দর্শনীয় স্থানের কথা লিখতে গেলে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়। অসংখ্য দর্শনীয় স্থানের ভীড়ে কি রেখে কি লিখবো এই টুকুই বুঝতে পারা মুশকিল। 

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ সাকাহাফং (৪৩০০ মিটার) । দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পর্বতশৃঙ্গ কেওক্রাডং (৮৮৩ মিটার) এবং সর্বোচ্চ খাল রাইখিয়াং এই জেলায় অবস্থিত। 

                                          চিত্রঃ সাকাহাফং পর্বত এর চূড়া 

                                            চিত্রঃ কেওক্রাডং পর্বত 

                                       চিত্রঃ রাইখিয়াং খাল

এখানকার অন্যতম দুটি দর্শনীয় স্থান হলো চিম্বুক পাহাড় ও বগা লেক। এছাড়াও নীলগিরি, নীলাচল, শৈল প্রপাত, প্রান্তিক লেক, নাফাখুম জলপ্রপাত, আমিয়াখুম জলপ্রপাত, দেবতাখুম, বুদ্ধ ধাতু জাদি, রেমাক্রী, সাফাখুম জলপ্রপাত, মেঘলা পর্যটন কেন্দ্র, ত্লাবং ঝর্ণা, ডামতুয়া ঝর্ণা সহ অসংখ্য চোখ ধাধানো সৌন্দর্যের স্থান এই বান্দরবান জেলা। প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটক নৈসর্গিক সৌন্দর্যের খোঁজে ছুটে আসে এই পাহাড়ি জেলায়। 

                     চিত্রঃ নাফাখুম জলপ্রপাত 

                                     চিত্রঃ নীলগিরি 

                        চিত্রঃ দেবতাখুম

কৃতী ব্যক্তিত্বঃ

বান্দরবান জেলা বীর বিক্রম খেতাব প্রাপ্ত একমাত্র উপজাতি  বীর মুক্তিযোদ্ধা ইউ কে চিং, রাজনীতিবিদ বীর বাহাদুর উশৈ সিং এর জন্মস্থান হিসেবে অধিক খ্যত।

তথ্যসূত্রঃ 

১. “বান্দরবান জেলা – বাংলাপিডিয়া”

২. বাংলা ট্রিবিউন 

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

৩ Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button