ইতিহাসজীবনী

ইতিহাসের পাতায় মির্জা গালিব

একদা এক ব্যাক্তি এক বারবনিতার প্রেমে পড়লে তার বন্ধু তাকে কঠিন ভাষায় তিরস্কার করল এর উত্তরে ব্যক্তিটি হেলায় যে শব্দগুলো আওড়ালো তা প্রবাদের চেয়েও জনপ্রিয় হয়ে গেল!

” ইশক্ পর জোর নেহি;হৈ য়েহ্ বোহ্ আতশ, গালিব-

জো লগায়ে নাহ লগে, ওর বুঝানে নাহ বুঝে।”

অর্থাৎ;

“প্রেমের উপর জোর খাটেনা, এ সেই আগুন, গালিব- যা জ্বালালে জ্বলে না, নেভালে নেভে না।”

হেলায় ফেলায় বলা যার কথাগুলোও প্রবাদ হওয়ার মত শক্তি রাখে ইতিহাস সেই ব্যক্তিটিকে মির্জা গালিব নামে স্মরণ করে।

কোন একজন কবি একা কোন একটি ভাষার প্রতিনিধিত্ব করেছেন ইতিহাসের পাতায় এমন নজির বিরল। তবে মির্জা গালিব এখানে লা জাওয়াব দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। উর্দু ভাষাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে গেছেন তার অভূতপূর্ব সব গজল,শেরের সাথে। যার উপর ভিত্তি করেই ভবিষ্যতে উর্দু ভাষাতে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য কবি,সাহিত্যিক, জগৎবিখ্যাত পন্ডিত।

জন্ম, ধর্ম, কর্ম ভারতবর্ষ হলেও মির্জা গালিবের পূর্বপুরুষদের ভিটে কিন্তু মোটেই ভারতবর্ষ ছিলো না। জীবিকার নিমিত্তে বহু তুর্কি-মোঙ্গল-আরব-আফগানদেরই আগমন ঘটেছিল এ ভারতবর্ষে। সে সুতোতেই সমরখন্দ থেকে আগমন ঘটেছিল মির্জা গালিবের দাদা কাকান বেগের। তিনি এবং তার দু’পুত্র আব্দুল্লাহ বেগ খান নাসরুল্লাহ বেগ খান সকলেই নানা রাজার সৈন্য বাহিনিতে চাকুরি জুটিয়ে নেন।

১৭৯৭ সালের ২৭ ডিসেম্বরে এই আব্দুল্লাহ বেগ খানের ঔরসেই আগ্রাতে জন্ম নেন ইতিহাস বিখ্যাত মির্জা গালিব। ইতিহাস তাকে মির্যা গালিব নামে চিনলেও তার আসল নাম মির্জা আসাদুল্লাহ বেগ।

অষ্টাদশ শতাব্দীর অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতে সৈনিক পেশা অত্যন্ত অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক হয়ে পড়েছিল। ১৮০২ সালে সে সূত্রেই বিদ্রোহ দমন করতে যেয়ে মারা যান মির্যা গালিবের পিতা আব্দুল্লাহ বেগ খান। ভাইয়ের মৃত্যুর পর তার পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন নাসরুল্লাহ বেগ খান। চাচা নাসরুল্লাহ বেগের তত্ত্বাবধানেই বেড়ে উঠতে লাগলেন মির্জা গালিব। ১৮০৬ সালে চাচাও মৃত্যু পথযাত্রী হোন।

পিতা আব্দুল্লাহ বেগ খান বিয়ে করেছিলেন তৎকালীন আগ্রার এক অভিজাত পরিবারে। সৈনিক জীবনের অনিশ্চয়তার কারণে তিনি তার স্ত্রীকে আগ্রায় পিতার পরিবারেই অবস্থানের অনুমতি দিয়েছিলেন৷ মামার বাড়িতেই গালিবের জন্ম এবং তুলনামূলকভাবে তিনি আরামদায়ক শৈশব কাটান, যা তার পিতা ও চাচার মৃত্যুর পরও বলবৎ ছিল৷

ইতিহাস যাকে উর্দুর মহারথী হিসেবে জানে সে ব্যক্তিটি যে অসাধারণ কাব্য প্রতিভা নিয়ে জন্ম নিয়েছিলেন তা শুধু উর্দুর গন্ডিতেই আবধ্য ছিলো না।

অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রাথমিক দিক, ফারসী তখন সরকারী ভাষা। ঘটনাচক্রে আরবি ও ফার্সি ভাষায় দক্ষ আবদুস সামাদ নামে এক জ্ঞানী ব্যক্তি আগ্রা সফর করেন৷ গালিব তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন৷ আবদুস সামাদ গালিবের মামার বাড়িতে দুই বছর অতিবাহিত করেন৷ তৎকালে গালিব ফার্সি ভাষায় দক্ষ হতে থাকেন। ফার্সী ভাষাকে নিজের প্রথম প্রেম আখ্যা দেয়া গালিব মাত্র ‘ন’ বছর বয়স থেকেই ফার্সীতে কবিতা লেখা শুরু করেন।

এসকল কিছুর মাঝেই ১৮১০ সালের ৮ আগস্ট তের বছরেরো কম বয়সে গালিব নওয়াব ইলাহী বখশ খানের কন্যা ওমরাও বেগমকে বিয়ে করেন এবং বিয়ের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আগ্রা থেকে দিল্লিতে চলে আসেন। এবং পরবর্তী জীবনের পাঁচ দশক সে শহরেই অতিবাহিত করেন গালিব।

দিল্লির পরিবেশ তার কবি খ্যাতি ছড়ানোর জন্য অনুকূল ছিলো। ‘মারুফ’ ছদ্মনামে কবিতা লেখা শুরু করলেন গালিব। শ্বশুরের প্রভাবের কারণে দিল্লির অভিজাত মহলের সাথে পরিচিত হতেও তাকে বেশ বেগ পেতে হয়নি। মুঘল ভারতে রাষ্ট্র ভাষা ফার্সি হলেও উর্দু ভারতব্যাপী দ্বিতীয় রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে খ্যাত ও স্বীকৃত ছিল। গালিব উর্দু ভাষায় বুৎপত্তি অর্জন করে ফার্সি ভাষার পাশাপাশি উর্দু ভাষায়ও কবিতা ও গদ্য চর্চা শুরু করেন।

১৮৩৭ সালে দিল্লির শেষ মুঘল সম্রাট আবু জাফর সিরাজুদ্দিন মোহাম্মদ বাহাদুর শাহ্ যখন দিল্লির নামে মাত্র সম্রাট হিসেবে সিংহাসনে বসেন, তখন ভারতব্যাপী মুঘল সাম্রাজ্যের সূর্য অস্তাগামী। এ পর্যায়ে সভাকবি নিযুক্ত হন মির্জা গালিব। সম্রাট তখন রাজ্য শাসনের পরিবর্তে কাব্য চর্চা ও মোশায়েরা করেই কাল কাটাতেন। সম্রাট তাকে ‘নাজমুদ দৌলাহ দাবির উল-মুলক নিজাম জং’ খেতাবে ভূষিত করেন।

বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফরের আনুকূল্য পাওয়া গালিব প্রথম জীবনে ছিলেন বেশ শৌখিন। এ পর্যায়ে আভিজাত্য তাকে গ্রাস করতে শুরু করে অতিরিক্ত মদ্য পানে তিনি আসক্ত হয়ে পড়েন। তার এক অদ্ভূত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানা যায় তিনি লিখতেন সন্ধ্যাবেলা এবং প্রচুর মদ্যপান করে নিতেন। হাতের কাছে থাকতো সূতো। এক একটি লাইন লিখতেন আর সূতোয় এক একটি গিঁট দিতেন। এই গিঁট দেয়া সূতো নিয়ে রাতে ঘুমাতে যেতেন আর সকালে উঠে গিঁটগুলো খুলতেন ।

আরেকটি খারাপ অভ্যাস গালিবকে গ্রাস করতে থাকে জুয়ার নেশা। এর কারণে ভয়ঙ্কর দৈন্য দশায় আপতিত হতে থাকেন মির্যা গালিব। কোম্পানির শাসন তখন মদ,জুয়ার বিরুদ্ধে খড়গ হাতে নেমেছিল। জুয়ার জন্য মির্যা গালিবকে শুধুমাত্র জরিমানাতেই নয় বেশ কয়েকবার জেলের গন্ডির সাথেও দেখা করতে হয়েছিল।

গালিব সারাজীবনি ছিলেন রসিক প্রকৃতির মানুষ, নিজের অবর্ণনীয় দুর্দশা উড়িয়ে দিতেন রসিকতায়। দেশপ্রেমে বলিয়ান সম্রাট বাহাদুর শাহ ১৮৫৭ সালে নেতৃত্ব দেন সিপাহী বিদ্রোহের। এসময় গৃহবন্দি ছিলেন কবি, মোগল পরিবারের পতনের পর ইংরেজ সৈন্যরা তাঁকে লালকেল্লা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে হাজির করেন কর্নেল ব্রাউনের আদালতে। সবাই নিশ্চিত ছিলো লালকেল্লার ঘনিষ্টজন হিসেবে গালিবের হয়তো ফাঁসিই হয়ে যাবে। কর্নেল ব্রাউন গালিবকে জিজ্ঞাসা করেন তিনি মুসলিম কিনা। গালিব জবাব দেন তিনি অর্ধেক মুসলমান। কর্নেল ব্রাউন অবাক এবং বিরক্তি নিয়ে প্রশ্ন করেন, এ আবার কেমন মুসলমান?গালিব জবাব দেন আমি মদ্য পান করি তবে শুকর খাইনা। হেসে দিলেন দরবারের সবাই; মুক্তি পেলেন গালিব। সিপাহী বিদ্রোহ দেখে গেলেন নিজ চোখে যার উপাখ্যান লেখলেন ‘দাস্তাম্ভু’ নামক গ্রন্থে।

সেই আদালত থেকে গালিব মুক্তি পেলেও জীবনে নেমে আসে দুর্গতি। এতদিন বাদশাহর আনুকূল্যে জীবনধারণ করেছেন কিন্তু সেই পথ বন্ধ। কিছুদিন কলকাতায় এসেও বসবাস করেন। কিন্তু স্বাস্থের অবনতি হতে থাকে। দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পেতে থাকে। দিনে দিনে ঋণে জর্জরিত হতে থাকেন। কিন্তু তাঁর আত্মসম্মানবোধ তখনও প্রখর ছিলো। ইংরেজ রাজ কর্মচারীর অসম্মানের জন্য তিনি সদ্য প্রতিষ্ঠিত দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার প্রস্তাব পর্যন্ত ফিরিয়ে দেন।

মীর্জা গালিবের কলকাতার বাড়ি

কথার জাদুকর গালিব তাঁর কাব্যালঙ্কার ও ছন্দ এতটাই উচ্চ-মর্গীয় ও দূর্বোধ্য ছিলো যে জীবদ্দশাতেই তাকে ‘poet of nonsense’ উপাধি পেতে হয়! সমকালীন কবিরা তাকে নিয়ে হাসি ঠাট্রায় মেতে উঠলে তিনি তাদের কবিতা দিয়েই উত্তর দিতেন ;

‘আমি প্রশংসার কাঙ্গাল নই, পুরস্কারের জন্যে লালায়িত নই, আমার কবিতার যদি কোন অর্থও না থাকে তা নিয়েও আমার তোয়াক্কা নেই৷’

মির্জা গালিব

জানা যায় অদ্ভূতুরে চরিত্রের এ মানুষটি সারাজীবনে প্রচুর বই পড়লেও জীবনে কখনই কোন বই কিনেন নি! সারাজীবন ভাড়া করা বই পড়েই অতিবাহিত করে দিয়েছেন।

১৮৬৯ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি মহান এ কবি মৃত্যুবরণ করেন এবং তাকে দিল্লীর নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মাজারের কাছে দাফন করা হয়৷

মির্জা গালিবের সমাধি, নিজামুদ্দিন বস্তি, দিল্লী

মহান এ কবি জীবদ্দশাতেই নিজ সম্পর্কে মন্তব্য করে গিয়েছিলেন তিনি বেঁচে থাকতে তার গুণকে কেউ স্বীকৃতি না দিলেও, পরবর্তী প্রজন্ম তাকে স্বীকৃতি দিবে। ইতিহাস এর সত্যতা প্রমাণ করেছে। উর্দূ কবিদের মধ্যে তাকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি লেখা হয়েছে। আজ শুধু উর্দু ভাষাভাষী মানুষই নয় সারা পৃথিবীতে গালিবের অসংখ্য গুণগ্রাহী বিদ্যমান।

মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ খাঁন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

MK Muhib

A researcher,An analyst,A writer,A social media activist,student at University of dhaka.

এই জাতীয় আরো পোস্ট

২ Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button